সমাজ

'ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে' কাঁদে কেন নারী

প্রকাশ: ২৬ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মে ২২ । ০৯:৩৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

নূরুননবী শান্ত

সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গত এক দশকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুসন্ধান প্রতিবেদনে নারী নির্যাতনের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা ভয়াবহ। বলা যায়, নারী ও কন্যাশিশুদের শান্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন-যাপনের অধিকার এখানে পদে পদে লঙ্ঘিত হয়। এ রকম অবস্থায় সমাজ, এমনকি পরিবারেও সম্প্রীতি ও শান্তির সুষম পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পাশে পরিবার ও সমাজ কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে দাঁড়াতে পারে না। ব্যক্তি বিপর্যস্ত বোধ করে; হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমনই যে, নরসিংদী রেলস্টেশনে জিন্স ও টপস পরার কারণে দলবদ্ধ হেনস্তার শিকার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া মেয়েটি প্রতিকার চেয়ে মামলা করা তো দূরের কথা, নিজের মা-বাবাকে পর্যন্ত বলার 'সাহস' পাননি! বন্ধুরা তার পাশে থাকলেও তার মানসিক বিপর্যয় রোধ করা যায়নি। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, 'আমি ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে কাঁদি।' দেখেশুনে মনে হয়, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের জন্য গৃহীত সব পদক্ষেপ ব্যর্থ।


এ দেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আছে, কিন্তু তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। বরং আইন বিশেষ করে, নারী নির্যাতন সংক্রান্ত আইনের অবিশ্বাস্য অপব্যবহারের বাস্তবতা বিচারকদের কাছ থেকেই আমাদের শুনতে হয়েছে। আইনের পক্ষে আপনাআপনি কার্যকর হওয়া তো সম্ভব নয়। আইনকে কার্যকর করে তুলতে হয়। তার জন্য আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হয়। আমাদের ব্যবস্থাপনা অভিযোগ নিষ্পত্তি করার প্রতি বেশি মনোযোগী। এ রকম তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নারী নির্যাতনের মূল কারণ, নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে কোনো ভূমিকাই রাখে না। সমাজে আইনি পরিবেশ প্রসারে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। পোশাকের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি, শারীরিক গঠনজনিত পোশাক-চাহিদার প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এখানে নেই। কিন্তু এক দল মানুষ ওয়াজের মাধ্যমে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে যে সংস্কৃতির প্রসার ঘটাচ্ছে, তার একটি শক্তিশালী দিক হলো, বিশেষ পোশাক-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণ। নরসিংদী রেলস্টেশনের ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে ধারাবাহিকভাবে বিস্তার লাভ করা প্রতিক্রিয়াশীলতার একমাত্র ফলাফল নয়। 'ঠিক পোশাক' বা 'বেঠিক পোশাক' প্রশ্নে নারীর প্রতি সামাজিক আক্রমণের ঘটনা গ্রাম, শহর, দেশের সর্বত্র ঘটছে। এ ধরনের প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই উগ্রবাদের জন্ম দিচ্ছে। এ রকম অসংবেদনশীল সমাজ কেবল নারীর জন্যই অনিরাপদ নয়; সর্বজনীন মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্তরায়।


সমাজে নারীর জন্য বহু রকমের মিথ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মিথ হলো ঐতিহ্যগত বিশ্বাস। খুব শক্তিশালী বিশ্বাস। এতটাই শক্তিশালী যে, এ রকম বিশ্বাস লালন ও পালন করা অনেক সময় ধর্ম রক্ষার সমান হয়ে ওঠে। নারী কী কী করতে পারবেন এবং কী কী করতে পারবেন না, তা নানা রকমের মিথ দ্বারা নির্ধারিত। এমনকি বাংলাদেশে নারীশিক্ষার পরিচর্যার যেটুকু ফলাফল অর্জিত হয়েছে নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে, সেখানেও জন্ম নিয়েছে নতুন মিথ। যেমন স্বাধীন ও সফল নারী তিনিই, যিনি রোজগার করছেন এবং ঘরও সামলাচ্ছেন। পুরুষের ঘরের কাজ না করলেও দিব্যি চলে যায়। নিজের কাঁধের ওপর ঘরের (অনুপার্জনমূলক) কাজের সঙ্গে বাইরের অতিরিক্ত (উপার্জনমূলক) কাজের দায়িত্ব নিয়ে নারী বেহিসেবি কাজের ঘেরাটোপে আটকে যান। ফলে বাস্তবে তার নারী স্বাধীনতার গ্লাস অর্ধেক ভরা কিংবা অর্ধেক খালি থাকে। এসবের ওপর চেপে বসতে শুরু করেছে 'ঠিক পোশাক'। বাইরে কোন পোশাক পরলে তাকে 'ন্যাংটা' বলা হবে অথবা কোন পোশাক পরলে তাকে 'রক্ষণশীল' বলা হবে- সে চাপও নারীকে বহন করতে হয় একা।

