কুমিল্লা সিটি নির্বাচন

সাক্কুর সামনে তিন বাধা

প্রকাশ: ১৭ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৭ মে ২২ । ০১:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

কামরুল হাসান

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের মাঠে। তবে 'ধানের শীষ' ছাড়া লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়ে ভোটের মাঠ 'গরম' রেখেছেন আগেরবারের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু।

কুমিল্লার ভোটাররা কখনোই তাকে বিমুখ করেননি। তবে গত দু'বারের মেয়র সাক্কুকে এবার বিজয়মঞ্চে উঠতে হলে ডিঙাতে হবে তিন বাধা। এক, ঘরোয়া আগুন নিভিয়ে নিজেকে একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। দুই, অভিমানে দূরে সরে যাওয়া নেতাকর্মীদের কাছে টানা। তিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দলের নীরব সমর্থন আদায়। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, এসব সংকট জিইয়ে থাকলে 'নগরপিতা' হওয়ার লড়াইয়ে এবার সাক্কুর ঘাম ছুটবে। নেতাকর্মীরা জানান, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় অনৈক্য আর বিএনপির ঐক্যবদ্ধ ভূমিকায় সাক্কু অনায়াসে মাথায় তোলেন মেয়রের মুকুট। এবারের ছবি একেবারেই উল্টো। আওয়ামী লীগে এখন অনেকটাই ঐক্য। আর বিএনপির ঘরে তুষের আগুন। এরই মধ্যে 'সাক্কু ঠেকাও' স্লোগান তুলে কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে ভোটের মাঠে ঘূর্ণি বয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে সাক্কু বলয়ের প্রবল বিরোধ। নির্বাচন নিয়ে দলের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন দুই মেরুর দুই নেতা। দল থেকে এই দুই নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পরও কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা মহানগরে বিএনপি দৃশ্যত দুই টুকরো। এক অংশের নেতৃত্বে সাক্কু, আরেক পক্ষের নেতা সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুর রশীদ ইয়াসিন। কায়সার হলেন ইয়াসিনের শ্যালক। সাক্কু ও ইয়াসিনের বিরোধ প্রকট। দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে দলীয় সভা আলাদা স্থানে হয়ে আসছে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লা সদর আসনে বিএনপি ইয়াসিনকে প্রার্থী করে। সে সময় তিনি নেতাকর্মী নিয়ে সাক্কুর বাসায় যান। বাসায় থেকেও দেখা করেননি মেয়র। এরপর থেকে ওই বিরোধ 'দা-কুমড়া' হয়ে ওঠে।

নেতাকর্মীরা জানান, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে টানা তিনটি ভোটে সহজ জয় পাওয়া সাক্কুকে গত বছর দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নিষ্ফ্ক্রিয়তার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তখন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে বিএনপির নেতাকর্মীরাও তাকে অনেকটা এড়িয়ে চলছেন। সিটি করপোরেশন এলাকার ২৭ ওয়ার্ড কমিটিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাঁর বিরুদ্ধে। এই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থকদের সব ভোট সাক্কুর ব্যালটে পড়ছে না, তা অনেকটাই নিশ্চিত।

বিএনপির ভোট ব্যাংকে এবার দুই নেতা ভাগ বসাবেন বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় নেতারা জানান, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আগেরবারের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের পদচারণা, দিকনির্দেশনা থাকছে না। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের মতো কুসিকেও দলীয় নেতাকর্মীদের ভোটের মাঠে না থাকার নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। এতে দলের কট্টরপন্থি নেতাকর্মীরা ভোটের কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার কৌশল নিতে পারেন। তাদের নির্বাচনের স্রোতে নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ডিঙ্গাতে হবে সাক্কুকে। আমিনুর রশীদ ইয়াসিনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার চ্যালেঞ্জও রয়েছে সাক্কুর সামনে। এই বিবাদ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা।

এর বাইরে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচনে যাওয়ায় সাক্কুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার অনুসারী নেতাকর্মীদের মধ্যেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই নির্বাচনের আগে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে দলকে বিরত রাখার কৌশল হিসেবে তিনি নিজেই দল থেকে পদত্যাগ করবেন বলে সাক্কু ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ সিদ্ধান্তে অনুসারী নেতাকর্মীদের মধ্যে দল থেকে অব্যাহতি কিংবা বহিস্কারের ভীতি দূর করা সম্ভব হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কুমিল্লা পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। ২০১২ সালে করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর কাছে আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা আফজল খান ৩৫ হাজার ভোটে হেরে যান। ২০১৭ সালে দলীয় প্রতীকে প্রথম ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করে প্রভাবশালী নেতা আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে। এ নির্বাচনেও সাক্কু জয় পান ১১ হাজারের কিছু বেশি ভোটে।

এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারী। কুমিল্লা আওয়ামী লীগে আফজল-বাহারের বিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। ২০২১ সালে আফজল খান মারা যাওয়ার পর তার অনুসারীরা এখন দৃশ্যত প্রভাব হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ অনেকটা মিইয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে অন্যবারের মতো আওয়ামী লীগের কোন্দল থেকে বিশেষ সুবিধা না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সাক্কুর।

বিএনপির ভোট বর্জনের ঘোষণার মধ্যেও নির্বাচনে লড়ার ব্যাপারে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, 'আমি দল থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করব। ২০১২ সালেও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকাকালে অব্যাহতিপত্র নিয়ে নির্বাচন করেছি। পরে দল আবারও আমাকে নিয়েছে। এবারও কুসিক নির্বাচনে লড়তে বিএনপি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।' তিনি বলেন, 'অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে শেষবারের মতো মেয়র পদে নির্বাচন করব। ভবিষ্যতে আর নির্বাচন করব না।'

সাক্কুকে চ্যালেঞ্জ জানানো নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, 'আমি আগামীর সুন্দর কুমিল্লা নগরী গড়তে নির্বাচন করব। দলের নেতাকর্মীরা দলের আরেকজনের মাধ্যমে নির্যাতিত। আমি সেইসব নেতাকর্মীর জন্যও নির্বাচনটা করব।'

বিএনপিতে এই বিভেদ নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বলেন, 'দল নির্বাচনে যাচ্ছে না। এখন কে নির্বাচনে অংশ নেবে, কে নেবে না- সেটা তাদের ব্যাপার। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ নির্বাচন করলে দল তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।'

কুসিক নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা নেওয়ার শেষ দিন আজ। বৃহস্পতিবার হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ২৭ মে প্রতীক বরাদ্দ আর ১৫ জুন হবে ভোট। নির্বাচনে ১০৫ কেন্দ্রে ৬৪০টি ভোটকক্ষ থাকবে। এই সিটিতে দু'জন তৃতীয় লিঙ্গেরসহ মোট ভোটার দুই লাখ ২৯ হাজার ৯২০ জন।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com