রাজধানীর জলাবদ্ধতা

৩ হাজার কোটি টাকা জলে

প্রকাশ: ১৪ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৪ মে ২২ । ১৪:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর একটি সড়ক। বৃষ্টি হলেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে খেলায়। বৃহস্পতিবারের ছবি- মাহবুব হোসেন নবীন

রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় নগরীতে বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতার ঘটনা নতুন নয়। জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে প্রকল্পও হয়েছে অনেক; খরচও আকাশচুম্বী। তবু এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলেনি নগরবাসীর। পুরো বর্ষা আসতে প্রায় এক মাস বাকি, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। এ বছর অল্প সময়ে অতি ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছরও অবধারিতভাবে ডুববে রাজধানী, জলাবদ্ধতায় ভুগতে হবে নগরীর বহু এলাকার বাসিন্দাকে।

২০০১ সালে ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে 'রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প' নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। দফায় দফায় ব্যয় বাড়িয়ে ২০১১ সালে ২০৩ কোটি টাকায় প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। কিন্তু তার পরের বর্ষা মৌসুমে আবার জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ওই প্রকল্পের মূল্যায়ন করে দেখতে পায়, প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করার কথা ছিল, সে রকম অনেক কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপর দ্বিতীয় ধাপের জন্য আরও ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প-২ বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৩ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষে রাজপথ যেন সাগর-নদীতে পরিণত হয়। কেবল এ দুটি প্রকল্পই নয়, গত দেড় দশকে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে ঢাকা ওয়াসা এবং অবিভক্ত ও বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশন। করপোরেশন দুটি মহানগরে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রায় ১০ শতাংশ খরচ করেছে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে। জলাবদ্ধতা কমেনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ মেহেদি হাসান বলেন, ঢাকা শহরটা যেভাবে গড়ে উঠেছে, সেখানে একটি বড় ত্রুটি রয়েছে। সেই অবস্থা বুঝে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়নি। অবস্থা বুঝে প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যেমন ৫ কিলোমিটার ড্রেন করা হয়েছে। অন্য দু'পাশে ড্রেন করা হয়নি। ফলে ওইটুকু ড্রেন জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। অর্থটাও জলে গেছে।

খাল ব্যবস্থাপনা: ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর খালগুলোকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর পরই দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীর খাল উদ্ধারে তৎপর হয়। তাতে গত বছর কিছুটা সুফল পেয়েছিলেন নগরবাসী। কিন্তু খালগুলো উদ্ধার ও আবর্জনামুক্ত করলেও তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। অনেক খাল আবার আবর্জনায় ভরে গেছে। এমনকি মোহাম্মদপুরের যে লাউতলা খাল উদ্ধার করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম নৌকায় চড়েছিলেন, সেটিও প্রায় পুরোনো রূপে ফিরে এসেছে। আবর্জনামুক্ত করা অন্য খালগুলোর অবস্থাও প্রায় একই রকম। এ অবস্থায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ডুবতে পারে রাজধানী। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের ঘটনায় তার নমুনা পাওয়া গেছে।

গত ২০ এপ্রিল ছয় ঘণ্টায় ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার পর রাজধানীর অনেক এলাকায় সৃষ্টি হয়েছিল জলাবদ্ধতা। ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে বৃষ্টিপাতের কারণেও একই অবস্থা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত রাখতে হলে খালগুলোকে উদ্ধার করে টেকসই পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর খালগুলো বেহাল। পাশাপাশি ড্রেনেজ সিস্টেমও সম্পূর্ণ কার্যকর নয়। গতবার খালগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো ছিল। ফলে জলাবদ্ধতা হয়েছিল কম। এবার খালগুলোর অনেক স্থানে পানিপ্রবাহ নেই। পাশাপাশি অনেক স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এ অবস্থায় এবার ভারি বৃষ্টিপাত হলে নগরবাসী জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। খালগুলোকে উদ্ধার করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে কেউ দখল বা ভরাট করতে না পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জিরানি, মান্ডা, শ্যামপুর, কালুনগর খালগুলোর শাখা-প্রশাখা এবং পান্থপথ ও সেগুনবাগিচার বক্স কালভার্ট থেকে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে। এসব খাল ও বক্স কালভার্ট থেকে ১ লাখ তিন হাজার ৫০০ টনের বেশি বর্জ্য এবং ৬ লাখ ৭৯ হাজার টন পলি অপসারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অচল পাম্প স্টেশনগুলো সচল করা হয়। কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল উদ্ধার করে সেগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে ৯৮১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। খালগুলো উদ্ধার করে দুই পাড়ে বানানো হবে ওয়াকওয়ে, থাকবে বাইসাইকেল লেন, মাছ ধরার শেড, বাগান, ফোয়ারা, ফুট ওভারব্রিজ, ইকোপার্ক, পাবলিক টয়লেট ও খেলার মাঠ। এ ছাড়া ধোলাইখাল, পান্থপথ ও সেগুনবাগিচার বক্স কালভার্ট পরিস্কারে ৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের খালগুলোর সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। ড্রোনের সাহায্যে সিএস জরিপ ও আরএস জরিপ ধরে খালের সীমানা পিলারের স্থান নির্ধারণ করা হচ্ছে। এরপর সেসব স্থানে বসানো হবে স্থায়ী পিলার। এ ছাড়া খালের পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন খালের ৪২টি স্পট খনন করবে ডিএনসিসি।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এসব কাজ শেষ হলে হয়তো জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলতে পারে। তবে এ উদ্যোগগুলোর কোনোটিই করা হয়নি। এসব কাজ নিজস্ব অর্থায়নে কোনো সিটি করপোরেশনের পক্ষেই সম্ভব নয়।

এবার বর্ষা: আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার রাজধানীসহ সারাদেশে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কানাডার সাচকেচুয়ান ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, এ বছরও প্রশান্ত মহাসাগরে লা-নিনার অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। ফলে এ বছর বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এবার ঢাকায় বর্ষার স্থায়িত্ব কম হলেও হঠাৎ হঠাৎ ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ রকম বৃষ্টিপাতের নজির অতীতেও দেখা গেছে। এ রকমটা হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কারণ ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ঘণ্টায় ১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে পানি অপসারণ করা সম্ভব হয় না। কাজেই এবারও রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরির আশঙ্কা ব্যাপক।সাম্প্রতিক কয়েকটি মাঝারি বর্ষণে দেখা গেছে, মিরপুর ১ নম্বর, কাজীপাড়া, গ্রিন রোড, কাঁঠালবাগান, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোড, আসাদগেট, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, মতিঝিলের কিছু অংশ, সোনারগাঁও মোড়, রামপুরা ও খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। দীর্ঘ সময় জমে না থাকলেও দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে নগরবাসীর কপালে। এবারের বর্ষা মৌসুমেও হয়তো জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে না তাদের।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে হলে প্রথমেই খালের পানিপ্রবাহ ঠিক করতে হবে। খালের সীমানাগুলো নির্ধারণ হলেই আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব। কিন্তু নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। কেউ যেন ময়লা ফেলে খাল ও ড্রেন বন্ধ না করে।

ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর কিছুটা সুফল পেয়েছি। এবার আরও বেশি পাব।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com