রাজনীতি

প্রতিহিংসা নয়, মানবতাই হোক অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মাহবুব হাসান

২০ নভেম্বর ২০২১, সারাদেশে বিএনপির 'গণঅনশন কর্মসূচি' পালিত হয়। দেশের সব জেলা-উপজেলায় বিএনপি নেতাকর্মীরা এ কর্মসূচি (৮ ঘণ্টার অনশন) পালন করেছেন। মাত্র তিনটি জেলায় কিছুটা গোলমাল পাকিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ। অনেকেই বলেন, পুলিশও সরকারি দলের কর্মীতে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। সরকারের কাছে দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি গণঅনশন করছে; সেখানে ছাত্রলীগ বা পুলিশ কেন হামলা করবে? একটি দৈনিকের শিরোনাম- খুলনা, বরগুনা ও ফরিদপুরে পুলিশ হামলা করেছে আর পটুয়াখালীতে হামলা করেছে ছাত্রলীগ।

'শীতঘুম' থেকে জেগে উঠেছে বিএনপি আরেক শীতকালের প্রারম্ভে। ২০ নভেম্বরের বিএনপির গণঅনশন কর্মসূচিকে এভাবেই চিত্রিত করতে পারি আমরা। কারণ গত ১২ বছরে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সেদিনের মতো কখনোই উত্তাল হয়নি। যদি হয়েও থাকে বা তাদের রাজনৈতিক শক্তি দেখানোর মতো কর্মসূচি দিলে বর্তমান সরকার স্বস্তিতে থাকতে পারত না। ভোটে হোক বা তা 'বৈধ বা অবৈধ' যা-ই হোক, তাতে কী এমন ক্ষতি, তাতে কী এমন লজ্জার? তারা তো ক্ষমতায় অব্যাহতভাবেই থাকতে পারছে। সেটাই তো ক্ষমতার রাজনীতির জন্য যথেষ্ট।

রাজনীতিতে তো লজ্জা-শরম তিরোহিত হয়েছে অনেক আগেই। সেটা দেশের আমজনতা জানে। তবে তারা এতটাই সহনশীল যে, সেই সত্য প্রকাশ্যে বলে না। তারা সামাজিকভাবে ও উৎপাদন-স্বার্থের জন্যও সোচ্চার নয়। আর তারা 'রাজনৈতিকভাবে তো সংগঠিত নয়ই'। এ কারণেই অনেক রাজনীতিক অবিরল ধারায় সত্য-মিথ্যার ইতিহাসকে রমরমা করতে পারছেন। ২০ নভেম্বরের 'গণঅনশন কর্মসূচি' পালন করে সফল হয়েছে বিএনপি- এটা তারা মনে করতেও পারে। কিন্তু সরকার তাদের দাবি পূরণ না করলে সেই সাফল্য চোখে দেখা যাবে না। সরকার যে দাবি মেনে নেবে না আইনের দোহাই দিয়ে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যই তা প্রমাণ করেছে। এটা যদি বিএনপি না বোঝে (না বোঝার কোনো কারণ নেই), তাদের ধরতে হবে ব্যাপকভাবে আন্দোলনের পথ। সেই ঘোষণাই দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মির্জা ফখরুল তার কর্মসূচিতে বলেছেন, 'তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দিতে হবে। সরকার যদি খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে না দেয়, তাহলে তারা সরকার হঠানোর আন্দোলনে নামবেন এবং এই গণঅনশন কর্মসূচিই হলো তার সূচনা।' সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, 'তার ক্ষমতাবলে খালেদা জিয়াকে কারাগারের বাইরে এনেছেন, বাসায় থেকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দিয়েছেন। আর কী মানবিকতা চান তিনি? তিনি তো আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। আর আমি তাকে বাঁচানোর জন্য কারাগারের বাইরে এনে রেখেছি। তিনি তো একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি- এটা ভুলে গেলে চলবে না।' আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, 'তিনি আইনের বাইরে যেতে পারবেন না।' অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে সরকার বিদেশে যেতে দেবে না।

