বাজার: এত গম, তবুও কম!

প্রকাশ: ২৪ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দেশে বছরে ৭৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে স্থানীয়ভাবে গম উৎপাদিত হয় ১১ লাখ টন। চলমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আমদানি হয়েছে ৫৬ লাখ টন। পাইপলাইনে আছে আরও ৬ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার কাছাকাছি গম বর্তমানে দেশে আছে। তারপরও রহস্যজনকভাবে দেশে গমের বাজার উত্তপ্ত হয়েই চলেছে। সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত সাত দিনের ব্যবধানে গমের দাম বেড়েছে মণে ২০০ টাকা। এর প্রভাব পড়ছে আটা, ময়দাসহ গম থেকে তৈরি নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বলাবাহুল্য, চালের পর আমাদের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গম। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে নানা কারণে এখানকার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বিপুল পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরির জন্য, বিশেষ করে আটা ও ময়দার ওপর একটা বিরাট অংশের মানুষের নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ গমের দাম বাড়া মানে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া। এ বিষয়টি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ভোজ্যতেল নিয়ে দেশে কয়েক মাস ধরে রীতিমতো তেলেসমাতি চলছে; লিটারপ্রতি ২০০ টাকা দিয়েও দেশের প্রায় সব পরিবারে যা তরকারি রান্নার প্রধান উপকরণ সেই সয়াবিন তেল জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল ও চিনির মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বহু দিন আগেই সাধারণ মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর নাগালের বাইরে চলে গেছে।

আমাদের গম আমদানির প্রধান দুই উৎস দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন। ওই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলার কারণে গত তিন মাসে দেশ দুটো থেকে গম আমদানি হয়নি বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে গমের জন্য ভারতই আমাদের ভরসা। সম্ভবত এর সুযোগ নিয়ে গমের দাম বাড়ানোর ছুতো হিসেবে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা গম রপ্তানির ওপর ভারত সরকারের দেওয়া সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কথা বলছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি সমকালকে বলেছেন, ভারতের এ নিষেধাজ্ঞা সাময়িক। তা ছাড়া, ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়ীরা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে অন্তত পাঁচ লাখ টন গম আমদানির চুক্তি করেছেন। ওই চেম্বার সভাপতির মতে, সেগুলো আসতে কোনো বাধা নেই। সরকার চাইলে যে কোনো সময় রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ভারত থেকে গম আমদানি করতে পারে। দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে তো নয়ই; ভবিষ্যতেও সরবরাহে কোনো সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা না থাকা সত্ত্বেও দেশে গমের পাইকারি ও খুচরা বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এখন গমের বাজারের এ রহস্যময় আচরণের পেছনে কেউ যদি বাজারের স্বাভাবিক নিয়মবহির্ভূত অন্য কিছু কাজ করছে বলে মনে করেন, তাঁকে কি দোষ দেওয়া যাবে?

উপর্যুপরি বাম্পার ফলন সত্ত্বেও কয়েক বছর ধরে চালের বাজার অস্থির হওয়ার কারণ হিসেবে ইদানীং কেউ কেউ বলছেন, বছরে দেশে চালের চাহিদা কত তার সঠিক হিসাব না থাকার কারণেই ঘাটতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাচ্ছে না; এর সুযোগ নিচ্ছে চালবাজরা। গমের ক্ষেত্রেও যে তেমনটা হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। এটা তো সত্য যে, ভোজ্যতেল নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মজুতদারিতে লিপ্ত ছিলেন কিংবা এখনও আছেন। যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের একের পর এক অভিযানে আমরা লাখ লাখ লিটার সয়াবিন ও পাম অয়েলের অবৈধ মজুত আবিস্কৃত হতে দেখেছি। কে অস্বীকার করতে পারবে, ঈদের পর বেশ কিছুদিন যে ভোজ্যতেল বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিল, তা এখন বাজারে ফিরে এসেছে উপর্যুক্ত অভিযানের পর? আমরা তাই গমের বিষয়েও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অতিদ্রুত তৎপর হওয়া উচিত বলে মনে করি। আমরা এটাও মনে করি যে, বাজারে গমের সরবরাহে ভবিষ্যতেও যাতে কোনো সংকট না হয় সে জন্য এখনই সরকারকে অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্যটির ওপর ওই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এর পাশাপাশি তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে রাশিয়ার গম আনা যায় কিনা তা-ও ভেবে দেখতে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com