'নারী কৃষকের উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ'

কৃষি ও বাজার ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করতে হবে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

দেশের মোট শ্রমশক্তির অর্ধেক নারী। তাদের ৭০ শতাংশ কৃষি খাতের সঙ্গে জড়িত। বাজার ব্যবস্থা নারীবান্ধব না হওয়ায় তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এতে নারীর ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ হচ্ছে না। নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়তে পারলে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। আগামী দিনের কৃষি ও বাজার ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করতে হবে। গত ৩০ জুন 'নারী কৃষকের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ' শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, একশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক সমকাল যৌথভাবে এ অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় জানানো হয়, নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় একশনএইড বাংলাদেশের 'মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন' (এমএমডব্লিউডব্লিউ) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের চারটি জেলায় নারী কৃষি উদ্যোক্তারা সাফল্যের আলো ছড়িয়েছেন। সফলতার সেই উদাহরণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ূক। সরকারি-বেসরকরি সংস্থাগুলো নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করুক। প্রচলিত বাজারগুলো হোক নারীবান্ধব। আরও বলা হয়, সরকারের অবকাঠামোতেও নারীকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নারীর ক্ষমতায়ন অনেক সহজ হবে। এ জন্য সম্মিলিতভাবে সবাইকে কাজ করতে হবে।

মুস্তাফিজ শফি

আমরা নারীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে সবসময় থাকতে চাই; ত্বরান্বিত করতে চাই তাদের অগ্রযাত্রা। আমরা মনে করি, অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। আমরাও চাই নারীবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। নারীর জন্য যেমন আলাদা বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, তেমনি প্রচলিত বাজার ব্যবস্থাকেও নারীবান্ধব করতে হবে। একই সঙ্গে নারী কৃষকরা উদ্যোক্তায় পরিণত হোক। একশনএইড চারটি জেলায় আশা জাগানিয়া উদাহরণ তৈরি করেছে। চারটি জেলা থেকে নিশ্চয়ই এই গল্প ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়বে। প্রকল্পের উপকারভোগী নারীর সফলতার গল্পগুলো অন্য নারীদের উৎসাহিত করবে। সমকালের পাতায় সফলতার গল্পগুলো তুলে ধরছি। নারীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে আমরা আছি। আমরা মনে করি, এটা এক দিনের আলোচনা নয়, সবাই মিলে এ আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিন এমন আলোচনার মধ্য দিয়ে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাব। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, দাতা সংস্থা- সবাই মিলে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করব। সবার প্রচেষ্টায় নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, নারী কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

