বৈষম্য দূর করতে চাই উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষ সমানাধিকার দিয়েছে। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ দেশের নারীসমাজকে ব্যাপক বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, পারিবারিক সম্পদসহ উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকা। নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা না থাকায় বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও কিছুতেই এসব উপসর্গের রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করতে উত্তরাধিকারে সমান অধিকার জরুরি। 'বৈষম্য দূর করার জন্য উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার চাই' শীর্ষক এক অনলাইন গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অক্সফ্যাম বাংলাদেশের সহযোগিতায় বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের (বিএনপিএস) উদ্যোগে ২৫ জানুয়ারি ২০২২ গোলটেবিলটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিডিয়া সহযোগী ছিল দৈনিক সমকাল।

রোকেয়া কবীর

বর্তমানে সমাজ-রাষ্ট্রে আমরা সবচেয়ে বেশি যে সংকটের মোকাবিলা করছি, তা হচ্ছে বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন। নারী ও কিশোরীরা পরিবার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, যানবাহন, রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আমরা যখন ২৫-৩০ বছর আগে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কথা বলা শুরু করেছিলাম, তখন নারীরাই বলত এটা আমাদের পারিবারিক বিষয়, আপনারা কেন এসেছেন। সে অবস্থা থেকে এখন অবস্থার অনেক বদল হয়েছে। এখন সবার কাছেই পারিবারিক নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এটা দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলনের ফসল।

১৯৯৫ সালে ইয়াসমীন ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে সম্মিলিত নারীসমাজের মাধ্যমে আমরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম, তারই অংশ হিসেবে আমরা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির একটি খসড়া তৈরি করি, যার সঙ্গে আইভি রহমান যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের একটি সংবর্ধনা সভা শেষে আইভি রহমানের মাধ্যমে আমরা তাঁর হাতে খসড়াটি তুলে দিয়েছিলাম। ১৯৯৭ সালে যেটি জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি হিসেবে গৃহীত হয়। কিন্তু ২০০৪ সালে কাউকে না জানিয়ে নারী নীতির সমানাধিকারের বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়। পরে ২০১১ সালে বর্তমান নারী উন্নয়ন নীতি গৃহীত হলেও সমানাধিকারের সব ধারা সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

বলা হয়, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণে নারী নির্যাতন বেড়েছে। এটা ঠিক নয়, কারণ নারী নির্যাতন, নারীর অবমাননা আমাদের সংস্কৃতিতেই রয়েছে। নারীকে গড়ে তোলা হয় সুপাত্র দেখে কারও হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। বাবার বাসায় লালনপালন করে বরের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তার নিজের কোনো ঠিকানা নেই। কিছুদিন আগে পুলিশের চাকরিতে ২ জন মেয়ে নিয়োগ পান, কিন্তু তাদের নিজস্ব জমি না থাকায়, কোনো স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় তাদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল। পরে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার থাকলে এ রকম ঘটত না।

শুধু নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র হয় না। যদিও বলা হয়, গণতন্ত্র হলেই সুশাসন আসবে। আমাদের পরিবারে গণতন্ত্র নেই। পরিবারে মেয়েদের বড় করা হয়, শেখানো হয় পুরুষদের সার্ভ করার জন্য। পরিবারের অগণতান্ত্রিক পরিবেশে বড় হয়ে পরিবার সদস্যরা পরে রাস্তাঘাটে, এমনকি অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে অগণতান্ত্রিক আচরণ করে। ক্ষমতা কাঠামো, তথা বাজার কমিটি, সামাজিক কমিটি, পেশাজীবী কমিটি ইত্যাদিতে নারীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এটা সামাজিক অবস্থা। রাষ্ট্রীয় অবস্থা আরও করুণ। সংবিধানে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কারও প্রতি বৈষম্য করা যাবে না এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন বাতিল হয়ে যাবে। উত্তরাধিকার আইন সংবিধানের সঙ্গে

সরাসরি সাংঘর্ষিক। আইন কমিশন ও সংসদের কাছে আমাদের দাবি, এই আইন দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নারী নিজের ঠিকানা ও পরিচয় নিয়ে বড় হতে পারে।

আমাদের আচার-আচরণে গণতান্ত্রিক হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের দাবি, নারীর সমানাধিকার নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। নারীরা যে বৈষম্যের সাগর পাড়ি দেয়, তাতে শুধু কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না। এজন্য রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা যারা বলেন, তারা নারীর সমানাধিকারের পক্ষে না থাকলে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। নারীদের অধিকার আদায়ে তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

