সরেজমিন পীরগঞ্জ

এক দল গ্রাম ছাড়ে না অন্যরা ঘরে ফেরে না

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২১ । ১২:৪১ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব নূর, পীরগঞ্জ (রংপুর) থেকে

পীরগঞ্জে আতঙ্কের মধ্যেই মাছ ধরতে জলে নেমেছেন জেলেরা। মাঝিপাড়ার কাছে আখিরা সেতুর পাশ থেকে বুধবার তোলা ছবি - সমকাল

মাঝিপাড়ায় পা রাখার প্রথম দিনের কিছুক্ষণ পরই দেখতে পেলাম আখিরা সেতুর অন্য পাড়ে নারীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে। সেটা গত ২৫ অক্টোবরের কথা। সেতুটাই যে হিন্দু-মুসলিম বসতির বিভাজন রেখা তখনও তা জানা ছিল না। তবে টানা চার দিন ঘোরাঘুরিতে পুরো এলাকাটাই ভালো করে চেনা হয়ে গেছে। ছোট্ট নদীটির এক তীরে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষ মানুষের বেশিরভাগ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আছেন। সেদিন গণগ্রেপ্তারে বিক্ষুব্ধ নারীরা মিছিল করার চেষ্টা করছিলেন।

এই যখন অবস্থা তখন অন্য তীরে জেলে সম্প্রদায়ের হিন্দুরা পোড়া ঘরবাড়ি গোছানো শেষ করার পরও পারতপক্ষে গ্রামের বাইরে যাচ্ছেন না। মাছ ধরতে বড়জোর সেতুর নিচ পর্যন্ত আসছেন। মাছ বিক্রি করতে যাওয়া তো দূরের কথা, অনিবার্য প্রয়োজন না হলে বাজার-সদাই আনতেও যাচ্ছেন না। আখিরা নদীর বটেরহাট তীরে এখনও প্রতিদিন এসে ক্ষোভ জানাচ্ছেন নারীরা। গ্রামের পুরুষরা গ্রামে থাকতে পারছেন না গ্রেপ্তার আতঙ্কে। তাদের দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে গ্রামের মানুষ ছিল না বললেই চলে।

আসামি গ্রেপ্তারে প্রতিদিন অভিযান চলছে। শুধু পীরগঞ্জে নয়, পাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন উপজেলাতেও অভিযান চলছে। বিশেষ করে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার জামায়াতে ইসলামীর দুর্গ বলে পরিচিত ধাপেরহাট বন্দর থেকে অন্তত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর অবস্থিত ধাপেরহাট বন্দর থেকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়ার দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটারের মতো। ধাপেরহাট বন্দরের দক্ষিণে পলাশবাড়ী, উত্তরে পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর, পূর্বে সাদুল্যাপুর উপজেলা শহর ও গাইবান্ধা সদর, পশ্চিমে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ। অভিযান চলছে এই উপজেলাগুলোতেও। গ্রেপ্তার, রিমান্ডে থাকাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও কাদের মদদে সহিংসতা চালানো হয়েছে এটি উদ্ঘাটনে ব্যস্ত সময় পার করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছু গোপন রাখা হচ্ছে বলে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন। তবে কতদূর এগোলো তদন্ত তা ১২ দিনেও পরিস্কার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের ইমাম, শিবির কর্মী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ ৭০ জন। জেলা প্রশাসন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে পুরোদমে।

১৭ অক্টোবরের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একমাত্র মামলাটির বাদী হয়েছে পুলিশ। মোট চারটি মামলার অন্য তিনটি ডিজিটাল সিকিউরিটি (আইসিটি) আইনে দায়ের করা। এ মামলাগুলোর দুটির বাদী পুলিশ। অন্যটির বাদী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সহিংসতার এক দিন পর গত ১৯ অক্টোবর পীরগঞ্জ থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে ৪১ জনসহ অজ্ঞাত আরও অনেককে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ইসমাইল হোসেন জানান, আগের দিন পুলিশ অপেক্ষা করছিল ভুক্তভোগীরা কেউ মামলা করতে আসেন কিনা সেই জন্য। ১৯ অক্টোবরই তিনি আইসিটি আইনে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার ঘটনায় মাঝিপাড়ার পরিতোষ দাস নামে এক কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ওইদিন সীমান্তবর্তী জেলা জয়পুরহাট থেকে পলাতক পরিতোষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুপুরে তাকে আদালতে আনা হলে পরিতোষ ফেসবুকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