মো. আসাদুল্লাহ

কৃষিতে নারীর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নারীর অবদানের কারণেই কৃষি সমৃদ্ধ হয়েছে। আগে জনপ্রতি জমির পরিমাণ ছিল ২৮ ডিসিমেল' এখন তা ১০ ডেসিমেল। তারপরও আমরা খাদ্য উৎপাদন অনেক বাড়াতে পেরেছি। গ্রামে বসবাসরত প্রত্যেক নারী নিজ নিজ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। নারী যে শ্রম দিচ্ছেন, তা শ্রম হিসেবে আসছে না। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নারীকে সম্পৃক্ত করতে আমাদের কৌশল ও পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে আট হাজার ৯৬৫টি সমবায় সমিতি গঠন করেছি। সেখানে প্রায় দুই লাখ নারী সংযুক্ত। এসব নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বেশকিছু স্থানে নারীর সফলতার গল্প আমাদের আশা জাগাচ্ছে। চাকরিজীবনে কাছ থেকে অনেক সফল নারীকে দেখেছি। ফরিদপুরের সাহেদা নামে এক নারী পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করে চার কোটি টাকা আয় করেছেন। আমাদের দেশে যেসব বীজ কোম্পানি আছে, তাদের কেউ এ পরিমাণ বীজ বিক্রি করতে পারেনি। তার নিজস্ব ফার্মে ৭০-৮০ জন নারী কৃষক কাজ করছেন। তাকে দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। খুলনায় ঝড়ভাঙ্গা মহিলা সমবায় সমিতির অধীনে প্রতিটি বাড়িতে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি হচ্ছে। গত বছর ৬ লাখ টাকার ভার্মি কম্পোস্ট বিক্রি হয়েছে। গাজীপুরের সেলিনা আক্তার নামে আমাদের এক কৃষক আছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তার বাগানের একেকটা লাল গোলাপ তিনি ৫০ টাকায় বিক্রি করেন। তার বাগানে জিনাইন কলা, স্ট্রবেরি ও ক্যাপসিকাম উৎপাদন হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো। এক সময় উৎপাদনে পুরুষ কৃষক আসতেন; ইদানীং শিক্ষিত নারী কৃষকরাও আসছেন। আমাদের যান্ত্রিকীকরণেও অনেক নারী কৃষক আসছেন। উপজেলা পর্যায়ে কাজ করার সময় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক নারীকে সফল হতে দেখেছি। এক কৃষাণী বলেছেন, তার উৎপাদিত ডিম তিনি হালি ১০ টাকায় বিক্রি করতেন। যাদের কাছে তিনি বিক্রি করতেন, তারা সেটি নিয়ে ২০ টাকায় বিক্রি করতেন। ওই নারী পরবর্তী সময়ে যাদের বাড়িতে ডিম উৎপাদন হয়, তাদের কাছ থেকে সরাসরি ডিম সংগ্রহ করে সাপ্লাই দিয়ে লাভ করা শুরু করেছেন। এভাবে গ্রামীণ নারীরা কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এখনও আমাদের মার্কেটিং নারীবান্ধব হয়নি। আমরা খুব দ্রুতই সফল হবো। নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলব। কৃষিতে নারীর বিচরণও সফল হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে ২ কোটি টনের বেশি সবজি, এক কোটি ২৭ লাখ টন ফল উৎপাদন হচ্ছে। এ দুটি ক্ষেত্রেই গ্রামীণ নারীর ভূমিকা অনেক বেশি। নিরাপদ খাবারের কথা চিন্তা করে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এ বছর ১০টি জেলার ১০টি উপজেলা এবং ১০টি ইউনিয়নে আমরা প্রদর্শনী করেছি। এ প্রদর্শনীর অধীনে ১০০ একর জমিতে ৫০০ জন কৃষক কাজ করছেন। এখানে নারীর মাধ্যমেই কাজ করা হয়। নারীকে আমরা কৃষিকাজে আগ্রহী করে তুলছি। যান্ত্রিকীকরণেও নারীকে নিয়ে আসছি। অনেক নারীকে আমরা দেশের বাইরেও কৃষিব্যবস্থা দেখানোর জন্য পাঠিয়েছি। নারীর শ্রম শক্তিশালী করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করছে। আগামী দিনের কৃষি ও বাজার ব্যবস্থা হবে নারীবান্ধব। আগামী দিনে নারীরা কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ করবেন। আমরা নিরাপদ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো।