এনামুল মজিদ খান সিদ্দিকী

পুরুষতন্ত্রের একটা বড় জায়গা হচ্ছে তাদের অহংকার। নারীর সম্পত্তিতে অধিকারের সময় কেন পুরুষদের অহংকারে লাগে না? দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে ভবিষ্যতে উন্নত দেশ হবো। আমরা কাদের নিয়ে এগুচ্ছি, কাদের পেছনে ফেলে যাচ্ছি- এসব আমাদের ভাবায়। কেন নারীরা ভূমিহীন? তাই সম্পত্তি ও সম্পদে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। কথা বলতে হবে। একটা আরেকটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যারা অন্যায়কারী, তারাও ক্রিয়েটিভ হতে পারে। শুধু আইন পরিবর্তনই কি যথেষ্ট হবে কিনা, তা ভাবতে হবে। পুরো ইকো সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে, আর এ জন্য প্রয়োজন পুরুষদের অংশগ্রহণ। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর

মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রতিপাদ্যই ছিল বৈষম্যমুক্ত সমাজ। স্বাধীনতা-সংগ্রামের কারণে আমরা একটি দেশ ও সংবিধান পেয়েছি। সংবিধান হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, যদি কোনো আইন সংবিধান পরিপন্থি হয়, তবে সেই আইন বলবৎ থাকবে না। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী আমাদের পারিবারিক আইনটি প্রণীত হয়েছে, যা এখনও কার্যকর আছে; যেটি নারীর প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতনের উৎসে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সর্বজনীন পারিবারিক আইন প্রণয়ন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

নারী যে পদেই থাকুক, তাকে কী হিসেবে ট্রিট করা হচ্ছে? পুরুষকে কিন্তু সম্পত্তি বা কার বাবা, সে হিসেবে ট্রিট করা হচ্ছে না। স্বামী মারা গেলে স্ত্রী সমান হারে সম্পত্তি পান না। শাশুড়ি ও বউয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, যৌতুক নিয়ে সহিংসতা- সব নারীর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বৈষম্যের কারণে হয়। বিয়ে করে আসার পর নারীর কোনো সম্পদ থাকে না। তার নিজস্ব ঠিকানা কোথায়? নারীর সত্তা চিহ্নিত হয় সম্পর্কের মাধ্যমে। এটা রাষ্ট্রের একটা অবহেলা। সংবিধানের বৈষম্য বিলোপের মূলনীতি অনুসারে নারীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রচলিত অন্যায়কে বাতিল করে সংবিধানের পথে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। বর্তমানে বড় বড় ডেভেলপার ভবন তৈরিতে নারীদের বঞ্চিত করছে। পারিবারিক সম্পদ শেয়ারে সবার মতামত আছে কিনা, তা খতিয়ে না দেখে ভবন বানাচ্ছে, বিক্রি করছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে যে সমাজ তৈরির কথা ছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। উত্তরাধিকার সম্পত্তি না বলে কথাটা হওয়া উচিত পারিবারিক সম্পত্তি। এ নিয়ে কথা বলতে হবে। এটা কেন শুধু নারীরা বলবেন? সচেতন পুরুষ, সচেতন নাগরিক, সচেতন মানুষ সবাইকে বলতে হবে। যারা বিরোধিতা করবেন, তারা সংবিধানবিরোধী, তারা অপরাধী।

ড. সায়মা হক বিদিশা

নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষমতায়নের বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে হবে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর্থিক ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য। এ জন্য কর্মসংস্থান জরুরি। নারীরা ক্ষুদ্র শিল্পের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। কিন্তু তারা বেশি উপরে উঠতে পারছেন না। তারা তাদের ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ তাদের সম্পদ সীমিত। নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, স্বনির্ভর হওয়ার জন্য সম্পত্তি প্রাপ্তিতে সমান অধিকার আবশ্যক। রয়েছে মার্কেটিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সম্পদের চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকগুলো ঋণ বা প্রণোদনা দিচ্ছে না। নারীরা এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করে নারীরা এগোতে পারছেন না। লৈঙ্গিক বৈষম্য তাকে নানাভাবে আটকে রাখছে। তাকে সম্পত্তি দেওয়া হচ্ছে না। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পারিবারিক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার হলে নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা কম আসত। সম্পত্তি না দেওয়ার কারণে যে বৈষম্য শুরু হয়, তা সারাজীবন ভোগায়। নারীরা সচেতন না হওয়ায়, সম্পদ ও শিক্ষা না থাকায় অত্যাচারিত হলেও সংসার থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না। মুখ বুজে সহ্য করেন। এভাবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নের খুব বড় প্রভাবক।

