পি কে হালদারদের অভয়াশ্রম গড়ে দেয় কারা?

প্রকাশ: ১৭ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২২ । ১৮:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবু আহমেদ

আবু আহমেদ

দেশে আর্থিক কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে সর্বাধিক আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার তথা পি কে হালদার ও তাঁর পাঁচ সহযোগীকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সে দেশের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ১৪ মে গ্রেপ্তার করেছে। তারা তাঁর এবং ওই পাঁচ সহযোগীর কাছ থেকে যেসব তথ্য এরই মধ্যে বের করে এনেছে, তা রীতিমতো রহস্য-উপন্যাসকেও হার মানায়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তাঁর বেশ কয়েকটি প্রাসাদোপম বাড়িসহ যে সম্পদের হিসাব এরই মধ্যে বের হয়েছে এবং তাঁর নাগরিকত্ব কার্ডসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক আরও যেসব কাগজপত্র জব্দ করেছে; তাতে বোঝা যায়, পি কে হালদারের কালো হাত কতটা প্রসারিত।

হয়তো আমরা আরও অনেক কিছুই জানব তাদের তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলে। কিছুদিন আগে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জেনেছি, দেশে তাঁর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- একজন পি কে হালদার কি শুধু কতিপয় ক্ষমতাবানের আশীর্বাদেই দুর্নীতির এ রকম মহিরুহ বনে গেলেন? এর পেছনে কি আমাদের আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির ভয়াবহ অন্ধকার ফের উন্মোচিত হলো না?


পি কে হালদার দেশে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে; কোনো কোনোটি প্যাডসর্বস্ব, তাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে; কীভাবে এত বেনামি ঋণ নিলেন? শেয়ারবাজারে দাপটে বেড়ালেন? কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা কেলেঙ্কারি করে দেশ থেকেই পালালেন? শোনা যাচ্ছে, শুধু ভারতে গিয়েই তিনি তাঁর 'আরেক সাম্রাজ্য' গড়ে তোলেননি; কানাডায়ও নাকি তাঁর এমন জাল বিস্তৃত। তিনি এত বড় অপরাধ করেও দিব্যি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও দেশ ঘুরে বেড়ালেন; ভারতে এত বড় সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন; তা যে ভারত-বাংলাদেশের অতি ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদ ছাড়া অসম্ভব- তা সহজেই অনুমেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শুধু হাজার কোটি টাকার জমিই রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যম যেসব চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে প্রশ্ন উঠবেই- দায়িত্বশীল এত সংস্থার চোখে ধুলো কি পি কে হালদার আশীর্বাদের হাতের স্পর্শ ছাড়া দিতে পেরেছে?


বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি নতুন নয়। জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু সুফল কি মিলেছে? বিদেশে অর্থ পাচার কি বন্ধ হয়েছে? বিদেশে অর্থ পাচারের দায়ে কারও বিরুদ্ধে কি দৃষ্টান্তযোগ্য কোনো দণ্ড আমাদের সামনে আছে? অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা ৩৬টি মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এও কি বিস্ময়কর নয়? পি কে হালদারের কাছে ভারতীয় জাতীয় পরিচয়পত্রের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। সবকিছু মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়নে নিঃসন্দেহে বলা যায়, পি কে হালদার এক দিনে এত দুস্কর্মের হোতা বনেননি। তিনি ধাপে ধাপে দুস্কর্মের চূড়ায় উঠেছেন এবং এ ক্ষেত্রে সরল বিশ্নেষণে বলা যায়, সব ক্ষেত্রে তিনি ক্ষমতবান কারও না কারও কৃপাধন্য হয়েছেন।


সংবাদমাধ্যমেই দেখলাম, পি কে হালদারকে ফেরাতে রাষ্ট্রীয় কয়েকটি সংস্থা তৎপর হয়ে উঠেছে। নজিরবিহীন আর্থিক কেলেঙ্কারির এই হোতাকে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁকে সহায়তাকারী অনেকের নামই বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ সংশয় ও প্রশ্ন থেকেই যায়- তাঁরা কি আড়ালে চলে যাওয়ার পথও বাতলে নেবেন? আমাদের অভিজ্ঞতা তো এসব ক্ষেত্রে সুখকর নয়!


পি কে হালদারকে কীভাবে ফেরানো যাবে? কতদিন লাগবে? পাচারকৃত অর্থ কীভাবে আনা যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে ভবিষ্যতের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি সংস্থার দায়িত্বশীলদেরও এ ব্যাপারে জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এক দিনে, এক মাসে কিংবা এক বছরেও পি কের কেলেঙ্কারির খতিয়ান এত বিস্তৃত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেই যে তিনি তাঁর কালো হাত এত প্রসারিত করতে পারলেন; তাতেও সেখানকার বলবান কারও কারও হাত যে ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাঁরা যদি সর্বক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা না করে, তাহলে পি কে হালদারকে দেশে ফেরানোসহ অনেক কিছুই জটিলতার বৃত্তবন্দি থাকবে। এ ক্ষেত্রে দরকার জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা ও উভয় দেশের পি কের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।


২০১৯ সালে ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় পি কে হালদারের নাম সামনে এসেছিল। তখন সংবাদমাধ্যমেই দেখেছিলাম; এই পি কে একটি বা দুটি নয়, অনেক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন। আমরা দেখছি, দেশে একের পর এক এ রকম আর্থিক জালিয়াতি বা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও সব সময় অপরাধীরা 'হাওয়ায়' মিলিয়ে যাওয়ার পর এসব খবর প্রকাশ্যে আসে। কেন? কী করেন আর্থিক খাতের সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলরা? তাঁরা কেন আগেভাগে কেলেঙ্কারি কিংবা জালিয়াতির ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে পারেন না? এর দায় তাঁরা এড়াতে পারেন কি?


জালিয়াত চক্রের শিকার ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সমগুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ এবং অর্থ বেহাত হওয়ার পরও কেন এসব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তযোগ্য উদাহরণ নেই- এ প্রশ্নের জবাবও সরকারের দায়িত্বশীলদের দিতে হবে। বাগাড়ম্বর তো আমরা এসব ক্ষেত্রে কম শুনিনি এ পর্যন্ত; কিন্তু কাজের কাজ কতটা হলো- এ প্রশ্নের উত্তরও নিহিত বিদ্যমান পরিস্থিতির গর্ভে। এভাবে কি নিশ্চিত করা যায় ন্যায়বিচার কিংবা আইনের শাসন?


প্রশ্ন আছে অনেক। যথাযথ উত্তর মিলবে না অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু এভাবে আর কত? এসবের নিরসন হোক। দায়িত্বশীলরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হলে পি কে হালদাররা এভাবে কেলেঙ্কারি করতে পারতেন না। প্রভাবশালীদের প্রভাবের পথ যে পর্যন্ত রুদ্ধ করা না যাবে সে পর্যন্ত পিকেরা জন্মাতেই থাকবে। ওই আঁতুড়ঘর ভাঙতে হবে। প্রভাবশালীদের প্রভাব বিস্তারের হাত গোটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ রকম পি কে হালদার যে আর নেই, তা তো নয়। এই জাতীয় শত্রুদের কোনো ছাড় বা অনুকম্পা তো নয়ই; পাশাপাশি তাঁদেরও (সরকারি-বেসরকারি) শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যারা পি কে হালদারদের জন্য গড়ে দেয় অভয়াশ্রম।


আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক খাত বিশ্নেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com