ফারাহ কবির

নারীর অবদানের গল্পগুলো আমরা সামনে আনতে পেরেছি; এটি আমাদের জন্য বড় পাওয়া। আমরা এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্প নেওয়ার আগেও প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক কাজ করেছি। গত ৫ বছরে এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীর জীবনে পরিবর্তন আমাকে অনেক উৎসাহী করছে। কিছুটা তৃপ্তির জায়গায় আছি আমরা। কিন্তু আমরা শুধু চারটি জেলায় কাজ করেছি। এ অর্জনগুলো নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে বলে আশা করছি। সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকারের তথ্য নারীর কাছে যাচ্ছে কিনা তাও নিশ্চিত করতে হবে। নারী কৃষিতে ব্যাপক অবদান রাখছেন- এটি প্রমাণ হয়েছে। ফলে সরকারের সব উদ্যোগ নারীবান্ধব হতে হবে। নারী তার উৎপাদিত পণ্য যেন ভোগ করতে পারেন। নারীর পাশাপাশি শিশুবান্ধব বাজার তৈরিতেও জোর দিতে হবে। কারণ যে নারী উদ্যোক্তা বাজারে ব্যবসা করবেন, তিনি তার শিশুকে যেন উপযুক্ত পরিবেশে রাখতে পারেন। গ্রামগঞ্জের বাজারগুলোয় টয়লেট ব্যবস্থা নেই। কাঠামোতে নারীর প্রাকৃতিক প্রয়োজন কিংবা স্বাস্থ্যের বিষয়টিও নেই। আমাদের প্রকল্পের কারণে নারীরা অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন। এই চিত্র দেশের সব জায়গায় সমান নয়। নারীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেখানে আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য নারীকে আনতে হলে, তার সঙ্গে তার সন্তানকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণের ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে। করোনাকালে ই-কমার্সকে অন্তত আগামী দুই বছর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ওয়েবসাইট তৈরির জন্য একটি দল করে দিতে হবে, যারা নারীকে এই সহায়তা দেবে। পণ্য পৌঁছানোর জন্য নারীর পরিবহন ব্যবস্থা নেই। গ্রামগঞ্জে 'পাঠাও' কিংবা 'ফুডফান্ডা' নেই। গ্রামগঞ্জেও এসব সার্ভিস নিয়ে যেতে হবে। বাজেটে নারী উদ্যোক্তার জন্য কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। এক কোটি টাকার নিচে কোনো নারী উদ্যোক্তার ভ্যাট থাকা উচিত নয়। নারীর জন্য ডিজিটালাইজেশনের জায়গায় ফ্রি কিংবা সস্তায় সাহায্য দিতে হবে। যেখানে উৎপাদন হয় সেখানেই সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা করার উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো না করলে নারী উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়বেন। একশনএইডের উদ্দেশ্য ছিল উদাহরণ সৃষ্টি করা। সরকার ও দাতাগোষ্ঠী যেন এসব উদাহরণের শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে। সরকারের জয়িতা ফাউন্ডেশন নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছে। শুধু গ্রামে নয়, আমাদের নগর এলাকার নারী উদ্যোক্তাদের নিয়েও কাজ করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের পাশে সবাইকে থাকতে হবে। নারীরা ছিলেন বলেই খাদ্য নিরাপত্তা করোনাকালেও হুমকিতে পড়েনি। সমকালসহ অন্যান্য গণমাধ্যম আমাদের নারীর সফলতার গল্পগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারে। এতে অন্যরা অনুপ্রাণিত হবেন।

একেএম মনিরুল আলম

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মিশনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীকে কৃষির সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করা। নারী কিন্তু আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে যুক্ত। ধান-চাল সংগ্রহ ও বিপণনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ নারী কৃষক জড়িত। ধানের বীজ সংরক্ষণ, সংগ্রহ ও বিপণন নারীর মাধ্যমেই হচ্ছে। সরকারের সব প্রকল্পে ৩০ শতাংশ নারী কৃষকের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের ৩৩টি প্রকল্প এবং সাতটি কর্মসূচিতে অনেক নারী কৃষক যুক্ত। অঞ্চলভিত্তিক প্রকল্পের অধীনে সবজি ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের সঙ্গে বহু নারী যুক্ত। অনেক কৃষাণী আছেন, যারা কৃষির সঙ্গে জড়িত হয়ে সমাজকে অনেক কিছু দিয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলে ২ লাখ টন মুগডাল উৎপাদন হচ্ছে, যা বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এর সঙ্গেও নারী জড়িত। আমরা নারী কৃষকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করছি। নারী কৃষক এগিয়ে আসছেন বলেই কৃষি এতটা সমৃদ্ধ হয়েছে।

