'গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নের পথনির্দেশনা'

তৈরি করতে হবে নারীবান্ধব বিপণন নেটওয়ার্ক

প্রকাশ: ২৯ জুন ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

গ্রামে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমানতালে কৃষিকাজসহ নানামুখী ব্যবসায়ে উদ্যোক্তা হচ্ছেন। তবে এখনও অনেক জায়গায় নারীবান্ধব বাজারব্যবস্থা না থাকায় নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে। নারীবান্ধব বাজার তৈরির পাশাপাশি সরবরাহ ও চাহিদার সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের পরিচিত করাতে হবে। তৃণমূলের নারী উদ্যোক্তাকে পুরো দেশের বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাতে হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণও জরুরি। কারণ, করোনাকালে অনলাইন মার্কেটের উপযোগিতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে মানুষ। গত ১৪ জুন নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, একশনএইড বাংলাদেশ ও দৈনিক সমকালের যৌথ আয়োজনে 'গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নের পথনির্দেশনা' শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তার উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। অনলাইনে নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রিতে সফলতা আনতে তাদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশিক্ষণ না দিলে নারীরা 'অনলাইন মার্কেটপ্লেসে' সফলতা পাবেন না। নারীবান্ধব বিপণন নেটওয়ার্ক তৈরি ও তাদের বাজার সম্প্রসারণে যথাযথ পথনির্দেশনা দরকার। এ ক্ষেত্রে একশনএইড বাংলাদেশের 'মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন' (এমএমডব্লিউডব্লিউ) প্রকল্পের অভিজ্ঞতা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তার উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে।

মুস্তাফিজ শফি

আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়ন এখন শুধু আঞ্চলিক নয়- বৈশ্বিক উদাহরণ। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ কৃষিতে যুক্ত নারীরা অনেকটাই পিছিয়ে। আমরা চাই, জাতীয় উন্নয়নের ধারায় গ্রামীণ নারীর আরও অংশগ্রহণ। এর মধ্যে অনেকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের সেই অগ্রযাত্রার গল্পগুলো আমরা বারবার উপস্থাপন করতে চাই, যাতে অন্যরা অনুপ্রাণিত হয়।





আফরোজা খান

নারী মানেই যে কাঁথা সেলাই করবে, তা নয়। নারীদের বিচরণ সর্বত্র থাকবে, আমাদের নারীরা সবকিছু করতে পারে। আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে নারীর অনেক অবদান রয়েছে। তাদের উদ্যোগের পাশে আমরা দাঁড়াতে পারলে একজন নারীর আলাদা পরিচয় তৈরি হবে এবং তার অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও হতে পারে। একশনএইডের সঙ্গে কৃষিতে নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রাম পর্যায়ে নারীদের সুযোগ সৃষ্টি করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, জয়িতা ফাউন্ডেশন এ বিষয়ে কাজ করতে খুব আগ্রহী। নারীরা তাদের তৈরি পণ্য অনলাইনে বিক্রি করার মতো একটি নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতে জয়িতা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর করার একটি সুযোগও রয়েছে। আমাদের ইচ্ছা আছে, সারাদেশের নারী উদ্যোক্তারাই শুধু এই স্টোরের পণ্য জোগান দেবেন। তাদের যার যে ধরনের পণ্য আছে, তারা সেগুলো আমাদের সরবরাহ করবে এবং আমরা বিক্রির দায়িত্বটি নেব। তবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে। সেটি কীভাবে সমাধান করা যায়, আমরা দেখব। এই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটি আমরা খুব শিগগির চালু করতে যাচ্ছি। করোনাকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সরকারি প্রণোদনার মধ্যে ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য ৫০ কোটি টাকা পেয়েছে জয়িতা ফাউন্ডেশন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে চান। তবে আমি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, ঋণ ফেরত পাওয়ার অধিক নিশ্চয়তা থাকায় তারা প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী। এ ছাড়া এককভাবে নারীরা ব্যাংকে গেলে তাদের ঋণ দিতে চায় না। এ ক্ষেত্রে একশনএইড থেকে নারীদের একটি দল তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করা যায়, তাহলে ঋণের সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে বলে আমি মনে করি। এই কাজটা আমরা একসঙ্গেও করতে পারি। আমরা চাই, প্রকৃত নারী কৃষকদের কাছে ঋণটা পৌঁছাক; তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোন। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের পাশে দাঁড়ালে আমরা নিজেরা আত্মতুষ্টি পাব। সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যটি বাস্তবায়িত হবে। ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর জয়িতার উদ্বোধনের দিন তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, জয়িতা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে যাবে। আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে একটা মার্কেটপ্লেস তৈরি করি, তাহলে এটি প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নপূরণে সহায়ক হবে। এ ছাড়া মার্কেট স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই এগুলো দৃশ্যমান হবে। আমরা একটি ফুডকোর্ট চালু করার পরিকল্পনাও করছি। আগামী জুলাই মাসে সেটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা আছে। এখানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার মতো একটি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টাও করছি। সবাইকে এই ফুডকোর্টে আসার আগাম আমন্ত্রণ জানাই।