ড. ফৌজিয়া মোসলেম

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সবাই অংশগ্রহণ করেছিলাম। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি সংবিধান লিখেছিলাম। যে সংবিধানে মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরেছি। কাজেই মানবিক মর্যাদা বলতে নারী-পুরুষ উভয়ের মর্যাদাকে বুঝি। বাংলাদেশে নারীর মর্যাদা না থাকার ক্ষেত্রে মূল দুইটা কারণকে আমরা চিহ্নিত করেছি- একটা হলো সম্পদ এবং সম্পত্তিতে নারীর অধিকারহীনতা, আর অন্যটা নারীর যে অদৃশ্য সেবা, অর্থাৎ গৃহকর্ম, তার মূল্যায়ন না হওয়া। এ দুটি কারণ নারীকে প্রতিনিয়ত পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংবিধানে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হলে অভিন্ন পারিবারিক আইন-প্রণয়ন জরুরি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মহিলা পরিষদ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। নারীর কল্যাণও দরকার। কিন্তু কল্যাণকর কাজের মূল্য দিতেও নারীর অধিকার রক্ষা করতে হবে। সম্পত্তিতে নারীর অধিকারটা নিশ্চিত না হলে নারী তার পরিবারেই সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পান না। সন্তান কিংবা দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

সবই হচ্ছে সিভিল ল অনুযায়ী। উত্তরাধিকার আইন কেন ধর্মীয় ভিত্তিতে হবে? নারীর প্রতি পশ্চাৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তারই প্রমাণ। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে নারীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের কথা বলে নারীকেই বিভাজন করা হচ্ছে। এই বিভাজন হলে সামগ্রিকভাবে নারীর পক্ষে যে আইন রয়েছে, তা শক্তিশালী হবে না।

অভিন্ন পারিবারিক আইনের মধ্যে অভিন্ন বিবাহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ রেজিস্ট্রেশন, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ও প্রতিপালন, দত্তক ও পোষ্যসন্তান গ্রহণ এবং উত্তরাধিকার আইন অন্তর্ভুক্ত। অভিন্ন পারিবারিক আইন না থাকায় সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, চারটি প্রধান ধর্মাবলম্বীর পারিবারিক আইনে পার্থক্য থাকার কারণে সমাজে অবিচার রোধ করা যাচ্ছে না এবং সম্পদ-সম্পত্তিতে নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কাজেই সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা বর্তমান সময়ের দাবি।

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে এসে দেখা যাচ্ছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমতার দর্শন থেকে দূরে আছি। সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পারিবারিক আইন সংস্কারের কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও আইনে বৈষম্য ও অসমতা বিদ্যমান। এটা দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধর্মের ভিত্তিতে নারী অধিকার নির্ধারিত হলে নারীসমাজ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কাজেই সাংবিধানিক ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকারসহ সব নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন-প্রণয়ন জরুরি। সরকার নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য সিডওসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে। এসব সনদ বাস্তবায়ন করতে হলেও অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন জরুরি।

শাহীন আনাম

নারীর সকল প্রকার মজুরিবিহীন কাজের কোনো মূল্যায়ন নেই। একজন কন্যাশিশু জেনে যায় পরিবারে তার অবস্থান কোথায় আর তার ভাইয়ের অবস্থান কোথায়। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের সঙ্গে সরাসরি পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার না থাকার বিষয়টি জড়িত। বিভিন্ন রকম কৌশল নিতে হচ্ছে মেয়েদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার করতে। কিন্তু এটা কেন করতে হবে। রাষ্ট্রের একটা কর্তব্য আছে। প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করা হবে। কিন্তু নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা বা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ধর্মের দোহাই দেওয়া হয়; কিন্তু অন্য দেশগুলোর উদাহরণ আমলে নেওয়া হয় না। এ জন্য সাহসের দরকার। যদি নারীর সম্মান বাড়ে, সমান অধিকার স্বীকৃতি হয়, তাহলে নির্যাতন ও সহিংসতা কমে আসবে। এ জন্য সম্পত্তিতে সমান অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে হিন্দু নারীদের সমান অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এ জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হবে।