ওসমান হারুনী

নেদারল্যান্ডস দূতাবাস থেকে নারীর জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীকে মূল স্রোতের সঙ্গে নেওয়া উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ নারীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজার ব্যবস্থায় নিতে পারছেন না। ফলে বাজারের সঙ্গে গ্রামীণ নারীকে যুক্ত করতে আমরা একশনএইডের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালনা করছি। এর মাধ্যমে নারীকে সংগঠিত করা হয়েছে। গ্রুপের মাধ্যমে নারীর পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রচলিত বাজার কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। ফলে বাজার ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী বড় ভূমিকা রাখছেন। করোনাকালে সবাই ধাক্কা খেয়েছে। সে ক্ষেত্রে বগুড়ার নারী কৃষি উদ্যোক্তারা ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। অনলাইন মার্কেটে নারী ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়ার ফলে তারা ব্যাপক উৎসাহী হয়েছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারী বড় ভূমিকা রাখলেও বড় হতে পারছেন না। তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ যারা দিচ্ছে, তারা বড় সহায়তা দিচ্ছে না। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নারীবান্ধব হতে হবে। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস থেকে আমরা করোনাকালে নারীর ক্ষমতায়নকে অন্যতম দিক হিসেবে রেখেছি। নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে আমরা কাজ করছি। বাংলাদেশ সরকারকেও নানা ক্ষেত্রে সহায়তা দিচ্ছি। প্রতিনিয়ত বাজার মনিটর করতে আমরা উৎসাহী করছি। একশনএইডের প্রকল্পে সহায়তার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় নারী উদ্যোক্তাদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছি। নারীর উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য আমরা সহায়তা দিচ্ছি। করোনাকালে পণ্য সরবরাহে বিশেষ বিশেষ প্যাকেজের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একশনএইডের প্রকল্পের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিয়ে যেন অন্যরাও কাজ করেন। এটা নিয়ে মিডিয়াও যেন কাজ করে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে কৃষি এবং বাজার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন হবে।

শারমিন ইসলাম

একশনএইডের উদ্যোগ চমৎকার। তাদের তৈরি নারী উদ্যোক্তাদের গল্পগুলো বেশ উৎসাহের। নারীর উৎপাদিত পণ্য যখন তার হাতে আসে, তখন তার ক্ষমতায়ন হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ই-কমার্সে নারীকে যুক্ত করতে হবে। নারীর জন্য যন্ত্র আরও সহজ করে দিতে হবে। নারীর হাতে সহজ শর্তে যন্ত্র তুলে দিতে হবে, যাতে তার জীবন আরও সহজ হয়। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে জরুরি। গণমাধ্যম এখন অনেক ভালো কাজ করছে, কিন্তু গণমাধ্যমে এক সময় শুধু নেতিবাচক খবর আসত। সফলতার গল্পগুলো যদি মিডিয়া তুলে আনে, তাহলে অনেকেই উৎসাহী হবেন। একশনএইডের প্রকল্প থেকে বাজার ব্যবস্থা নিয়ে যে মডেল তৈরি হয়েছে, তা অন্যরা অনুসরণ করতে পারেন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্যগুলোকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বাজারের সঙ্গে নারী নয়- সে চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন হচ্ছে। নারীর ছোট থেকে বড় হওয়ার চাহিদা বেড়েছে। এসব নারীর জন্য দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরও বেশি চিন্তা করা দরকার। চাকরি তৈরিতে নারীরা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। নারীর ব্যবসা সম্প্রসারণে সবাইকে কাজ করতে হবে। একশনএইডের প্রকল্প থেকে আমাদের অনেক শেখার আছে। এই শিক্ষা সারাদেশে সম্প্রসারণে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

সাদিদ জামিল

আমরা কৃষিযন্ত্র ও বীজ নিয়ে কাজ করি। গ্রামীণ নারীরা তো কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে আছেনই; কিন্তু তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে সৃষ্টি কিংবা বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৃষিযন্ত্র ও বীজের ওপর ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এখানে নারীর জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। যন্ত্রের ওপর সরকার ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নারী এই যন্ত্র ক্রয় করছেন। বগুড়ায় এক নারী কম্বাইন্ড হারভেস্টার কিনেছেন। আগে হাত দিয়ে ধানের চারা রোপণ করা হতো। সেটি এখন যন্ত্রের মাধ্যমে লাগানো হচ্ছে। তবে এ যন্ত্রে একটি ট্রের মাধ্যমে চারা দিতে হবে। কাজটি খুব ভালো হচ্ছে না। কারণ যে যন্ত্র চালায় তিনি চারা বানাচ্ছেন না। আমরা নারীকে বলেছি ট্রেতে যেন চারা বানান। কিছু এলাকায় নারীরা এ কাজটি করছেন। আমরা নারীর জন্য কিছু ফ্রি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারি। যন্ত্র কিনতে নারীকে আমরা সহায়তা করব। আমাদের ৩০ শতাংশ নারী বীজ তৈরি করেন। আমরা তাদের টেকনিক্যাল সহায়তা দিচ্ছি। যতদিন কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ হবে না, ততদিন কৃষি অবহেলিত থেকে যাবে। সরকার যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রেখেছে। এখানে নারীর কাজের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