ফারাহ কবির

আমাদের একজন নারী উদ্যোক্তা তুলসী চা তৈরি করত। তার তৈরি চা নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশেই রপ্তানি হয়। আমরা ২১ জন নারী উদ্যোক্তাকে নিয়ে কাজ করেছি, পরে প্রকল্পটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের অর্গানিক কৃষিপণ্য ঢাকায় নিয়ে এসে বিপণনের ব্যবস্থা করতে একটি পাইলট প্রজেক্ট আমরা হাতে নিয়েছিলাম। তবে নারী উদ্যোক্তাদের এসব পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। আমার মনে হয়, প্রাইভেট সেক্টরের কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনকে আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে নিয়ে এলে ভালো হবে। আমাদের পরিবহন সেক্টরে যে মাফিয়া চক্র আছে, এর কারণে কোনো নারী উদ্যোক্তা স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারেন না। তারা নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কোনো সহায়তা করেন না। জয়িতা ফাউন্ডেশন এবং অন্যদের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা গেলে বা সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে খুব ভালো হয়। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি ক্ষেত্রকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার, এফবিসিসিআইর মতো সংগঠনগুলো নারী উদ্যোক্তাদের সদস্যপদ দিলে তারা অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় পাবে। নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগগুলো শিল্পের বাইরে রাখলে তারা বিনিয়োগ বা ঋণ পাবে না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন মার্কেটে পণ্য বিক্রি করতে গিয়েও নারী উদ্যোক্তাদের অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। ট্যাক্স রেজিস্ট্রেশন করতে নারীরা সমস্যায় পড়েন। এখানে উদ্যোগ নিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের এসব বিষয়ে সহায়তা করার মতো কিছু ভলান্টিয়ার তৈরি করতে পারি, তাহলে বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যাবে। এই আলোচনায় উঠে আসা কথাগুলো থেকে নারীরা অনেক উৎসাহ পাবেন। এত দিনের অর্জনগুলোই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আমরা আর পেছনের দিকে তাকাতে চাই না। আমাদের অনেক সমস্যা আছে, তবে সেসবকে পেছনে ফেলে নারী উদ্যোক্তারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এটিই আমাদের অনুপ্রেরণা। তাহলে আমরা এই আলোচনা থেকে কী নিয়ে যাচ্ছি! প্রথমত, জয়িতা ফাউন্ডেশন যে কাজগুলো করছে, সেখানে আমরা সবাই যুক্ত হতে চেষ্টা করব। ই-কমার্স বা ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসিসহ আমাদের যে চাওয়াগুলো ছিল, সেগুলো পূরণ হবে বলেও আশা করছি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইউএনডিপি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএন উইমেনসহ বাংলাদেশে অনেক প্রকল্প ও উদ্যোগ আছে। তারা কে কী করছেন, সেগুলো যদি আমাদের অবহিত করেন, তাহলে আমরা সেগুলো এক জায়গায় এনে পরিকল্পনা করে উদ্যোগগুলো নিতে পারব। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন বা পণ্য তৈরি করার ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাওয়ারনেস, বিজনেস প্ল্যান কীভাবে তৈরি করতে হয়, রিস্ক অ্যানালাইসিস, জলবায়ু, পরিবেশসহ সব বিষয় মাথায় নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আবার বাজারের জায়গাটিতে সেভাবেই জোর দিতে হবে এবং সেটি নারীবান্ধব হতে হবে। কারণ, নারী শুধু উৎপাদনই করে না, নারী একজন ক্রেতাও। তাই এখন থেকেই আমাদের এই ইতিবাচক বার্তাটি পাঠাতে হবে- নারীকে ক্রেতা হিসেবে সম্মান দিয়ে তার যে জিনিসগুলো প্রয়োজন, সেগুলো তৈরি করে পৌঁছে দিতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে যদি আলোচনা করে নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পরিবহনব্যবস্থা, কোল্ডস্টোরেজ ইত্যাদি ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তাহলে সেগুলো তাদের জন্য ভালো হবে। আমাদের দেশে আগে থেকেই নারী কৃষকদের ফোনে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করার ব্যবস্থাটি আছে। এসব তথ্য নতুনভাবে তুলে আনতে হবে। আর যে বার্তাগুলো নারী কৃষকদের কাছে যাবে, সেগুলো যেন সহজ হয়- এ বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আমরা আশা করব, মিডিয়া নারীদের সফলতার গল্পগুলো তুলে আনবে। নারী মানেই দুর্বল, বিষয়টি কিন্তু একেবারেই সত্য নয়। নারীর বলার ও কাজ করার ক্ষমতা এবং দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদান মিডিয়াগুলোতে সংবাদ ও ফিচার আকারে আরও ভালোভাবে উঠে আসা উচিত। আমাদের অর্থনীতিবিদরা শ্রমবাজারে কেমন শ্রমিক আসছে, সেটি নিয়ে আলোচনা করেন। সেইসঙ্গে আমাদের দেশে কী পরিমাণ নারী উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী বা শিল্পে আছেন, সেটিও উঠে আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। বড় ব্যবসাগুলো করোনাকালে একভাগে যেমন সফলতা পাচ্ছে, তেমনি অন্যভাগে ভুগছেও। এখনকার যুগে ছোট উদ্যোক্তা ও ই-কমার্সকে নিয়েই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে, এটিই বাস্তবতা। এসব কারণেই আমাদের চেষ্টা থাকে, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তা করা। সরকারের নীতিতে সহায়তার বিষয়টি থাকা এবং বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ থাকার তথ্যটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেন নারীরা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন না? বরাদ্দের এই টাকাগুলো ব্যাংকে পড়ে থাকে।

