ভারতে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ দেশেও উৎকণ্ঠা

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২২ । ০৫:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবংশী রায়

প্রতীকী ছবি

দেশে করোনাভাইরাসের তেজ এখন অনেকটাই কম। ওমিক্রনের মাধ্যমে সৃষ্ট তৃতীয় ঢেউ গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে কমতে শুরু করে। গত ২৫ মার্চের পর থেকে দৈনিক রোগী শনাক্ত একশর নিচে নামে। মৃত্যুও কমে আসে অনেকটা। এ প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে সবকিছু। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত চালু পুরোদমে। ঈদ সামনে রেখে বিপণিবিতানে বেচাকেনার ধুম, দিনরাত একাকার। সড়ক-মহাসড়কে চেনা যানজট। সর্বত্রই মানুষের ভিড়। বেশির ভাগ মানুষ মাস্ক ব্যবহার ভুলতে বসেছেন। সামাজিক দূরত্ব মানারও বালাই নেই। এর মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। দেশটিতে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টে 'এক্সই' শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, 'এক্সই' ওমিক্রনের দুটি ধরন বিএ.১ ও বিএ.২-এর সমন্বিত রূপ। একই ব্যক্তি যখন কভিডের একাধিক রূপে আক্রান্ত হন, তখন দুটি রূপের জিনগত উপাদানের সংমিশ্রণে এই ধরনের নতুন রূপের উৎপত্তি হয়। একই সঙ্গে এই ভ্যারিয়েন্টটি ওমিক্রনের বিএ.২ রূপের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ সংক্রামক। এক্সই ধরনে সংক্রমিত রোগীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, আকস্মিক ছোঁয়াচে কাশি, শ্বাসকষ্ট, শরীরে ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা, গলাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, স্বাদ ও গন্ধহীন থাকা, কান দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়া, খাবারে অরুচি ও ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ থাকতে পারে।

ভারতে সংক্রমণ বাড়লে বাংলাদেশেও সেই টেউ আছড়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশেও বাড়ছে উদ্বেগ। ঈদ ঘিরে সেই উৎকণ্ঠা আরও দানা বেঁধেছে।

এদিকে, গতকাল রোববার এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ঈদে যাতায়াত বাড়বে। মানুষ গ্রামে যাবে। অনেকে বিদেশেও যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আরেক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

কয়েকটি কারণে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, ভারতে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যাতায়াত আছে এবং ঈদে তা আরও বাড়ে। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটি বড় অংশ ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যায়। ফলে এ থেকেও করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ঈদে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরী থেকে গ্রামে যাতায়াত করে লাখ লাখ মানুষ। সবকিছু মিলিয়ে ঈদের পরপরই করোনার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে বাড়লে দেশেও বাড়ে সংক্রমণ: ২০১৯ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম তিনজনের শরীরে করোনার অস্তিত্ব মেলে। তাদের মধ্যে দু'জন ছিলেন ইতালিফেরত। তাদের একজনের সংস্পর্শে গিয়ে পরিবারের এক সদস্য আক্রান্ত হন। ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ একজন মারা যান। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হয়। সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালতসহ গণপরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছুটি পেয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরী থেকে গ্রামে ছোটে লাখ লাখ মানুষ। প্রথমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মাদারীপুর থেকে ধাপে ধাপে বিস্তার ঘটিয়ে সারাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। ২০২০ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ঈদের পর জুন-জুলাই মাসে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ জন্য ঈদযাত্রাকে দায়ী করা হয়। কারণ দূরপাল্লার পরিবহন, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকার পরও মানুষের ঈদযাত্রা ঠেকানো যায়নি। অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট কার, পিকআপ ভ্যান ভাড়া করে বিকল্প পথে গ্রামে ছুটেছিল হাজার হাজার মানুষ। করোনার যুক্তরাজ্য ও আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণ ছড়ায় বছরজুড়ে। ওই বছরের শেষ দিকে এবং গত বছরের শুরুতে সংক্রমণ ও মৃত্যু অনেকটা কমে আসে। এর মধ্যেই গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে শনাক্ত হয় ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট। এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশেও রোগী বাড়তে থাকে। প্রথমে রোগী বাড়তে থাকে যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। মে মাসের শুরুতে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। এরপর ক্রমেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ে। মে মাসে ঈদের ছুটিতে কয়েক লাখ মানুষ নগরী থেকে গ্রামে যায়। এরপর জুন থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়। জুন, জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণ হারে রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ গত দুটি ঈদের পরপরই সংক্রমণ বাড়তে দেখা যায়। এরপর সংক্রমণ অনেকটাই কমে আসে। গত বছরের নভেম্বরে শনাক্ত হয় আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট। ওই ভ্যারিয়েন্ট ভারতেও শনাক্ত হয়। এরপর ডিসেম্বরে বাংলাদেশেও ওই ধরনটি শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী ছিল জিম্বাবুয়েফেরত নারী ক্রিকেট দলের এক সদস্য। পরে ক্রমেই ধরনটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়। গত জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সংক্রমণ কমতে কমতে এখন তা অনেকটাই নিম্নমুখী।

করোনার আগের বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতে সংক্রমণ বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়ে। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং যাতায়াতের কারণে সহজেই সংক্রমণপ্রবণ এ রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। ঈদ সামনে রেখে এরই মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ভারতের ভিসার নিয়েছেন। ভারতে গত ১৮ এপ্রিল এক দিনে সংক্রমণ বেড়েছে ৯০ শতাংশ। আর গত শুক্র ও শনিবার দুই দিন সংক্রমণ বেড়েছে ১২১ ও ১২০ শতাংশ হারে।

সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ: ভারতে করোনা সংক্রমণ ফের বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ সতর্কতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলম বলেন, ভারতে করোনার সংক্রমণ বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগের। এক দিনে ৯০ শতাংশ ও ১০০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ বেড়েছে। ভারতের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, ভ্রমণসহ নানা কারণে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে অন্যান্য দেশের তুলনায় যাতায়াত অনেক বেশি। ফলে সে দেশে সংক্রমণ বাড়লে তা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়বে। সংক্রমণ কমে আসার পাশাপাশি টিকাদানের পর মানুষ সাহসী হয়ে উঠেছে। অনেকে মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছেন। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণেই সংক্রমণ বেড়েছে। সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরতে হলে সঠিকভাবে মাস্ক পরা এবং বারবার হাত ধোয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

বিএসএমএমইউর ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, আগে ডেলটার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ভারতে সংক্রমণ ছড়ানোর দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে বাংলাদেশেও সংক্রমণ বেড়েছিল। ভারতে শনাক্ত হওয়া নতুন ধরন এক্সই সংক্রমণপ্রবণ। ফলে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ঈদে গ্রামে গেলেও যাতে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। মনে রাখতে হবে, টিকা শতভাগ সুরক্ষা দেবে না। টিকা নেওয়ার পরও অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com