অ্যাডভোকেট নিনা গোস্বামী

উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকা নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকায় পরিবারে মেয়েদের লালনপালন করা হয় মূলত উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। পরিবারের এই মানসিকতা যেমন বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি করে, তেমনি জীবনভর নারীদের পরজীবী হিসেবে গণ্য হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়। ২০১১ সালের নারী নীতিতে উত্তরাধিকারে সমান অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অ্যাকশন প্ল্যানেও দেওয়া হয়নি। মুসলিম আইনে অর্ধেক সম্পদ পেলেও হিন্দু আইনে কোনো অংশ দেওয়া হয় না। বৌদ্ধরা পরিচালিত হয় প্রচলিত হিন্দু আইনে। খ্রিষ্টানদের আইনে থাকলেও বাস্তবে পায় না। হিন্দুদের বিধবা আইন নিয়ে কথা উঠলে হিন্দু মৌলবাদীরা বিরোধিতা শুরু করে। সামনের নির্বাচনে কোন দলের ইশতেহারে নারীর অধিকার বাস্তবায়নের কথা বলা থাকবে, তা দেখতে হবে।

শেখ রোকন

সমকাল সবসময় তার সম্পাদকীয় নীতির অংশ হিসেবে নারীর অধিকার, মর্যাদা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার কাজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা সবসময় লেখালেখি করি, জনমত গঠন করি।

উত্তরাধিকারে নারীর অধিকার যে সমান হতে হবে, এটা শুধু আজকের দাবি নয়, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দাবিগুলো আমরা সামনে এনেছিলাম। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীরা সমানাধিকার পাচ্ছে না। এ বৈষম্য শুধু নারী বলেই নয়, এ বৈষম্য হচ্ছে ধর্মভেদে। কেননা, উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিষয়টি ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের মাধ্যমে মীমাংসা করা হচ্ছে। একদিকে তারা সমানাধিকার পাচ্ছে না, অন্যদিকে প্রাপ্য যেটুকু তা পেতেও নারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সমান মর্যাদা পাবে- এমন অঙ্গীকারে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র চেয়েছিলাম। অথচ দুর্ভাগ্যবশত আইয়ুব খানের বানানো 'মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১' আজও বহাল আছে বাংলাদেশে। এ আইনের কারণে বাবার সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে ছেলেরাই সম্পত্তি পেয়ে থাকে। মুসলিম নারীরা বাবার সম্পত্তির ভাগ পেলেও সামাজিক প্রথা বিবেচনা করে সেই সম্পত্তি ভাইদের দিয়ে দেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও ধর্ম অধিকার দিলেও সমাজের কটু কথার ভয়ে অনেক নারী প্রয়োজন সত্ত্বেও বাবার সম্পত্তি নেন না। এভাবে সম্পত্তিবঞ্চিত নারীরা পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে পিছিয়ে থাকেন।

আবার গ্রামাঞ্চলে কোনো নারী ভাইদের কাছে সম্পত্তির ভাগ নিতে চাইলে জলাভূমি দেখিয়ে দেওয়া হয়। আবার কারোর ভাই বা ছেলে সন্তান না থাকলে সেই সম্পত্তিতে ভাগ্নে বা ভাইয়ের ছেলেরা অধিকার ফলাতে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাগ্নে বা ভাইয়ের ছেলের কাছ থেকে নিষ্পত্তি নেওয়ার উদাহরণও আছে। মুসলিম আইনে যদিও অর্ধেক কন্যারা পায়; কিন্তু হিন্দু ও বৌদ্ধ পারিবারিক আইনে তা নেই। তাই আইন সংশোধন করতে হবে।

ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না

১৯৮৭ সালে আমরা লড়াই শুরু করেছিলাম, এখন অনেক এগিয়েছি। তবে খুবই অ্যালার্মিং বিষয়, বিরোধীরাও এগোচ্ছে। তাদের রুখতে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বলা আছে, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব আইন বাতিল করা হবে। শুধু তাই নয়, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইনও রাষ্ট্র প্রণয়ন করবে না। ২৮ ধারা আরও বলছে যে, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণেও কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন। সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন প্রচলিত রয়েছে, যার ফলে যে ব্যক্তি যে ধর্মে জন্মগ্রহণ করবেন, নারী অথবা পুরুষ, সেই ধর্মের আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন। একই ধর্মের নারী ও পুরুষের অধিকারের মধ্যে বিরাজ করছে বিস্তর তফাত ও বৈষম্য, যা সংবিধানের সমঅধিকারের বিপরীত। সম্পত্তিতে সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে প্রধান দুটি হাতিয়ার সংবিধান ও সিডও সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের সনদ সিডও। ১৯৮৭ সালে মহিলা পরিষদের সঙ্গে মিলে আমরা অভিন্ন পারিবারিক আইনের আন্দোলন শুরু করেছিলাম, সেই সময় থেকে এ দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার নিয়েই কাজ করছি।