ড. শওকত আকবর ফকির

একশনএইড বাংলাদেশ এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের মাধ্যমে বাজারব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করে তুলতে এবং তাদের পক্ষে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করে চলেছে। পটুয়াখালীর গলাচিপা, ফরিদপুরের সদর ও মধুখালী, বগুড়ার গাবতলী এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কমিউনিটি পর্যায়ে ৬৭টি কালেকশন পয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। নারীবান্ধব ২২টি মার্কেট শেড নির্মাণ করা হয়েছে। এসব কালেকশন পয়েন্ট ও মার্কেট শেডগুলোতে নারীদের সুবিধার্থে টয়লেট, নলকূপ, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারও করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের বাণিজ্যিকভাবে কৃষিপণ্য উৎপাদন, আধুনিক বাজারজাতকরণ পদ্ধতি এবং ভেল্যু চেইন বিশ্নেষণসহ সংশ্নিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের নিয়ে ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েশন ও উপজেলা অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয়েছে এবং সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তর থেকে এ সংগঠনগুলোর রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের আওতায় ৭০ শতাংশের বেশি গ্রামীণ নারী কৃষি উদ্যোক্তা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করেছেন; যা তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক অধিকার ও ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করছে। এ ছাড়া অনলাইন মার্কেট, সুপারস্টোর ও বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের সংযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