শেখ হাসিনা বিএনপির রাজনীতিকে ঠেলে এক কোণে নিয়ে আসতে পেরেছেন- এটা তার দল ও সরকারের পুলিশি সাফল্য- এ বক্তব্য অনেক সচেতন মানুষেরই। এও তারা বলছেন, দলের নেত্রীকে মুক্ত করা ও দেশের বাইরে পাঠানোর আন্দোলনেই বিএনপিকে ব্যস্ত রেখেছেন শেখ হাসিনা। সরকারের 'উন্নয়ন আগে পরে গণতন্ত্র' বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করতে বেশি সময় ব্যয় করতে পারছেন না বিএনপি নেতারা। আওয়ামী লীগ ও সরকার চায় বিএনপিকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। দলের সাংগঠনিক অবস্থা কতটা শক্তিশালী ও দলের নেতাকর্মীরা কতটা আত্মনিবেদিত, তার প্রমাণ মিলবে গণআন্দোলনে। এর বাইরে বিএনপির রাজনৈতিক চেতনায় নতুন কোনো ডাইমেনশনাল চিন্তার প্রকাশ নেই। রাজনীতিকে নতুন চিন্তার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। কেন্দ্র থেকে নয়, তৃণমূল থেকে রাজনৈতিক চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অর্থাৎ বিএনপি নেতাদের উচিত গ্রাম স্তর থেকে শুরু করা। এ বিষয়টি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নখদর্পণে। কিন্তু গোটা রাজনৈতিক কর্মসূচির প্যাটার্ন ঢেলে সাজাতে তাদের গতানুগতিকতার বাইরে এসে কাজ করতে হবে।

টিভির টকশোতে বিএনপি নেতারা যতই যুক্তি দিয়ে কথা বলুন না কেন, সে কথাগুলো তৃণমূলের উৎপাদক কৃষকরা শোনেন না; শুনতে পান না। তাদের কাছে যেতে হবে। তাদের বলতে হবে কী কী কারণে তারা সরকার পতনের আন্দোলন করতে চাইছেন। সেসব কারণের তালিকা তৈরি করে জনগণের হাতে তা পৌঁছে দিন। তারা সে তালিকা পড়ে বুঝুক এবং সিদ্ধান্ত নিক যে সরকার উৎখাত করার যে দাবি ও আন্দোলন করছে বিএনপি, তার যৌক্তিকতা কতটুকু। এই বিচারের ভার তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। নগর-মহানগরের মানুষ চালাক-চতুর ও স্বার্থান্বেষী। এরাই আমাদের অচিহ্নিত মধ্যবিত্ত। আবার এরাই আমাদের আলো জ্বালাতে সহায়ক ভূমিকা নেন। অতীতেও নিয়েছেন আজও নেবেন। ধারণা করি, ভবিষ্যতেও নেবেন। কিন্তু কাজটা করতে হবে রাজনীতিকদেরই।

সমস্যা হলো, এমন পথ অনেকেই অনুসরণ করেন না। আমাদের দেশের রাজনীতির প্রধান অন্তরায় নীতি-আদর্শ। আমাদের রাজনীতি ঢুকে পড়েছে প্রতিহিংসার সরু সুড়ঙ্গে। আর সেই সুড়ঙ্গে আলো নেই দর্শনের। মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় যে সৌন্দর্য ছিল আমাদের সমাজ-প্রতিবেশে, আজ তা যেন শূন্যের কোঠায়। এই অন্ধ ও দূরদৃষ্টিহীনতার প্রতিবেশের নাগরিক আমরা। এই দেশ, সমাজ, সাংস্কৃতিক বিভেদ, রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ দেশ আমরা চাই না। রাজনৈতিক সংকট দূর হোক, এটাই তো আমরা চাই। দেশের সাধারণ মানুষও সেটা চায়, যেখানে রাজনীতি হবে সবাই মিলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যম এবং রাজনীতিকরাই হবেন এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। কাজটা গ্রাম থেকেই শুরু করতে হবে।

কবি ও সাংবাদিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com