পি কে হালদার গ্রেপ্তার

ভারত থেকে ফেরানোর প্রক্রিয়া হবে সরল

প্রকাশ: ১৬ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৬ মে ২২ । ০২:৫৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক ও কলকাতা প্রতিনিধি

পি কে হালদার

ভারতের অর্থ গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) অন্তত ২২ মামলায় আটকে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পাচার করা আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারসহ তাঁর সহযোগীদের। তবে পি কে হালদারকে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে অভিযোগপত্রে মামলার সংখ্যা কমাবে ইডি। ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট থাকা আসামি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনকে প্রাধান্য দিয়ে পাসপোর্ট অ্যাক্ট, মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট, ফরেনার্স অ্যাক্টসহ ৮-১০টি মামলার আসামি হিসেবে প্রাথমিক অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারে ভারতীয় সংস্থাটি।

পি কে হালদারকে দেশে ফেরাতে হলে আপাতত অপেক্ষা করতে হবে ভারতের আদালতে বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারী এই আসামিদের সবকটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত এবং সাজা ঘোষণা পর্যন্ত। এর পরই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় সাজার মেয়াদ বাংলাদেশের জেল হেফাজতে পূরণ করার শর্তে দেশে ফেরানো যেতে পারে পি কে হালদারসহ বাকি ছয় অভিযুক্তকে।

কলকাতার আইনজীবী তুহিন সিংহ রায় বলেছেন, স্বাভাবিক নিয়মে অভিযোগপত্র হালকা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে এই আসামিদের দেশে ফেরানোর ব্যাপারে বড় চাপ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে অনেক কিছুই।

এর আগেও বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের আসামি নূর হোসেন, দিল্লির তিহার জেলে বন্দি থাকা বাদল ফারাজিকে দেশে ফিরিয়েছে বাংলাদেশ। নূর হোসেনের ক্ষেত্রে অস্ত্র আইন ও ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলা ছিল। যাবজ্জীবন সাজার আসামি বাদল ফারাজির ক্ষেত্রে ছিল সরাসরি খুনের অভিযোগ। দুই ক্ষেত্রেই ভারতের আদালতে ঘোষিত সাজার মেয়াদ বাংলাদেশে শেষ করতে হবে- এমন শর্তেই দুই আসামিকে ফেরত পেয়েছিল বাংলাদেশ। এদিকে, নূর হোসেনের বদলে পাঠানো হয়েছিল উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে।

এদিকে, গতকাল রোববার জেরার মুখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পি কে হালদার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইডি কর্মকর্তা সমকালকে জানান, দীর্ঘ জেরায় তিনি দাবি করেছেন, ভুল পথে পরিচালিত করেছে তাঁর সহযোগীরা।

ইডি সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গেছে, আসামিদের জেরার সময় বারবার উঠে এসেছে পি কে হাওলাদারের আইনি ও আর্থিক পরামর্শদাতা সুকুমার মৃধার নাম। মূলত সুকুমারের পরামর্শেই হালদারের মাধ্যমে দুই ভাই স্বপন মিত্র ও উত্তম মিত্র ভারতে টাকা পাচার করে। পাচার করা অর্থ সুকুমার মৃধার তত্ত্বাবধানেই বিনিয়োগ করা হয় ভারতের বিভিন্ন শহরে। শনিবার আসামিদের নিয়ে কলকাতা, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও বর্ধমানে হালদারের ছড়িয়ে থাকা সম্পত্তি শনাক্তে অভিযান চালালেও সব সম্পত্তির হদিস দিতে পারেনি ছয় অভিযুক্তের কেউই। জেরার পর গতকাল হেফাজতে থাকা পাঁচ আসামিকে রাখা হয় লকআপে। ধারণা করা হচ্ছে, রোববার গভীর রাতে অভিযুক্তদের সঙ্গে নিয়ে ফের শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে হানা দিতে পারেন ইডি কর্মকর্তারা।

পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে: এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার পি কে হালদারকে শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করবে সরকার। এ জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা।

ভাইসহ ছয়জন গ্রেপ্তারের পর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- পি কে হালদারকে কবে ফিরিয়ে আনা হবে বাংলাদেশে? তাঁর পেছনে গডফাদারকে ধরা হবে কিনা?

কূটনীতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই পি কে হালদারকে দেশে ফেরানো সম্ভব।

এদিকে, গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, পি কে হালদার বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তি। তিনি ভারতে গ্রেপ্তার হলেও অফিসিয়ালি বিষয়টি আমাদের এখনও জানানো হয়নি। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে আইনিভাবে যা করা প্রয়োজন, তা-ই করব। এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কাগজপত্র পাওয়ার পর ফিরিয়ে আনতে আইনি চেষ্টা অব্যাহত রাখব। তিনি যেখানে আছেন, সেখানে কী করেছেন, সেখানকার আইনের মুখোমুখি হবেন কিনা- এসব বিষয় দেখার পর আমরাও তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাইব।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। পাশাপাশি দেশে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জনগণের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। গতকাল রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, জালিয়াতির কারণে ভারতের আইনে তাঁর বিচার হবে। তিনি মিথ্যা নাগরিকত্ব সনদ নিয়েছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। আমাদের এখানে অর্থ পাচারের মামলাটা বিচারাধীন রয়ে গেছে। সেই মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে তাঁকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর দেশে থাকা অবৈধ সম্পদ এরই মধ্যে জব্দ করা হয়েছে। জনগণের টাকা জনগণকে ভাগ করে দেওয়া হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, পি কে হালদারকে দেশে ফেরত আনতে কোনো সমস্যা হবে না। অবশ্যই আনা যাবে। বরং যে তথ্য-উপাত্ত তারা (ইডি) পাবে, সেগুলো আমাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এখানে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেবে। এটা আসলে এক দিনের ব্যাপার। যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে সেখানে মামলা হয়েছে। সেগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে। বন্দিবিনিময় চুক্তির সব প্রক্রিয়া শেষ হতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগবে না বলেও জানান এই কূটনীতিক।

দুদকের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান জানান, পি কে হালদারের বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে ৩৬টি অর্থ পাচার ও একটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন মামলা। তিনি বলেন, দুদকের করা এরই মধ্যে তিনটি মামলার তদন্তকাজ শেষ হয়েছে। অন্যগুলো চলমান। তাঁর মতে, তাঁকে যদি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, সে ক্ষেত্রে দুদকের অনুমতি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com