প্রচ্ছদ

জলে কল্লোলে বয়ে যায় ছেলেবেলা

প্রকাশ: ২০ মে ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ময়ুখ চৌধুরী

খুব ছোটবেলায় আমি একবার আত্মহত্যার উপক্রম করেছিলাম। বয়সে এত ছোট ছিলাম যে, ব্যাপারটা সেভাবে আমার স্মৃতিতে থাকার নয়। ওটা বড়দের স্মৃতিতে আছে, আর আমার শ্রুতিতে আছে।

রোজকার মতো বাবা গেছেন কর্মক্ষেত্রে। বড়রা স্কুলে। মা রান্নাঘরে। তখনকার দিনে রান্নাঘর থাকার ঘর থেকে আলাদা থাকত। মাঝখানে এক উঠোন ব্যবধান। একটা খেলনা দিয়ে খাটের ঘরের মেঝেতে আমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। একপর্যায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে আমি খাটের তলায়। সেখানে লম্বা-বেঁটে মিলিয়ে কয়েকটি কুপিবাতি। হারিকেনগুলো কাঠের থামে লটকানো। কাচের চিমনি দেওয়া বলে এই সাবধানতা। সন্ধ্যা হলে হারিকেন আর কুপি বা চেরাগবাতিগুলো যার যার মতো করে জ্বলে উঠত। আমার বেশি ভালো লাগত কুপিবাতি। মাথা দিয়ে কী সুন্দর লাল টকটকে আগুন বেরোয়, অল্প বাতাসে নাচে। একটা কুপি তুলে নিয়ে চুষতে শুরু করলাম। যেমন করে মায়ের দুধ খেতে আমি অভ্যস্ত। সলতে চুষতে চুষতে একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। তার মানে পুরোদমে অজ্ঞান।

আমার বা খেলনার সন্দেহজনক নীরবতায় মায়ের ভেতরটা ধুক করে উঠল। প্রথমে ডাকাডাকি, তারপর খোঁজাখুঁজি, তারপর চিৎকার। তখনকার দিনে আর্তস্বর শুনে সবাই ছুটে আসত। এসেও ছিল। কয়েক বাসা পরে নানার বাড়ি। তারাও এলো। সেই প্রথমবার মৃত্যু আমাকে গ্রহণ করল না।



২.

প্রথমবারের ব্যাপারটা ছিল অবুঝ শিশুসুলভ। পরেরটা অজ্ঞতার এবং অক্ষমতার। আমার বয়স তখন কত হবে- বড়জোর পাঁচ কি ছয়। তখন সাঁতার জানতাম না। আমরা যেখানে থাকতাম (পশ্চিম মাদারবাড়ী), সেখানে কর্ণফুলীর জোয়ারের পানি রেলবিটের ঢালু থেকে রাস্তাঘাট পর্যন্ত ভরিয়ে দিত। ওই তল্লাটের ছেলেপুলেগুলো মহা-উল্লাসে, জোয়ারের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কেউ তীর থেকে, কেউ রেলব্রিজ থেকে। কেউ কেউ ঝুপ্‌পুশ করে লাফ দিয়ে ডুবে থাকতে পারার প্রতিযোগিতা চালাত। কেউ কেউ গিঁট মেরে লুঙ্গিতে হাওয়া ঢুকিয়ে বেলুন বানাত, তারপর হাঁসের মতো ভাসত। ঘণ্টাকয়েক ধরে চলত উৎসবের জোয়ার। আমার কাজ ছিল সুপ্ত বাসনা দিয়ে তাকিয়ে দেখা।

বয়সে বছর কয়েকের ছোট হওয়ায় বড় ভাইয়েরা, বিশেষ করে জসীম ভাই চোখ লাল করে হুমকি দিত- 'খবরদার'।

কী আর করা! রাস্তার গর্তে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের ছলাৎ ছোঁয়াটুকু গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো প্রাপ্তি নেই। আমার এই অসহায় বেকারত্ব দেখে কারও কারও মায়া হয়েছিল। আমার নিষ্ফ্ক্রিয় নিয়মানুবর্তিতায় ওরা খুশি। এর পুরস্কারস্বরূপ ওরা আমাকে একটা কাজ দিল। সেই মহৎ কাজটা হলো ওদের জামাকাপড় গচ্ছিত রাখা।

ঘণ্টাখানেক ধরে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা বালকটির প্রতি মেহেরবানিস্বরূপ একসময় ওরা ডাঙায় উঠে আসত। কারও কারও চোখ রুই মাছের মতো লাল। একজন বলত- 'আমার শার্টটা'। আর একজন বলত- গেঞ্জিটা। একবার কে যেন বলছিল 'আমার লুঙ্গিটা'। ওরা যে লাল চোখে কথা বলত, সেটা রেগেমেগে যে বলত না- নিজে পানিতে নামার পর সেটা বুঝেছিলাম।

