মরদেহ গুমের পরই আনারুল ছড়ায় নিখোঁজের খবর

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২২ । ০০:৩৪ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২২ । ০০:৩৪

আতাউর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইদা গাফফার। ফাইল ছবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক সাঈদা গাফ্ফারকে (৭১) হত্যার পর ঝোপের ভেতর মরদেহটি গুম করেছিল শ্রমিক আনারুল ইসলাম ওরফে আনোয়ার। এর পর ওই শিক্ষিকার বাসায় গিয়ে লুটপাট চালায় সে। নগদ টাকা আর দুটি মোবাইল ফোন লুটে নিয়ে নিজেই শিক্ষিকার স্বজনদের খবর দেয়- তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। 

মোবাইল ফোনে কল দিয়ে আনারুল বলে, ‘আজকে ম্যাডাম আসে নাই, তার ফোনও বন্ধ।’ শেষ পর্যন্ত জানা যায়, এই আনারুলই শিক্ষিকার খুনি। মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক সাঈদা গাজীপুরের দক্ষিণ পানিশাইল এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি আবাসিক প্রকল্পে নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজ করছিলেন। কাজের তদারকি করতে তিনি ওই এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ২৫ বছর বয়সী আনারুল তার হয়ে নির্মাণ কাজের দেখভাল করে আসছিল। তাকে কন্ট্রাক্টর আনোয়ার নামে ডাকা হতো।

গত শুক্রবার আবাসিক প্রকল্পের ভেতরে একটি ঝোপে ওই শিক্ষিকার মরদেহ পাওয়া যায়। এর আগে মঙ্গলবার থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। ওই ঘটনার পর গাজীপুর মহানগর পুলিশের কাশিমপুর থানায় তার মেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওই জিডির ভিত্তিতে পুলিশ ‘নিখোঁজের খবর’ দেওয়া আনারুলকে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী ঝোপে পাওয়া যায় অধ্যাপক সাঈদার মরদেহ। তাকে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যন্ত্র দিয়ে আঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নিহতের ছেলে ও মামলার বাদী সাউদ ইফখার বিন জহির জানান, গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে তার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ছোট বোন মাকে মেসেঞ্জারে মেসেজ দেয়। তিনি সেই মেসেজ সিন (দেখেননি) করেননি। পরদিন সকাল ৮টার দিকে মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিলেও সেটি রিসিভ করা হয়নি। তখন তার মামা শেখ শমসের গাফ্ফার আনারুলকে ফোন দেন। তখন ওই ব্যক্তি জানায়, ম্যাডাম প্রকল্পে আসেননি, তার ফোনও বন্ধ। এর পরই তার মায়ের সন্ধান শুরু হয়।

তিনি অনেকটা আক্ষেপ করে বলেন, বাড়ির কাজও শেষের দিকে। ৩০ জানুয়ারি তাদের নতুন বাসায় ওঠার কথা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাটি অরক্ষিত। এ জন্যই তার মাকে খুন হতে হলো।

অধ্যাপক সাঈদার ভাই শেখ শমসের গাফ্ফার জানান, বোনের নম্বর বন্ধ পেয়ে তিনি আনারুলকে কল দিয়েছিলেন। সে জানিয়েছিল, ম্যাডাম প্রকল্পে আসেননি। তখনও বুঝতে পারেননি, এ লোকটাই সব শেষ করে দিয়েছে। এরপর তিনি অপর শ্রমিক নজরুলকে বোনের ভাড়া বাসায় পাঠান। তখন সে গিয়ে দেখতে পায়, বাসার গেট খোলা। একটি আলমারিতে চাবি ঝুলছে, অন্য আলমারিও খোলা। তবে বোনকে বাসায় না পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থানায় জিডি করেছিলেন।

কাশিমপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ মিজানুর রহমান জানান, আনারুলই অধ্যাপক সাঈদাকে খুন করে মরদেহ গুমের পর নিখোঁজের নাটক সাজিয়েছিল। নিজে রক্ষা পাওয়ার জন্য তার স্বজনদের কল করে জানিয়েছিল- ম্যাডাম নিখোঁজ রয়েছে। নাটক সাজিয়ে কাজ না হওয়ায় গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় পালিয়ে গিয়েছিল। জিডির পর তাকে সেখান থেকে গ্রেপ্তারের পর খুনের কথা স্বীকারও করেছে। এর পর গাজীপুরে ফিরিয়ে আনলে সে ঝোপের ভেতর ওই শিক্ষিকার মরদেহ দেখিয়ে দেয়।

এ কর্মকর্তা বলেন, আনারুল দাবি করছে, খুনে সে একাই জড়িত। কিন্তু ভাড়া বাসায়, নাকি নির্মাণাধীন ভবনে খুন করেছে, সে বিষয়ে অসংলগ্ন তথ্য দিচ্ছে। এ দুই জায়গার যেখানেই খুন করুক; একা তার পক্ষে ঝোপের ভেতর মরদেহ ফেলা সম্ভব কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার জাকির হাসান জানান, আনারুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছে, ওই শিক্ষিকাকে খুন করে সে ১০ হাজার টাকার মতো নিয়েছে। তা ছাড়া দুটি মোবাইল ফোনও নিয়েছিল। তার কাছ থেকে দুই হাজার ৬৫০ টাকা ও মোবাইল ফোন দুটি উদ্ধার করা গেছে। তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com