রেজাউল করিম সিদ্দিক

গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের সফলতার গল্পগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। একশনএইডের প্রকল্প ছাড়াও অনেক স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে নারীবান্ধব বাজার গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে কোনো বাজার মানুষের জন্যই উপযুক্ত নয়; সেখানে নারীর জন্য উপযুক্ত হওয়া তো আরও কঠিন। নারীর জন্য বাজার তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। একশনএইডের প্রকল্প থেকে যে বাজার তৈরি করা হয়েছে সেগুলো মডেল। এ মডেল ধরে আরও কাজ করা যায়। উৎপাদনের জায়গায় নারী বড় ভূমিকা রাখছেন। তারাই আমাদের খাদ্যের জোগান দিচ্ছেন। কিন্তু তার জায়গাটি সব সময় উপেক্ষিত। তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নারী নিজেই যেন সংসারের পার্টনার হয়ে ওঠেন। এতে গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। যে কোনো সংবাদপত্র যদি ভালো খবর সামনে নিয়ে আসে, তাহলে অন্যরা অনুপ্রাণিত হবে। গণমাধ্যম অনেক দিন সে কাজটি করছে। এভাবে আজ উপেক্ষিত কৃষি সম্মানজনক কৃষি হয়ে উঠেছে। কোথায় কোথায় সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের সুপারিশসহ সংবাদ প্রকাশ হতে পারে। সবাই মিলে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করতে পারলে নারীবান্ধব বাজার গড়ে উঠবে। শহরে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাবে। অনলাইনেও এগিয়ে গেছে তারা। কিন্তু গ্রামের নারীরা পিছিয়ে থাকবেন কেন? গ্রামীণ মনোজগতের পরিবর্তন দরকার। নারীকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে চাই। নারী যেন বাড়ি, সমাজ ও রাষ্ট্রে সম্মান পান। একশনএইড নারীর উন্নয়নে নানা রকম কাজ করছে। বিচ্ছিন্নভাবে এ কাজগুলো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এসব উদাহরণ সরকারসহ সবাই সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারে। এর ব্যাপক সম্প্রসারণ দরকার। এ কাজগুলো কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, তার পরিকল্পনা করা দরকার। আলো ছড়িয়ে দিতে হবে সারাদেশে।

রাজেকা খানম

আমি নারী কৃষি উদ্যোক্তা ও বেলকা বাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য। একশনএইডের এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়েছি। দক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিক্রির সক্ষমতাও বেড়েছে; বেড়েছে আয়। ছোট থেকে বড় হওয়ার চাহিদা বেড়েছে। আগে সবজি ও গবাদিপশু উৎপাদনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এখন আমরা পরিকল্পনা করে বাণিজ্যিকভাবে পণ্য উৎপাদন এবং তা সঠিকভাবে বাজারজাত করি। আমরা ঘরে বসে করোনার সময়ে অনলাইনে গরু বিক্রি করছি। আগে সবজি উৎপাদন করার পর তা স্বামী বিক্রি করতেন। সে টাকা নারীর হাতে আসত না। এখন কালেকশন পয়েন্টে পণ্য বিক্রি করে টাকা সঞ্চয় করতে পারছি। মার্কেটে এখন নারী সবজি নিজেরাই বিক্রি করতে পারছেন। এতে প্রত্যেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। প্রজনন ও স্বাস্থ্য বিষয়েও আমরা প্রশিক্ষণ পেয়েছি। প্রতিটি মার্কেটে একটি টয়লেট ও নারীর জন্য ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি আমরা পুষ্টি সচেতন হয়ে উঠেছি। আমি চাই প্রতিটি ঘরে নারী উদ্যোক্তা গড়ে উঠুক। একশনএইডের প্রকল্পটি যেন চলমান থাকে। নারী মার্কেটে গিয়ে বসতে চায়, কিন্তু দেশের সব স্থানে নারীবান্ধব মার্কেট গড়ে ওঠেনি। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে কাজ করতে হবে। একশনএইডের এ প্রকল্প থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিয়ে সরকারও সারাদেশে নারীবান্ধব বাজার তৈরি করতে পারে।

