১২ কেন্দ্রে উত্তরপত্র ছড়ান সাইফুল

প্রশ্নপত্র ফাঁস

প্রকাশ: ১৮ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৮ মে ২২ । ০২:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশেষ প্রতিনিধি

সাইফুল ইসলাম

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। তাঁদের পরিকল্পনায় পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র নির্বাচিত ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এবারের জালিয়াতিতে গতকাল পর্যন্ত বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের দু'জন কর্মকর্তার সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেলেও তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দুই কর্মকর্তাকে বাঁচাতে নানা জায়গা থেকে তদবির শুরু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন পটুয়াখালী সরকারি কলেজের শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম। তিনি ৩৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা। তবে একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, গতকাল রাতে রাশেদুলকে আটক করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি আজ জানাতে পারে পুলিশ। এই চক্রের আরেকজন ৩১তম বিসিএসের কর্মকর্তা। তিনিও মাউশিতে কর্মরত। এ ছাড়া খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম একাই পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগে ১২ কেন্দ্রে তাঁর নির্বাচিত পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তরপত্র পাঠিয়েছেন।

ডিবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নপত্র ও তার উত্তরপত্র পাঠিয়ে অনেক আলামত ডিলিট করে দেয়। চারটি ধাপে তারা সক্রিয় ছিল। প্রথম ধাপে ছিলেন পটুয়াখালী সরকারি কলেজের কম্পিউটার অপারেটর সুমন জমাদ্দার। দ্বিতীয় ধাপে কাজ করেন সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম। তৃতীয় ধাপে ছিলেন মাউশির এক কর্মকর্তা। চতুর্থ ধাপে কাজ করেন মাউশির উচ্চমান সহকারী আহসান হাবীব, অফিস সহকারী নওশাদ, বদরুন্নেসা কলেজের কর্মকর্তা মকবুল হোসেন ও তিতুমীর কলেজের বুক সেন্টারে কর্মরত আব্দুল মালেক।

ডিবির গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের সব সদস্যকে ধরতে ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগেও সরকারি-বেসরকারি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন উইং) ও নিয়োগ নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের কাজটি মাউশি একাই করেছে। মুদ্রণের সময় প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ধারণা করছি, কেন্দ্রে বিতরণের সময় কেউ ফাঁস করেছে। আমরা দেখেছি, ২টা ১৮ ও ২টা ২৬ মিনিটে উত্তরপত্র কারও কারও কাছে গেছে। পরীক্ষা শুরু হয় ৩টায়।

শাহেদুল খবির আরও বলেন, ঢাকার ৬১টি কেন্দ্রে সাড়ে ১১টা থেকে প্রশ্নপত্র বিতরণ শুরু হয়। পুলিশ যাদের ধরেছে তাদের মধ্যে প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে কেউ ছিল না।

তবে কেন্দ্রে বিতরণের সঙ্গে ছিলেন এমন একজন আছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরীক্ষা বাতিল করা হবে কিনা- এ সিদ্ধান্ত নিতে শিগগিরই কমিটির সদস্যরা বসব। সুবিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মাউশির অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় পদের সংখ্যা ৫১৩। পরীক্ষার্থী ছিলেন ১ লাখ ৮৩ হাজার। একযোগে ৬১টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একেকটি পদে গড়ে প্রতিযোগিতা করেছেন ৩৫৭ জন।

তদন্তসংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার পরীক্ষার সময় হাতেনাতে সুমন জমাদ্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি প্রশ্নপত্র, একটি উত্তরপত্র ও একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। ওই মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে পরীক্ষা শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগে ৭০টি প্রশ্নের উত্তরপত্র পাঠানো হয়।

ডিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের আরও কিছু আলামত তাঁরা পেয়েছেন। ওই আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার কাজও শুরু হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা এরই মধ্যে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, মাউশির কর্মকর্তারা তাদের এ কাজে জড়ান। প্রশ্নপত্র ফাঁস করার পর কে কীভাবে লাভবান হবে, আগেই থেকে একাধিক বৈঠকে তার ছক কষা হয়। তাঁদের টার্গেট করা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫-৭ লাখ টাকা করে নেওয়ার কথা ছিল। একশর মতো পরীক্ষার্থী তাঁরা ঠিকঠাক করে রাখেন।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও গতকাল পর্যন্ত পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা আসেনি। এরই মধ্যে পুলিশের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা মাউশির মহাপরিচালকসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য দেন।

পুলিশের তদন্তসংশ্নিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, এই চক্রের অন্যতম সদস্য সাইফুলের কাছ থেকে ১২টি কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র গেছে বলে তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন তাঁরা। যেসব পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র আগেই পেয়েছেন তাঁদের তালিকা করা হচ্ছে। সমীর ও সান নামে পটুয়াখালীর দুই শিক্ষার্থীকে খোঁজা হচ্ছে, যাঁরা সাইফুলের কাছ থেকে উত্তরপত্র পেয়েছেন।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি পরীক্ষায় এর আগে বিভিন্ন সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য হচ্ছে। চুনোপুঁটিরা বারবার ধরা পড়লেও আইনের আওতার বাইরে থাকছেন রাঘববোয়ালরা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com