জানা যায়, পরিতোষকে উস্কে দেওয়ার জন্য বড় মজিদপুর গ্রামের উজ্জ্বল হাসান দুর্গা প্রতিমাকে বিকৃত করে একটি মেসেজ পাঠান। মেসেঞ্জারেই উজ্জ্বলের কাছে কাবা শরিফের একটি বিকৃত ছবি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেটিকে প্রকাশ্যে এনে সঙ্গে পরিতোষের ছবি জুড়ে পোস্ট করেন উজ্জ্বল ও আল আমিন। সেই পোস্ট ছড়িয়ে দেন কারমাইকেল কলেজের বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মন্ডল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার জেরে গত ১৭ অক্টোবর রাতে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামের উত্তর পাড়ায় হিন্দুদের ৩০টি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে পুলিশের কাছে পরিস্কার হয়েছে হামলাটি পরিকল্পিত, বহিরাগতরাও সহিংস হামলায় অংশ নিয়েছিল।

ফেসবুকে পোস্ট করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাড়ানোসহ হিন্দুপল্লিতে হামলার আগে উগ্রবাদীদের উত্তেজিত করার অভিযোগে রামনাথপুর ইউনিয়নের আল আমিন ও উজ্জ্বল হাসানকে ১৯ অক্টোবর রাতে দিনাজপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০ অক্টোবর রাতে পীরগঞ্জ থানার এসআই সুপথ তালুকদার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আল আমিন ও উজ্জ্বল হাসান নামে দু'জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

২২ অক্টোবর র‌্যাবের হাতে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সৈকত মন্ডল ও রবিউল ইসলামকে ২৪ অক্টোবর আদালতে নেওয়া হলে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শুনানি শেষে আদালতের বিচারকের নির্দেশে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। ২৪ অক্টোবর রোববার সকালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মন্ডলের নামে মামলা দায়ের করা হয়। ওই দিনই সহিংসতার মামলায় চালান দেওয়া হয় সৈকতের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বটেরহাট মসজিদের ইমাম রবিউল ইসলামকে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন র‌্যাবের সহকারী পরিচালক আব্দুল আজিজ।

২৪ অক্টোবর রাতে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থেকে দুই শিবির কর্মী আবদুল্লাহ আল মামুন মন্ডল ও উমর ফারুক ওরফে টনেটকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আরও অন্তত তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামুন ও ফারুককে ধাপেরহাট বন্দর-সংলগ্ন গোবিন্দপুর গ্রামের ভাড়া বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। তাদের আটকে সাদুল্যাপুরের পুলিশ সহায়তা করেছে বলে জানান ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার রায়। তিনি বলেন, মামুন মন্ডলের বিরুদ্ধে মাঝিপাড়ায় হামলা, অগ্নিসংযোগসহ ফেসবুকে আপত্তিকর উস্কানিমূলক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাদুল্যাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাহারিয়া খাঁন বিপ্লব ২৬ অক্টোবর উপজেলার আইনশৃঙ্খলা সভায় দাবি করেন, 'মামুন মন্ডল বর্তমানে নাটোর জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। তার দলের হাইকমান্ডের নির্দেশেই সে এখান থেকে নাটোর গেছে। মামুন মন্ডল ধাপেরহাট এলাকায় ২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও তাণ্ডব চালিয়েছে। তার বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা রয়েছে। মামলায় সে জেলেও গিয়েছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে এসে মালয়েশিয়া পালিয়ে যায়। সেখান থেকে দেশে ফিরে আবার জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে।' মামুনের বাবা ধাপেরহাট ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের জবেদ আলী মন্ডলের দাবি, তার ছেলে একসময় হয়তো ভুল করেছিল। কিন্তু মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসে সে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েই ব্যস্ত। জবেদ আলী মন্ডল নিজেকে ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি বলে দাবি করেন। তবে এ নিয়ে বক্তব্য জানতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাদের কারোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রংপুর জেলা পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, 'পীরগঞ্জের ঘটনাটি খতিয়ে দেখে আমরা গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে অনেক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করেছি। তাদের অনেকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তারা আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা পরিপূর্ণ তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারব।'

রংপুর জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) গোলাম রব্বানী বলেন, 'আমরা প্রায় প্রতিদিনই পীরগঞ্জের সহিংসতার বাড়িগুলোতে যাচ্ছি। জনে জনে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। কোথায় থেকে, কীভাবে ঘটল তা আমরা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার ৭ দিন সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখানে তদন্ত করতে আরও কিছু সময় লাগবে।

সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক, রংপুর জেলা শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন বলেন, 'বিগত ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর কোনোটিরই বিচার তো দূরের কথা, সুষ্ঠু তদন্ত পর্যন্ত হয়নি। তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়নি। কারণ এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই ওপর মহল থেকে এর দায় বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে পুলিশ তদন্ত না করে গ্রেপ্তার বাণিজ্যে মেতে ওঠে। তাই রামনাথপুরের ঘটনায়ও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো বিশেষ কিছু দেখতে পাচ্ছি না।'

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলুও অভিন্ন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, 'রাজনৈতিক দোষারোপ বন্ধ করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তারসহ আইনের আওতায় আনার দাবি আমাদের।'

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মেরিনা লাভলী, নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর অফিস)

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com