ড. শওকত আকবর ফকির

২০১৬ সাল থেকে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে একশনএইড বাংলাদেশ 'মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন (এমএমডব্লিউডব্লিউ)' নামে প্রকল্প পরিচালনা করছে। প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে পটুয়াখালীর গলাচিপা, ফরিদপুর সদর ও মধুখালী, বগুড়ার গাবতলী ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। বিদ্যমান গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থায় টেকসই ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে প্রচলিত বাজার ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করতে স্থায়ী ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন সাধন; নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীলতা, মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষতা, প্রতিযোগী মনোভাব বৃদ্ধি; নারী উদ্যোক্তা ও তাদের পরিবারে যৌন, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পুষ্টিমানের উন্নয়ন সাধন করা, যাতে গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রকল্প কর্মএলাকায় ৬০০২ জন নারী কৃষি উদ্যোক্তা ৩০টি ইউনিয়ন, ৩০টি বাজার কমিটি, ৩০টি ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে কাজ করেন। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারীর উৎপাদন বেড়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে বিক্রয় নিশ্চিত করতে প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটি পর্যায়ে ৭৬টি কালেকশন পয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে নারীর প্রবেশকে উৎসাহিত করতে বাজারে নারীবান্ধব ২২টি মার্কেট শেড নির্মাণ করা হয়েছে। ওইসব কালেকশন পয়েন্ট ও মার্কেট শেডে নারীর সুবিধার্থে টয়লেট, নলকূপ, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসার শিক্ষকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন। নারী বার্ষিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ করছেন। ৬০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক লাইসেন্স রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নারী উদ্যোক্তাদের অধিক পরিমাণে ঋণ দিচ্ছে।

করোনাকালে অনলাইন মার্কেটের সঙ্গে নারীকে যুক্ত করা হয়েছে। ঢাকার বেশকিছু অনলাইন মার্কেট আমাদের নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে পণ্য নিচ্ছে। গত তিন বছর ধরে দারাজ গাইবান্ধা থেকে আমাদের নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে গরু কিনছে।

