ইসলাম ও সমাজ

মানবতা ও মহানুভবতার ঈদুল ফিতর

প্রকাশ: ০১ মে ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০১ মে ২২ । ০১:৫২ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন- 'প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের উপলক্ষ রয়েছে; আর আমাদের খুশির উৎসব হচ্ছে ঈদ।' ঈদ মানে খুশি। আবার ঈদ মানে ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তিত হওয়া। তাই ঈদের মাধ্যমে খুশির উৎসব ও প্রত্যাবর্তনের বার্তা লিপিবদ্ধ। ঈদ উপলক্ষে খুশির হাওয়া বইতে থাকে; সর্বত্র উৎসবের আমেজ বিরাজ করে; মানুষের পুনর্মিলনী বা সম্মিলন ঘটে। তাই প্রাণের এ উৎসবকে আমরা ঈদ বলে থাকি। আবার মহাকালের ঘূর্ণাবর্তে প্রতি বছরই ঈদ আমাদের মাঝে ফিরে আসে। মানবচিত্তে আনন্দ-উল্লাসের দোলা দিয়ে যায়। সমাজ-মানসে নিখুঁত শিল্পীর অদৃশ্য তুলি দিয়ে প্রত্যাবর্তনের চিত্রাঙ্কন করে বেড়ায় এবং এ প্রত্যাবর্তনের গল্পে থাকে তাৎপর্যময়তা ও জীবন-জগতের জন্য পরম শিক্ষা। তাই আমাদের উচিত ঈদ পালনের ভেতর দিয়ে শুধু উৎসবের সাগরে অবগাহন না করে প্রকৃত অর্থে এই প্রত্যাবর্তনের বার্তা, তাৎপর্য ও শিক্ষা গ্রহণ করা; তবেই আমাদের ঈদ উদযাপন সার্থক হয়ে উঠবে।

মুসলিম সংস্কৃতির অনিবার্য এক অংশ হচ্ছে ঈদ। আমাদের উদযাপনের জন্য রয়েছে দুটি ঈদ। একটি ঈদুল ফিতর; মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার সমাপনীতে যার আগমন। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায়- 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।' আর অপরটি ঈদুল আজহা, যা কোরবানির ঈদ নামেও পরিচিত, যা জিলহজের ১০ তারিখে উদযাপিত হয়ে থাকে। আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় ঈদুল ফিতর। তবে ঈদ উদযাপনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাব, মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখতে পেলেন, মদিনার অধিবাসীদের মধ্যে বছরে নির্দিষ্ট দুটি দিনে উৎসব পালনের রেওয়াজ রয়েছে। রাসুলে পাক (সা.) এটি জানার পর তাদের কাছে এ ধরনের উৎসব পালনের কারণ জানতে চান। মদিনার লোকেরা তাকে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমরা সনাতন প্রথা অনুযায়ী জাহেলি যুগ থেকেই বছরে দুই দিনে এমন উৎসব পালন করে আসছি; যা এখনও প্রচলিত। প্রত্যুত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, তোমাদের জন্য বরং এর চেয়েও পবিত্র ও সুন্দরতম দুটি উৎসবের উপলক্ষ আছে, যা তোমরা আমরা সম্মিলিতভাবে উদযাপন করব। আর তা হলো ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা আরও দেখতে পাব, মূলত দ্বিতীয় হিজরিতে শাবান মাসে মাহে রমজানের সিয়াম সাধনাকে ফরজ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই হিসেবে মুসলিম জীবনে ইতিহাসের প্রথম ঈদ পালিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরির রমজান পালন শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে। এখানে আরও উল্লেখ্য, খুশি বা উৎসবের এই উপলক্ষকে 'ঈদুল ফিতর' এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, 'ফিতর' মানে হলো রোজা ভঙ্গ করা; যেহেতু এই ঈদ পালনের মধ্য দিয়েই মাসব্যাপী দিনের বেলায় পানাহারের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা ভাঙা হয়ে থাকে। তাই এই ঈদকে ঈদুল ফিতর নামে অভিহিত করা হয়েছে।

ঈদের শিক্ষা মানবতা, মহানুভবতা ও মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা; মানুষের পাশে থেকে তাদের দুঃখ মোচন, অনাহারীর মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রের ব্যবস্থা করা ঈদের প্রধান আচার। প্রকৃত মানুষেরা এরই মাঝে আসল আনন্দ খুঁজে পান। যাদের সামর্থ্য আছে তারাও যেন উৎসবের আতিশয্যে আমাদের অনুসরণযোগ্য পূর্বসূরিদের অবস্থা সম্বন্ধে বেমালুম ভুলে না যাই।

আমিরুল মোমেনিন হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে একবার ঈদের জামাতের জন্য নির্ধারিত সময় হয়ে যাওয়ার পরও ইমামতি যিনি করবেন সেই খলিফাতুল মুসলেমিন তখনও উপস্থিত হতে পারেননি। খবর নিয়ে জানা গেল, হজরত উমরের (রা.) রয়েছে একটি মাত্র জামা, যেটি ঈদের সকালে ধুয়ে দেওয়া হয়েছে; এখনও শুকায়নি, তাই খলিফার ঈদগাহে আসতে খানিকটা বিলম্ব হচ্ছে। আমাদেরও উচিত সম্পদের আধিক্যে ভোগ-সম্ভোগের নীতিতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে জীবনযাপনের রীতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।

ঈদুল ফিতরে ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত কার্যাদির মধ্যে রয়েছে- ফজরের নামাজ জামাতে আদায়ের পর প্রয়োজনীয় তাসবিহ-তাহলিল শেষে সকালেই গোসল সেরে নেওয়া; মিষ্টি জাতীয় খাদ্য গ্রহণ; ঈদগাহে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া; উত্তম পোশাক পরিধান ও সুগন্ধি মাখা; তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া; ঈদের নামাজ আদায়; পরস্পর কুশলাদি বিনিময়; আপনজনের খবর নেওয়া; প্রতিবেশীর ভালোমন্দ দেখা; হেঁটে ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় আসা; অন্যদের সাধ্যমতো পানাহার করানো; ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সাদকাতুল ফিতর প্রদান; নিজের, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ইত্যাদি।

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন: চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com