অবশেষে ভাঙল বাম জোট

প্রকাশ: ২৬ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মে ২২ । ১১:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

আলাদা দুই রাজনৈতিক জোট বা মঞ্চে থাকা না থাকা নিয়ে মতভেদের পর অবশেষে ভেঙে গেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোট ছেড়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন। গত মঙ্গলবার বাম জোটের এক সভায় অন্যতম শরিক এই দুই দলের সদস্য পদ স্থগিতের মধ্য দিয়ে এই ভাঙন স্পষ্ট হয়ে যায়।

সাইফুল হকের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলন আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আরও পাঁচটি দলের সঙ্গে মিলে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় থাকা 'গণতন্ত্র মঞ্চ' নামের ওই মোর্চায় এই দুই শরিকের যুক্ত হওয়া নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটে মতবিরোধ চলছিল। এ নিয়ে ৯টি বামপন্থি দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাম জোটের অন্য সাত শরিকেরই ঘোরতর আপত্তি ছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের সিপিবি কার্যালয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের জরুরি সভা ডাকা হয়। বাম জোটের সমন্বয়ক ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাত্তারের সভাপতিত্বে প্রায় দেড় ঘণ্টার ওই সভায় সার্বিক বিষয়ে আলোচনার পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, যে কোনো একটি জোটে থাকতে হবে। দুই জোটে থাকার সুযোগ নেই।

এ সময় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি জোটে তাঁদের সদস্য পদ 'আপাতত স্থগিত' রাখার আহ্বান জানান। পরে জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের বাম জোটের সদস্য পদ স্থগিত রাখা হয়। সভায় সাইফুল হক ও জোনায়েদ সাকি ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সহ-সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা মানস নন্দী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা আকবর খান প্রমুখ।

জানতে চাইলে সাইফুল হক বলেন, 'গণতন্ত্র মঞ্চ' নামে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণাও আসেনি। যেহেতু এটা জাতীয় মঞ্চ, তাই বাম জোট শরিকরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সেখানে যুক্ত হতে পারে বলে তাঁরা ভেবেছিলেন। শরিক দলগুলোর অনেকেরই দৃষ্টিভঙ্গির মতপার্থক্য রয়েছে। সে কারণে এ নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের সদস্য পদ আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছিলেন তাঁরা।

জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাম জোট কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী সরকার পতনে গণতান্ত্রিক বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না। বৃহত্তর আন্দোলন গড়তে হলে গণতান্ত্রিক মঞ্চ তৈরির মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের এই মতের সঙ্গে বাম জোটের অন্য নেতাদের আপত্তি ছিল। এই মতানৈক্যের কারণে তাঁরা নিজেরাই বলেছেন, তাঁদের সদস্য পদ স্থগিত রাখতে।

তিনি বলেন, 'আমরা বাম জোটের বাইরে গিয়ে গণতান্ত্রিক মঞ্চ তৈরি করতে আরও পাঁচটি দলকে সঙ্গে নিয়েছি। তবে বাম জোটও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, যদি তারা মনে করে।'

বাম জোটের সমন্বয়ক অধ্যাপক আবদুস সাত্তার বলেন, মঙ্গলবারের সভায় জোটের বাইরে গিয়ে আরও একটি রাজনৈতিক মঞ্চ করার চেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন বলেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি নিয়ে তারা ওই মঞ্চ তৈরি করছে। আর বাম জোট শিক্ষা, খাদ্য, রাজনৈতিক, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক ইস্যুসহ অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করে। সেখানে দুই জায়গায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কয়েক মাস ধরে নানামুখী তৎপরতা শেষে সাতটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে সরকারবিরোধী 'গণতন্ত্র মঞ্চ' গঠন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় সরকার গঠন এবং সরকার পতনের আন্দোলনে জোর দিতে আগামী সপ্তাহেই এ মঞ্চের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। ভোটের আগে বিএনপিসহ অন্য দলের সঙ্গেও তাঁরা আন্দোলনে যুক্ত হতে পারেন বলে নেতাদের কথায় আভাস মিলেছে।

নতুন এই মোর্চায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন ছাড়াও আরও পাঁচটি দল ও সংগঠন যুক্ত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ভাসানী অনুসারী পরিষদ, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ এবং হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। এর মধ্যে গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ছিল নাগরিক ঐক্য ও জেএসডি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে প্রগতিশীল দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে ২০১৩ সালে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা গঠিত হয়। পরে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সিপিবি-বাসদ দুই দলের জোটকে যুক্ত করে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠনের ঘোষণা আসে। ওই বছর জোটগতভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় বামপন্থি দলগুলো। সেবার নির্বাচন কিংবা আন্দোলন- কোনো দিকেই সাফল্য আসেনি জোটের।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com