ফরিদপুরের কল্পনা রানী ১৬ হাজার টাকা ও গাইবান্ধার মমতাজ বেগম মাসে ৬০ হাজার টাকা আয় করছেন। বগুড়ার বিপন্ন রানী সবজি উৎপাদন করে মাসে ১০ হাজার টাকা এবং পটুয়াখালীর গলাচিপার পুতুল রানী মুগডাল চাষ করে মাসে ১১ হাজার টাকা আয় করেন। বগুড়ার দুলালী বেগম পেঁপে চাষ করে মাসে ৪৮ হাজার টাকা আয় করেন। বগুড়ার জুলেখা বেগম হাঁস পালন করে মাসে ৩৬ হাজার টাকা, জাহানারা বেগম পোলট্রি মুরগি পালন করে মাসে ৪০ হাজার টাকা, সামসুন্নাহার বেগম স্থানীয় মুরগি পালন করে মাসে ৬৪ হাজার টাকা আয় করেন। গাইবান্ধার রোজিফা বেগম নিউট্রিশন পণ্য বিক্রি করে মাসে ১৭ হাজার টাকা, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মুকুল রানী মাসে ১২ হাজার টাকা, গলাচিপার রোজিনা বেগম ১০ হাজার টাকা, ফরিদপুরের সপুরা বেগম ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। গবাদিপশু পালন করে আরতি রানী উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। তিনি ঢাকার অনলাইন মার্কেটে দুধ ফ্রিজিং করে বিক্রি করেন। তিনি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন। পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে লাইজু বেগমের মাসিক আয় ২৬ হাজার টাকা। ফরিদপুরের তাসলিমা খাতুন ৪২ হাজার টাকা আয় করছেন। পটুয়াখালীর গলাচিপার কাসিরুন বেগম পান উৎপাদন করে মাসে ৯০ হাজার টাকা আয় করেন। ঢাকার মার্কেটে তিনি পান সরবরাহ করেন। একই উপজেলার রাজিয়া বেগমের পান বিক্রি করে মাসে আয় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। আমাদের প্রকল্পে হালিমা বেগম আউটপুট অ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছেন। তার মাসিক আয় ৬৩ হাজার টাকা। তিনি ফরিদপুরের কৃষকের বাজারে পণ্য সরবরাহ করেন। এ ছাড়া সেলিনা বেগম কৃষি খামার করে মাসিক আয় করছেন ৮২ হাজার টাকা। সুন্দরগঞ্জের ছকিনা বেগম ৯৫ হাজার টাকা মাসে আয় করেন। ফরিদপুরে আমরা একটি ভার্মি কম্পোস্ট ভিলেজ করেছি। এ এলাকার নারীরা এখন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। গ্রোসারি পণ্য বিক্রি করে গলাচিপার আকিনুর বেগম মাসে ৫২ হাজার টাকা আয় করেন। দই উৎপাদন করে বগুড়ার মালতি বেগম এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন। তিনি নামকরা ব্র্যান্ডিং শপে দই সরবরাহ করছেন। দক্ষিণাঞ্চলের গলাচিপা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হয়েছে মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন প্রকল্প। এ প্রকল্প এলাকায় প্রধানত তিনটি পণ্যের ভ্যালু চেইন নিয়ে কাজ করা হয়েছে- পান, মুগডাল ও সবজি। মুগডাল উৎপাদনে জড়িত নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মুগডালের বৃহৎ ক্রেতারা যুক্ত। কালেকশন পয়েন্ট ব্যবহার করে নারী উদ্যোক্তারা তাদের মুগডাল বিক্রি করে থাকেন। এতে তাদের পরিবহন খরচ ও সময় দুই-ই সাশ্রয় হয়। বাড়ির কাছে কালেকশন পয়েন্ট হওয়ার ফলে নারী উদ্যোক্তারা অল্প পরিমাণে উৎপাদিত পণ্যও বিক্রি করতে পারছেন। এতেও নারী উদ্যোক্তাদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হয়েছে। এভাবে আমাদের প্রকল্প এলাকার নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের আয় বাড়ছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে আমরা অনেক অর্জন করেছি। প্রকল্পটি শেষ হতে চলছে। তবে একে আরও গতিশীল করতে সরকারের দপ্তরের সম্প্রসারণমূলক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জরুরি। কৃষিবাজারে গ্রামীণ নারী কৃষকের প্রবেশাধিকার আরও নিশ্চিত করতে সরকার নিশ্চয় কাজ করবে।

অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন

বাংলাদেশে নারীরা কৃষক হিসেবে কৃষিকাজে অনেক অবদান রাখছেন। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তা মূল্যায়িত হন না। এ মূল্যায়নের জন্য তাদের বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় তাদের সম্পৃক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রথমে বাজারের বর্তমান অবস্থায় নারী কর্নার নির্মাণ জরুরি। তাহলে সেখানে নারী তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনেই তারা সেখানে কাজ করতে পারবেন। নারীরা উৎপাদন করলেও অর্থ তার হাতে যায় না। এতে তার ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে। মানসিকতা পরিবর্তনে সমকালসহ গণমাধ্যমগুলো কাজ করছে। অনলাইনে নারীরা পণ্য বিক্রি করলেও নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর। পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসও নারীবান্ধব করতে হবে। নারী কৃষকদের জন্য আলাদা ওয়েবসাইট করা যেতে পারে। নারী উদ্যোক্তা ও উৎপাদকরা নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির জন্য উদ্যোগ নিতে পারে। প্রচলিত বাজারে অবকাঠামোগত সমস্যাও দূর করতে হবে। সরকারের মাধ্যমে এসব বাজারে নারীর জন্য আলাদা শেড নির্মাণ করা যেতে পারে। এতে বাজার ব্যবস্থায় গ্রামীণ নারী অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে।