আফসানা বিনতে আমীন

প্রচলিত পারিবারিক আইনগুলো ধর্মীয় আইন ও প্রথার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এ কারণে এটা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে এবং একই সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তাই নারীর অধিকার রক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন-প্রণয়ন জরুরি। এই দাবিগুলো শুধু সেমিনার বা গোলটেবিল বৈঠক করেই সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সর্বজনীন আন্দোলন।




ফৌজিয়া খন্দকার ইভা

আইন তো অবশ্যই একটা বড় ব্যাপার। তবে কোনো কিছুই ব্যক্তিগত নয়, সবকিছু রাজনৈতিক। নারীদের ক্ষমতাহীন করে রাখার জন্যই সব আয়োজন। এই সংকটের প্রতিকার করার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি নারী সংগঠনসহ বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও উদ্যোগ নিতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় করতে কাজ করতে হবে। সম্পদ ও সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় হবে। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকা নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথেও বাধা হয়ে

দাঁড়াচ্ছে। সব ধরনের কৃষিকাজ করলেও জমির মালিকানা না থাকায় নারীরা সরকারি সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এমনকি ভূমিহীন নারীরা স্বামী বা সক্ষম পুত্র না থাকলে ভূমির মালিকানাও পান না।

মাহমুদা শেলী

অনেক দিন থেকে নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন চলে আসছে। নারীরা যত বেশি ক্ষমতার চর্চা করতে পারবে, পববর্তী প্রজন্ম তত বেশি উপকৃত হবে। যখনই উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কথা হয়, তখনই ধর্মকে সামনে আনা হয়। স্বাধীনতার মূলনীতি তথা সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির স্বার্থে বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করে সব ধর্ম ও লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য উত্তরাধিকারে সমান ব্যবস্থা প্রণয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এখনই সময় পারিবারিক আইন নিয়ে জোরে আওয়াজ তোলার। সংসদে দ্রুত আইনটি তুলতে হবে।


সারথী রানী সাহা

নারীদের পারিবারিক অধিকার আদায় করে নিতে হবে। এখনও নারীরা অনেক ছাড় দেন। এ থেকে বের হয়ে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে হবে। একটি গোষ্ঠী ধর্মকে পক্ষপাতমূলক ও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার ফলে উত্তরাধিকার আইন নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টির হাতিয়ার হয়েছে। উত্তরাধিকারে সমান অধিকার না থাকায় পরিবারে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতনমূলক আচরণ দেখে দেখে শিশু বয়স থেকেই ছেলেদের মধ্যে আধিপত্য ও অগণতান্ত্রিক মনমানসিকতার চর্চা ও আচরণ বিকাশ লাভ করে।



স্বাগত বক্তব্য ও সভাপ্রধান

রোকেয়া কবীর
নির্বাহী পরিচালক, বিএনপিএস

বিশেষ অতিথি
এনামুল মজিদ খান সিদ্দিকী
অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর
অক্সফ্যাম বাংলাদেশ

প্যানেল আলোচক

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

ড. সায়মা হক বিদিশা
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. ফৌজিয়া মোসলেম
সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

অ্যাডভোকেট নিনা গোস্বামী
পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র

শেখ রোকন
সহকারী সম্পাদক, সমকাল

উন্মুক্ত আলোচনা

ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না
সাবেক পরিচালক, কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প

আফসানা বিনতে আমীন
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, নেটজ বাংলাদেশ

ফৌজিয়া খন্দকার ইভা
নির্বাহী পরিচালক, প্রাগ্রসর

মাহমুদা শেলী
নির্বাহী পরিচালক, মানব প্রগতি সংঘ

সারথী রানী সাহা
নির্বাহী পরিচালক, সিড বাংলাদেশ

সভা পরিচালনা

শাহনাজ সুমী
উপপরিচালক, বিএনপিএস

অনুলিখন
হাসনাইন ইমতিয়াজ ও সাজিদা ইসলাম পারুল
স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com