আমাদের উঠতি বয়সী মেয়েরা, যারা ভবিষ্যতে তাদের মায়েদের মতোই উপার্জন করার কাজের পাশাপাশি ঘরের অনুপার্জনমূলক কাজ করতে করতে কাহিল বোধ করবে, তারাও 'ঠিক পোশাক' পরার চাপে পর্যুদস্ত। তারা যে শিক্ষা পদ্ধতির ভেতর দিয়ে, যে সামাজিক দর্শনের ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে, সে দর্শন অনুসারে 'ভালো মেয়ে' রোজগার করে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে এবং 'ঠিক পোশাক' পরিধান করবে। ঘরের পোশাক, বাইরের পোশাক, কর্মস্থলের পোশাক, উৎসবের পোশাক ইত্যাদির ফাঁদে পুরুষরাও যে আটকা পড়েনি, তা নয়। তবে পোশাকের ফাঁদ দিয়ে পুরুষকে কোথাও কোথাও আটকে দেওয়া গেলেও সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাকে হেনস্তা করা যায় না; চরিত্রহীন বা 'ন্যাংটা' বলা যায় না। বড়জোর বলা যায় অসামাজিক, অসংস্কৃত, এমনকি 'বেশি স্বাধীনচেতা'। কি বিশেষ বিশ্বাসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা 'ঠিক পোশাক' পরিধান না করলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নারীকে ধমক দিতে পারে, আক্রমণ করতে পারে, প্রহার করতে পারে; খুন করার হুমকি দেয়, খুন করেও। অথচ এসব অপরাধ দমনের আইন আছে। আইন প্রয়োগ করার প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সমাজে আইনি পরিবেশ প্রসারে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। সামাজিক শিক্ষা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সব পর্যায়ে বৈচিত্র্যের প্রতি, পোশাক-চাহিদার ভিন্নতার প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করার সমন্বিত প্রক্রিয়া নেই। এই ফাঁকে নারীর পোশাক হয়ে উঠতে শুরু করেছে ধর্মীয় উগ্রবাদের উসিলা, সামাজিক সংঘাতের কারণ! 


পাকিস্তান আমলে বাঙালি অত্যন্ত বাস্তব উপলব্ধি লাভ করেছিল। মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল, মানুষে মানুষে বিভেদের নীতি কল্যাণ বয়ে আনে না। এই অসামান্য উপলব্ধির কারণেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এই রাষ্ট্রের নারীদের পোশাক বেছে নেওয়ার নিরাপত্তা নেই। এমনকি নির্যাতিত নারী আইনের আশ্রয় নিলে আইন প্রয়োগে দায়িত্বরত ব্যক্তিরাও  'ঠিক পোশাক' পরা, 'ভালো মেয়ে' হওয়া, সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে না থাকার পরামর্শ দেন। তাতে বোঝা যায়, এ দেশের জনগণের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণমূলক হয়ে উঠেছে। লক্ষ্য করুন, নরসিংদী রেলস্টেশনে পোশাকের কারণে যখন একটি মেয়েকে সামাজিকভাবে আক্রমণ করা হলো; একজন বয়স্ক নারী ভিক্ষুক ছাড়া কেউ মেয়েটির পাশে দাঁড়াননি। অর্থাৎ সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই পোশাক দিয়ে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থক। জনগণের বিরাট অংশকে এই দৃষ্টিভঙ্গিগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিকল্প নেই। এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করতে গেলে অমঙ্গল ঘটতে পারে।

নূরুননবী শান্ত: গল্পকার, অনুবাদক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com