জল থইথই সিলেট নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৯ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২২ । ১২:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

নগর-মহানগরে জলাবদ্ধতা জনজীবনে কী দুর্ভোগ-দুর্গতি ডেকে আনে- এই তিক্ত অভিজ্ঞতা রাজধানী থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের আরও কয়েকটি নগর ও শহরবাসীর রয়েছে। ১৭ মে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফের এই দুর্ভোগের চিত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আগের দু'দিন বৃষ্টিপাতের ফলে শাহজালাল উপশহরে যে চিত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তাতে কোনোভাবেই বলার উপায় নেই- নগরীর ওই এলাকা একটি অভিজাত আবাসন। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে বাড়িঘর জলে থইথই। সিলেটের কয়েকটি উপজেলাও বন্যাকবলিত। সুরমা নদীর পানি উপচে নদীতীরবর্তী দু'কূলবাসীর অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি।


বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে এরই মধ্যে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সিলেট ভারত সীমান্তের ভাটি অঞ্চল। উজানের পানির চাপ তো আছেই, পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ফলে নগরবাসীর কপালে দুর্ভোগ-দুর্দশার ভাঁজ সংগতই প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- জল নিস্কাশনের সব উদ্যোগ-আয়োজন কি জলেই তলিয়ে গেল! শত শত কোটি টাকার এ কোন উন্নয়নযজ্ঞ হলো, কার্যত যা পরিহাসের বিষয় হয়েই রইল শেষ পর্যন্ত? একটি বিভাগীয় নগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার এমন বেহাল চিত্র, জলাধারের দুরবস্থা, সুরমা নদীর নাব্য হ্রাস ইত্যাদির বিরূপ ফল নগরবাসীকে যেভাবে ভোগ করতে হচ্ছে, তাতে সম্পন্ন হওয়া এবং চলমান উন্নয়নযজ্ঞ নিয়ে তো প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। এ কোন পরিকল্পনা-মহাপরিকল্পনার মাশুল গুনছেন নগরবাসী?


শুধু জলজটই নয়, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি জনদুর্ভোগ আরও প্রকট করে তোলে। বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ-২-এর আওতাধীন সিলেট উপশহর বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটিও সুরক্ষিত নয়। অরক্ষিত, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এই বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটি জলগ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে না হয় মানুষের হাত নেই, কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট কার্যকারণে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার দায় কীভাবে এড়াবেন সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা? সিলেট নগরীর মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের উচ্ছল সুরমা নদীবক্ষ এখন এত ভরাট হয়ে গেছে যে, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের জল টানার মতো সাধ্যিও তার নেই। এই নদীর খননকাজও হবে-হচ্ছের জটে আটকে আছে। নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খাল, নালা, ছড়া উদ্ধার এবং প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করে জল নিস্কাশনের পথ মসৃণ করতে সমকালের খবর অনুসারে সরকার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং গত ৯ বছরে ধাপে ধাপে আরও অর্থ বরাদ্দ হলেও জলাবদ্ধতার নিরসন হয়নি!


আমরা জানি না পরিকল্পনাবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের মস্তিস্কজাত এ কোন যজ্ঞ চলছে সিলেট নগরীতে বছরের পর বছর; যা মানুষের দুর্ভোগ তো লাঘব করেইনি, উপরন্তু আরও প্রকট করেছে! শত শত কোটি টাকা খরচ করে ভূপ্রকৃতিগতভাবে অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ নগরী সিলেটকে কেন আজও মনুষ্য বসবাসের উপযোগী করা যায়নি- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় এড়ানোর অবকাশ কি সংশ্নিষ্টদের আছে? করের বিনিময়ে এ কোন দুর্বিষহ জীবনযাপন?


জলজট, যানজটের মতো পুরোনো ব্যাধিগুলোর প্রেক্ষাপটে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কি বারবার শুধু উচ্চারিত হবে সার্বিক ব্যর্থতার আরেকটি মাইলফলক? সাংবার্ষিক বর্ষায় জলাবদ্ধতা নগরবাসীর জন্য নগর কর্তৃপক্ষের উপহার বলে ধরে নিতে হবে? বছরের পর বছর গত হয়, কারও কোনো জবাবদিহি নেই! শুধু খামখেয়ালি নগরায়ণ ও অকেজো ব্যবস্থাপনার আর কত খেসারত দিতে হবে নগরবাসীকে? যে বৃষ্টি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য, সেই বৃষ্টিই নগরীতে কেন অভিশাপ ডেকে আনছে? কর্তৃপক্ষের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি কি নির্মম পরিহাস করছে না? যে দুর্ভোগের কারণ মনুষ্যসৃষ্ট, তা কেন নিয়তি বলে মেনে নিতে হবে?

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু: সাংবাদিক ও লেখক
deba_bishnu@yahoo.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com