দিবস

উচ্চ রক্তচাপ এক নীরব ঘাতক

প্রকাশ: ১৭ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২২ । ১৮:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মো. শামীম হায়দার তালুকদার

মো. শামীম হায়দার তালুকদার

উচ্চ রক্তচাপ অসংক্রামক রোগে বৈশ্বিক মহামারির একটি চালিকাশক্তি এবং বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ও অক্ষমতার প্রধান ঝুঁকির কারণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী অর্ধেকেরও কম প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাদের উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে সচেতন। বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালন করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ এবং এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগ দিবসটির সূচনা করেছিল। ২০০৫ সালের ১৪ মে প্রথম উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হয়। এর পর ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর ১৭ মে পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো উচ্চ রক্তচাপের কারণে হতে পারে এমন গুরুতর চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে জানানো। উপরন্তু উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক ও দরকারি তথ্য প্রদান। প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। ২০২২-এর প্রতিপাদ্য- 'আপনার রক্তচাপ সঠিকভাবে পরিমাপ করুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘায়ু লাভ করুন।'


উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন আসলে কী? দ্রুত প্রবাহিত রক্ত যখন ধমনির দেয়ালে চাপ সৃষ্টি করে তখন তাকে রক্তচাপ বলে। এটি হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে উচ্চ রক্তচাপে মৃত্যুও হতে পারে। ১৪০/৯০-এর ওপরে রক্তচাপ সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। রক্তচাপ ১৮০/১২০ হলে গুরুতর অবস্থা হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উচ্চ রক্তচাপ সারাবিশ্বে কার্ডিও ভাস্কুলারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়।


উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাই বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। লক্ষ্য করা গেছে, উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং সম্পদ-সমৃদ্ধ উন্নত দেশগুলোতেও রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতার মাত্রা খুব কম। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের উচ্চ রক্তচাপের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বাস করে। উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বেশি। বাংলাদেশ সেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে একটি। একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত এবং ফাস্টফুডে রূপান্তর, উন্নত আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, জনাকীর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন এবং দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শারীরিক চলাচলের অনুপস্থিতি উচ্চ রক্তচাপের জন্য বহুলাংশে দায়ী।


সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মহিলা এবং ৩৪ শতাংশ ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ২০১১ সালে একই বয়স গ্রুপের জন্য এই হার ছিল যথাক্রমে ৩২ ও ২০ শতাংশ। গবেষণায় দেখা যায়, বয়স্ক ব্যক্তি, মহিলা, শহরে বসবাসকারী এবং উচ্চশিক্ষা বা সম্পদের অধিকারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বেশি। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝেও উচ্চ রক্তচাপের ব্যাপকতা বেশি। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের উচ্চ রক্তচাপ আছে। তবে তাদের বেশিরভাগই এটি সম্পর্কে অসচেতন। কেউ কেউ অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।


উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বেড়েছে কিন্তু সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণের মাত্রা কম। গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কমাতে দরকার কার্যকর সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে উচ্চতর প্রকোপ, কম সচেতনতা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণগুলোকে মোকাবিলা করা। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব হ্রাস করা। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সচেতনতা বাড়াতে গ্রামীণ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে প্রথমেই যা করতে হবে, তা হলো জীবনাচরণে পরিবর্তন। লবণ কম খেতে হবে; পাতে আলাদা লবণ একদম খাওয়া চলবে না। ওজন বেশি থাকলে কমিয়ে ফেলতে হবে। তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। বাদ দিতে হবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং কোমল পানীয়। বেশি করে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। কায়িক শ্রম বাড়াতে হবে। দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা ভালো। জীবনযাপনে এটুকু পরিবর্তন আনলেই রক্তচাপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসে আমাদের প্রত্যাশা মিডিয়াতে উচ্চ রক্তচাপের কারণ, ক্ষতি এবং নিরাময় সম্পর্কে আরও বেশি প্রচারণা বাড়ানো হোক। কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক ও আরবান হেলথ কেয়ার সেন্টারগুলোতে পর্যাপ্ত রক্তচাপ পরিমাপক থাকুক, যাতে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে যে কোনো সময়ে রক্তচাপ পরিমাপ করতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের দাম কমানো হোক।

প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই এসব খাবারের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে।


ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার: সিইও, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com