তৌহিদ মো. রাশেদ খাঁন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সফল উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে এখন প্রচুর সবজি উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন মৌসুমে কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। পৃথক বাজার না থাকায় কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন। ভোক্তারাও বঞ্চিত হচ্ছেন নিরাপদ সবজি থেকে। নিরাপদ সবজির প্রাপ্যতা সহজ ও কৃষকের ন্যায্য দাম প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে 'কৃষকের বাজার' চালু হয়েছে। সপ্তাহে দু'দিন শুক্র ও শনিবার এ হাট বসে। করোনাকালেও বাজারটি খোলা আছে। ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সরাসরি সরকারি পরিবহনে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য নিয়ে আসা হচ্ছে। এখানে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য না থাকায় কৃষক সঠিক দাম পাচ্ছেন। সেচ ভবনের নিচে ১৫-২০টি স্টল রয়েছে। কৃষকের সংখ্যা এখানে বাড়ছে। এখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ঢাকা মহানগরীতে নিরাপদ সবজির জন্য বাজারটি ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় কৃষকের বাজার করা হবে। ৪২টি জেলায় নিরাপদ সবজির বাজার স্থাপন করা হয়েছে। এর আদলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জেলা পর্যায়ে ২০২১-২৩ অর্থবছরে কৃষকের বাজার করবে। এসব বাজার নারীবান্ধব করব। এসব বাজারে ৩০ শতাংশ নারী ব্যবসা করছেন। এ বাজারের একজন নারী উদ্যোক্তা বঙ্গবন্ধু কৃষিপদক পেয়েছেন। নারীকে কৃষিপণ্যের উদোক্তা ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য আমরা কাজ করছি। রাজশাহী ও রংপুরে আমাদের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৭৫টি বাজার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে নারীর জন্য আমরা আলাদা কর্নার করেছি। আমাদের অন্যান্য বাজারেও নারীর অংশগ্রহণ আছে। ফুল বিপণন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর গাবতলীতে একটি ফুল মার্কেট করা হবে। সেখানেও নারীর সুযোগ থাকবে। কৃষি নারী উদ্যোক্তাদের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। আমরা সে তালিকা তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। প্রতিটি প্রচলিত বাজারে যেন নারীর জন্য আলাদা কর্নার তৈরি হয়, সে জন্য আমরা কাজ করছি। এটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। নারী যাতে ন্যায্যমূল্য পান, তাদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া হবে। পরবর্তী প্রকল্পগুলোতে আমরা নারীর বিষয়টি মাথায় রাখব।

সঞ্চালক
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল

প্রধান অতিথি
মো. আসাদুল্লাহ
মহাপরিচালক
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়

সভাপতি
ফারাহ কবির
কান্ট্রি ডিরেক্টর
একশনএইড বাংলাদেশ

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

ড. শওকত আকবর ফকির
প্রকল্প সমন্বয়কারী
মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন (এমএমডব্লিউডব্লিউ) প্রকল্প
একশনএইড বাংলাদেশ

বিশেষ অতিথি

একেএম মনিরুল আলম
পরিচালক, সরেজমিন বিভাগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়

ওসমান হারুনী
সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার
(খাদ্য ও পুষ্টি)
নেদারল্যান্ডস দূতাবাস

তৌহিদ মো. রাশেদ খাঁন
প্রকল্প পরিচালক
কৃষকের বাজার স্থাপন প্রকল্প
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়

আলোচক

শারমিন ইসলাম
জেন্ডার অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি

ইঞ্জিনিয়ার সাদিদ জামিল
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মেটাল গ্রুপ

রেজাউল করিম সিদ্দিক
সহসভাপতি
ফুড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক

রাজেকা খানম
এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের উপকারভোগী ও নারী কৃষি উদ্যোক্তা
সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা

ড. ইসমাইল হোসেন
অধ্যাপক
কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন
জাহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com