জ্বালানি

গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ ও উদ্বেগ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সবুজ ইউনুস

করোনাকালে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা চাপে পিষ্ট। ঠিক সেই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিক্রেতা কোম্পানিগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যগুলোর দাম ফের বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, চলতি অর্থবছরেই সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ৭০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। বিশাল পরিমাণ এই ভর্তুকি বহন করা অসম্ভব। ফলে আগামী বাজেটের আগেই গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য গ্যাস বিক্রেতা কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে একটি অবাস্তব প্রস্তাব পেশ করেছে, যেখানে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবটি যথাযথ বৈধ প্রক্রিয়ায়ও পেশ করা হয়নি। ফলে কমিশন এটা সংগত কারণেই ফেরত দিয়েছে। তথ্য-উপাত্তসহ সঠিক প্রক্রিয়ায় এটা আবার জমা দিতে বলা হয়েছে। গণশুনানি শেষে বিইআরসি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে, তাতে ফের জনগণের পকেটে হাত দিতে যাচ্ছে সরকার। গত নভেম্বর মাসেই ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়। সেই রেশ এখনও কাটেনি। করোনার এই দুঃসময়ে ফের সামনে আসছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কশাঘাত। গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়বে। কারণ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস থেকে। সারও উৎপাদন করা হয় গ্যাস পুড়িয়ে। গত মাসে সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে ২৩ শতাংশ। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এমনিতেই বেড়েছে। 

যদিও সারের দাম বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বাজেটের আগেই গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমবেশি বাড়তে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষায়, দাম বাড়ানো ছাড়া বাজেটের শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে। 

১৮ জানুয়ারি সমকালের প্রথম পাতায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে একটি খবর ছাপা হয়। এতে বলা হয়, গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গড়ে ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুসারে দাম বাড়লে বাসাবাড়ির দুই চুলার জন্য মাসে বিল দিতে হবে দুই হাজার ১০০ টাকা, যা এখন দিতে হয় ৯৭৫ টাকা। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে বেড়ে গড়ে ২০ টাকা ৩৫ পয়সা হবে। শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বর্তমানে ১০ টাকা ৭০ পয়সা। এটা বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার (শিল্পকারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত গ্যাস) ১৩ টাকা ৮৫ পয়সার স্থলে ৩০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। 

বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় ব্যবহূত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে ১০ টাকা (১২৫ শতাংশ) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করলে বিদ্যুৎ ও সারের দামও না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না। কারণ তখন বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যাবে। জানা গেছে, ইতোমধ্যে পিডিবি অর্থাৎ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির একটি প্রস্তাবনা তৈরি করছে। বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়লে খুচরায়, অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়েও দাম বাড়বে। 

বিগত ২০১৯ সালের ১ জুলাই সর্বশেষ গ্যাসের দাম বেড়েছিল। আবাসিক খাতে দুই চুলার খরচ ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা করা হয়। বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্যাপটিভ পাওয়ার, শিল্প ও চা বাগানে ব্যবহূত গ্যাসের দাম গড়ে ৩২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বাড়ে। গত নভেম্বরেই এক দফা জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।

গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সার্বিক জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। টাকার ক্রয়ক্ষমতা মুহূর্তের মধ্যে কমে যাবে। দেখা দেবে মূল্যস্ম্ফীতি। চাল-ডাল-আটা থেকে অধিকাংশ পণ্যের দাম আরও বাড়বে। এমনিতেই বাজারে শাকসবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেশি। এদিকে ফের করোনার ভয়াবহ আক্রমণে মানুষ শঙ্কিত। লকডাউন না হলেও নানা বিধিনিষেধের কারণে নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এরই মধ্যে যদি আবার এসব পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে এই চাপ তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে। সরকারকে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। 

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের অজুহাত- আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বহু গুণ বেড়ে গেছে। আমদানি করা এলএনজির কারণেই গ্যাসের দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজির দাম গত বছরের প্রথমভাগে ছিল ১০ ডলার। সেটি বেড়ে এখন ৪০ থেকে ৪৫ ডলার হয়েছে। এলএনজির স্পট মার্কেটে দাম বেড়েছে সাড়ে চার গুণ। 

সরকারি কর্মকর্তাদের এ বক্তব্য ঠিক। কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্যরকম। দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সরবরাহ হচ্ছে কমবেশি ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ কোটি ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস। কোনোদিন মাত্র ৫০ কোটি ঘনফুট আমদানি করা গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে। অর্থাৎ মোটা দাগে ৭০ ভাগ গ্যাস দেশীয়। এই গ্যাস কিন্তু খুবই সস্তা। অনেক কম খরচে এটা উৎপাদন করা হয়। বাকি ৩০ ভাগ কাতার ও ওমান থেকে আমদানি করা হয়। এ জন্য কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি আছে। চুক্তির এই গ্যাসের দামও খুব বেশি না। কিন্তু বিগত কয়েক মাস ধরে কাতার ও ওমান চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দিতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। কিন্তু স্পট মার্কেট থেকে ক্রয় করা এই গ্যাসের পরিমাণ খুবই কম। এই সামান্য পরিমাণ বেশি দামের গ্যাসের অজুহাতে দাম বাড়ানো কতটুকু যুক্তিসংগত, সেটা বিবেচনা করা উচিত। 

প্রশ্ন হলো- সরকারকে কেন গ্যাস আমদানি করতে হলো? এ দায় কার? কেন আমরা আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম? টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন বিশ্বের নজর কেড়েছে। পদ্মা সেতু চালুর মুখে। মেট্রোরেলও দৃশ্যমান। কিন্তু সরকার স্থলভাগ বা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকার গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্থলভাগ বা বঙ্গোপসাগরে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের বড় মজুত আবিস্কার না হলে এই নির্ভরতা সামনে আরও বাড়বে বলে মনে হয়। 

করোনার প্রথম ধাক্কায় সারাবিশ্ব স্থবির হয়ে পড়ে। তখন সারাবিশ্বেই গ্যাস ও তেলের দাম কমে যায়। এ জন্য গত বছরের প্রথমভাগে বিশ্বে এলএনজির দাম অনেক কম ছিল। সেই পৃথিবী আবার সচল হওয়াতে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার নেপথ্যে রয়েছে চীনের ভূমিকা। চীন আগামী ১০ বছরের এলএনজি আগাম ক্রয় করছে। এতে বিশ্বাজারে বড় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

বিদ্যুৎ-কলকারখানা চালু রাখতে হলে গ্যাস আমদানি ছাড়া সরকারের সামনে কোনো রাস্তাও খোলা নেই। তবে ভর্তুকির চাপের কথা বলে এই দুঃসময়ে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সংগত হবে না। দেড় বছরের মাথায় জাতীয় নির্বাচন- সরকারকে এটাও মাথায় রাখতে হবে। তা ছাড়া সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নতুন কোনো বিষয় নয়। বহু বছর থেকেই এসব খাতে সরকার কমবেশি ভর্তুকি দিয়ে আসছে। পাশের দেশ ভারতে রান্নার গ্যাসেও ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, করোনার অপঘাতে বহুসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। দ্রব্যমূল্য বেশ আগে থেকেই আকাশচুম্বী। করোনা আবার জেঁকে বসছে। খেটে খাওয়া মানুষ নিদারুণ দুর্ভোগের শিকার। এই অসময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা যথার্থ হবে না। সরকার এ বিষয়ে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে না বলে আমার বিশ্বাস। 

সবুজ ইউনুস : সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com