জামাকাপড় বুকে আঁজলা করে দিনের পর দিন ওদের আনন্দ দৃশ্য দেখা আর কত! কাপড় থেকে নির্গত ঘামের গন্ধে হঠাৎ একদিন আমার বালকমন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। বহুদিন ধরে মাতামাতি দেখেছি, মাতব্বরিও সহ্য করছি। আর নয়, সবকিছুর একটা সীমা আছে।

আমি কাপড়চোপড় মান্দারগাছের ডালে ভালোভাবে আটকে রাখলাম, যাতে বাতাসে উড়ে না যায়। তারপর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এক-পা দুই-পা করে আগ বাড়াতে লাগলাম। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম- ঘন ঘাসে আচ্ছাদিত ঢালুতে জোয়ারবাহিত পলি জমে এমন পিচ্ছিল হয়ে যায় যে, যা শ্যাওলার চেয়েও বিপজ্জনক। প্রমাণ পেতে দেরি হলো না। ঢালুতে আমার পা পড়তেই সুড়ূৎ করে এক্কেবারে তলায়। শুরু হলো আমার হাত-পা ছোড়া, চিৎকার, আর্তনাদ। নৈমিত্তিক সঙ্গীদের হইহল্লা মনে করে ওই চিৎকারে প্রথমে কেউ সাড়াও দিল না। আমার কান্নাময় চিৎকারে যখন 'ভাই, ভাই' আর্তস্বর শোনা গেল, তখনই একজন বুঝে ফেলল- 'আরে এ তো আমাদের ড্রেস-ব্যাংক!' ততক্ষণে পানি যা খাওয়ার খেয়ে নিয়েছি। কী জানি, এ কারণেই হয়তো আমি কোল্ড ড্রিঙ্কস খাইটাই না।

কিন্তু একটা দুর্ঘটনা যে সেদিন হতে পারত, এতে সন্দেহ নেই। আমার আর্তনাদ যদি আর কিছুক্ষণ আনন্দময় কোরাসের অংশ বলে গণ্য করা হতো, তবে তো গিয়েই ছিলাম। সেই দ্বিতীয়বারের মতো মৃত্যু আমাকে গ্রহণ করেনি।



৩.

সাঁতার না জেনে পানিতে নামার জন্য অনেক নিন্দামন্দ শুনতে হয়েছে। এ কথা ঠিক যে, সাঁতার না জেনে পানিতে নামাটা ঠিক হয়নি। কিন্তু পানিতে না নেমে সাঁতার শিখব কী করে?

মুরব্বিরা শাসালেন। মাথা নেড়ে কথাও দিলাম নামব না। এত দ্রুত কথা দিলাম যে, উপস্থিত দুই-একজন বিশেষ করে, রফিক ভাইয়ের সন্দেহ হলো। আদেশ অমান্য করার সম্ভাব্য অপরাধ হালকা করার উদ্দেশ্যে রফিক ভাই আমাকে সাঁতার শেখাবেন বলে ঠিক করলেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্ররূপে যুগীচাঁদ মসজিদের পুকুরটাই নির্বাচন করা হলো।

যথাস্থানে গেলাম। রফিক ভাই সংক্ষিপ্ত একটা লেকচার দিলেন। তারপর ছাগলের বাচ্চার মতো আমাকে পাঁজাকোলা করে জলের চাতালে ধরা হলো। আমিও নিয়মমাফিক হাত-পা ছুড়তে থাকলাম আনাড়ির মতো। রফিক ভাইয়ের নির্ভরযোগ্য হাত ইচ্ছাকৃতভাবে হঠাৎ হঠাৎ আলগা হয়ে যেত। এভাবে কয়েক ঢোক পানি খাওয়ার বিনিময়ে পানিতে না ডোবার ক্ষমতাটুকু অর্জন করলাম। অল্পবিদ্যা যে অন্যদের জন্যও ক্ষতিকর, আমার সুবাদে তা যুগীচাঁদ মসজিদের মুসল্লিরা টের পেয়েছিলেন।

স্কুল ছুটি হতো বারোটায়। স্কুলের ঠিক পেছনেই পুকুরটা। ছুটির ঘণ্টা বাজতেই পুকুরের পানি বোধ হয় আমার ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠত। বইখাতা বাসায় রেখে আসতে বড়জোর চার মিনিট। এর পরেই আমার ভয়ংকর উপস্থিতি। তারপরই পুকুরের বুক-কাঁপানো এক শব্দ- 'ঝুপ্‌পুশ'।

পৌরাণিক দেবতা আর অসুররা মিলে কবে নাকি সমুদ্র-মন্থন করেছিল লক্ষ্মীকে পাওয়ার জন্য। আমি এতই লেট কামার যে, লক্ষ্মীকে পাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া আগে থেকেই লক্ষ্মীছাড়া বলে তিরস্কারটা শুনতে হয়েছে।