আব্দুর রউফ

জয়িতা ফাউন্ডেশন প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহায়তা করে থাকে। নারী যদি আয়মূলক কোনো কাজে নিয়োজিত থাকে, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন হয়। যেসব নারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন কিংবা জনপ্রতিনিধি হন- তারাও নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করছেন। এর বাইরে যখন কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উঠে আসেন, তখন তিনি আর্থিক অনুদান পান। সেটি কাজে লাগিয়ে যখন তিনি ব্যবসা করতে সক্ষম হন, তার উপার্জন বৃদ্ধি পায়। পরিবারে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। নারী উন্নয়ন সমিতি বিভিন্ন কাজ করছে। নারী উদ্যোক্তাদের জয়িতা ফাউন্ডেশন আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে। সরকারও প্রণোদনা দিচ্ছে। প্রণোদনা ও আর্থিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা হলো- আট বছরে ২৮ হাজার নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা। সে লক্ষ্যে আমরা নারীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নারী স্বাবলম্বী হবে। জয়িতা ফাউন্ডেশন কিছু স্টল পরিচালনা করছে। রাজধানীর ধানমন্ডির স্টলে ৯৮ নারী উদ্যোক্তা কাজ করছেন। তারা এখানে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দোকান ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন। দেশের অর্ধেক নারী, তাদের বাইরে রেখে উন্নয়ন চিন্তা করা যায় না। প্রধানমন্ত্রীও চান, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হোক। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে ১২ তলা ভবন তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী এখানে এক বিঘা জমি দিয়েছেন।

ওসমান হারুনী

কৃষি বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখে। শ্রমবাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বিভিন্ন এনজিও, সংগঠনসহ নানা সংস্থা নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে। নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিও হয়েছে। তারা বিভিন্ন রকম আয়মূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছে। নারী এখন শুধু সুই-সুতা কিংবা হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করে না। তারা এখন হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে নানা রকম সবজি চাষের সঙ্গেও জড়িত। একেকজন ক্ষুদ্র আয় থেকে শুরু করে এখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বৃহৎ উদ্যোক্তা হওয়া আশানুরূপ নয়। বড় উদ্যোক্তা না হওয়ার অন্যতম কারণ বাজার ব্যবস্থাপনা। বাজারে তাদের অভিগম্যতা সীমিত রয়ে গেছে। তারা একটা সীমিত গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ আছেন। তারা যে আয়মূলক কাজ করেন, সেখান থেকে তাদের বের করে আনতে আরও সুযোগ দিতে হবে। গ্রামীণ নারীদের বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে তারা ভালো দাম পাবেন এবং সামনে আরও বড় কাজের দিকে এগিয়ে যাবেন। বাংলাদেশে এ প্রেক্ষাপটে নারী উদ্যোক্তাদের বাজারে অভিগম্যতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস থেকে উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রকল্পে অনেক কাজ হয়েছে। সফলতার গল্প তারা তৈরি করেছে। তার মধ্যে অন্যতম গ্রামীণ হাটবাজারে নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে আলাদা শেড তৈরি করা। নারীদের উপযোগী করে টয়লেট সুবিধা তৈরি, বেস্ট ফ্রিডিং কর্নার তৈরি করা হয়েছে। এতে নারীদের জন্য আলাদা একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নারীরা এখানে বসতে পারছেন, বিক্রি করতে পারছেন। সরকারের নীতিমালায় বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণের কথা বলা থাকলেও কমিটিগুলো পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এ প্রকল্প বাজার কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। নারীর অংশগ্রহণ যখন নিশ্চিত হয়েছে, তখন তাদের জন্য সুন্দর পরিবেশ আরও উন্মুক্ত হয়েছে। কৃষিতে জড়িত নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে গ্রুপ অথবা ক্লাস্টার করে কালেকশন পয়েন্ট কিংবা এগ্রিকালচার সেন্টার করা হয়েছে। সব নারী উদ্যোক্তা সেখানে তাদের উৎপাদিত পণ্য একসঙ্গে করে থাকেন, সেখান থেকে বিভিন্ন আড়তদার কিংবা সরবরাহকারীর সঙ্গে লিঙ্ক করে দেওয়া হয়েছে। এতে নারীরা খুবই সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। করোনাকালে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে করোনার মধ্যেও তারা নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন বাড়িয়ে আয় করতে পারছেন। এখনও তারা এটি ধরে রেখেছেন। কিন্তু এ পরিস্থিতি সব জায়গায় সমান নয়। অনেক জায়গায় বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমাদের আজকের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো জয়িতা ফাউন্ডেশনকে এখানে যুক্ত করা। জয়িতা ফাউন্ডেশনের সুযোগ আছে, তারা নারীর ক্ষমতায়নে নানা কাজ করছে। কিন্তু তারা কৃষিপণ্যকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা এখন শুধু হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করেন না। তারা কৃষিপণ্যসহ নানা রকম পণ্য উৎপাদন করছেন। জয়িতাকে এগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। তারা অনেকটা নগরের মধ্যেই আছে। গ্রামেও কীভাবে নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায়, সেভাবে চিন্তা করা উচিত। একশনএইডের কালেকশন সেন্টার থেকে পণ্যগুলো তারা নিতে পারে। জয়িতা ফাউন্ডেশন নারীদের আরও উদ্যোগী করার জন্য কাজ করতে পারে। গ্রামীণ নারীদের পণ্যগুলো তারা ছড়িয়ে দিতে পারে। আমরা নারীদের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা সহায়তা করি। বিভিন্ন পলিসি লেভেলে যদি সহায়তা করার দরকার হয়, সেখানে আমরা সহায়তা করে যাব। কৃষি এবং কৃষি উদ্যোক্তার সঙ্গে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস জড়িত আছে। আমরা সরকারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাই। তাদের বিভিন্ন কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত করতে চাই। নারীবান্ধব বাজার গড়ে তুলতে আইনগুলো আরও শক্তিশালী করতে সরকারের উদ্যোগ চাই। সারাদেশের মার্কেটগুলোতে নারীর জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শারমিন ইসলাম