যা হোক, ভাগ্যে যখন ক্ষীরসমুদ্র নেই, তখন মসজিদের পুকুরটাকেই ক্ষীরপুকুর বানিয়ে ছাড়তাম। তলানির সমস্ত কাদা ঘোলেদইয়ে একাকার। পানি যত সাদা হয়, চোখ তত লাল।

হঠাৎ জোহরের আজান। বিদ্যুৎবেগে পাড়ে উঠে লুঙ্গি নিয়ে চোঁচাঁ দৌড়। একে একে নামাজিরা আসেন অজু করতে। ঘাটে এসে বুঝতে কারও বাকি থাকে না- একটু আগে কে এসেছিল। বারোটার সময় ছুটি-পাওয়া মাস্টার সাহেবের পঞ্চম রত্নই যে পুকুরটার বারোটা বাজিয়ে গেছে- এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ ছিল না। একপর্যায়ে নালিশ উঠল। ভাগ্য ভালো, গুরুতর আরও একটা নালিশ উঠতে পারত; ওঠেনি।

একবার আমার সঙ্গী লেদিয়াকে একশবার কানে ধরে ওঠবস করতে হয়েছে। পুকুরপাড়ে সে পেচ্ছাব করেছিল- এটা অন্যের চোখে পড়েছে। উচিত হয়েছে। দেখিয়ে দেখিয়ে পেচ্ছাব করার কী দরকার ছিল! স্থলভাগ ভেজানোর মতো বোকামি আমি করিনি। তারপরও, পানিকে কাদাময় করার অপরাধে কানে ধরে উঠতে বসতে হয়েছে।

একদিন পাড়ে উঠে দেখি লুঙ্গিটা যথাস্থানে নেই। সেটা ঝুলছে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আলম নানার আঙুলের চিমটিতে। আবার কানে ধরা, আবার ওঠবস। ওই দিনই পুকুরপর্বের বিরতি।



৪.

এরপর একেবারে কর্ণফুলী। ঢুকতাম পাকিস্তান বাজার দিয়ে, এখন যেটাকে বাংলাবাজার বলে। কর্ণফুলীর পাড়ঘেঁষে মোটা মোটা কাঠের খামের ওপর উঁচু উঁচু গুদামঘর। এগুলোর ওপর খামের সঙ্গে সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত নানারকম নৌকা। গুদামের ছাদে উঠে আমরা কজন সোজা লাফিয়ে পড়তাম নদীতে। কখনও কখনও চৌকিদারের তাড়া খেতে হতো।

জোয়ারের সময় পানি উপচে উঠত। তখন লাফ দিতে আরও মজা। একবার লাফ দিয়ে প্রায় ডুবেই গিয়েছিলাম। আমার একটা পা কয়েকটা দড়ির প্যাঁচে আটকে গিয়েছিল। টানটান দড়ি। কীভাবে যে ভেসে উঠতে পেরেছিলাম, তা নিয়ে আজও উত্তর পাই না। সেবারও যখন পানি আমার মৃত্যু রচনা করেনি, তখন ভাবি আর মনে হয়- পানি আমার মৃত্যু চায় না।

খানিকটা বড় হয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর গল্পে সাঁতার কাটলাম। আরও একটু বড় হলাম। ছড়া, পদ্য-গল্প বানাতে লাগলাম। আরও বড় হলাম। প্রোটোপ্লাজ-এমিবার বর্ণনা পড়তাম। 'পানির অপর নাম জীবন'- কথাটা নানাভাবে আমার মনের উপকূলে ছলাৎ ছলাৎ করে আছড়ে পড়ে। আমিও ঘুমের ঘোরে 'পানি, পানি' বলেছি বহুবার। আমার মনের ভূগোলে সমস্ত রহস্যের উৎস ওই তিনভাগ জল। ছোটবেলায় নাবিক হওয়ারও স্বপ্ন ছিল। আমার সেই স্বপ্নের ভেলা আজও ভেসে যাচ্ছে শব্দের জলে কল্লোলে। কবিতা লিখতে বসলে, মনে হয়, এখনও আমার শব্দগুলো ভিজে যায়, আর্দ্র হয়। কবিতারা যেন কৃতজ্ঞতা জানায় যুগীচাঁদ মসজিদের পুকুরকে, যেখানে এখন রাফসের মতন বহুতল ভবন। ভাগ্য ভালো, কর্ণফুলী আজও বহমান। কৃতজ্ঞতা জানাই তার লবণাক্ত জোয়ারকে, স্কুলের মাঠে আর রাস্তায় উপচে পড়া তার ঢেউকে। জলে কল্লোলে মাতোয়ারা আমার সেই জীবন, আমার অবিস্মরণীয় সম্পদ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com