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য আমরা নারী উদ্যোক্তা তৈরির কথা বলছি। কিন্তু নারী-পুরুষের মধ্যে বড় একটি অংশ বেকার আছে। বিশেষ করে যুবকদের মধ্যেও বেকারের সংখ্যা কম নয়। এখানে আমাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য উদ্যোক্তা তৈরি করা অবশ্যই দরকার। তবে করোনাকালে আরও বড় ধরনের বেকারত্ব তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যেও অনেকেই হোঁচট খেয়েছেন। একশনএইডের উদ্যোগ চমৎকার। নারীর ক্ষমতায়নের অনেক কাঠামো আছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে একশনএইড কাজ করছে। বাজারের সঙ্গে যখন আমরা নারীকে সম্পৃক্ত করি, তখনই একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। সমাজে বলা হয়, বাজারের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। কিন্তু বাজারকে নারীবান্ধব করার জন্য একশনএইড কাজ করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে নারীকে উদ্যোক্তা বানানো অনেক জরুরি। এই উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে অনেক ছোট ছোট বিষয় ভাবা খুবই জরুরি। উন্নত রাস্তা কিংবা সড়কে বাতি আছে কিনা, সেটা দেখাও জরুরি। বাজারের পাশাপাশি ই-কমার্সের দিকেও যেতে হবে। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনলাইন বিজনেস প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারলে সেটিও বেশ কার্যকর হবে। করোনাকালে ডিজিটালাইজেশন আমাদের নানাভাবে সহায়তা করেছে, পণ্য কেনাবেচা আমরা শিখেছি। প্রান্তিক নারীদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সুযোগ এখনও অনেক সীমিত। এ জায়গায় অনেক কাজ করার আছে। অনলাইন মার্কেটে অংশগ্রহণের জন্য স্মার্ট ডিভাইস গ্রামীণ নারীকে নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে কৃষক হিসেবে আমরা স্বীকৃতি দিতে চাই না। সরকারের প্রণোদনা নারীর জন্য আলাদা রাখা যেতে পারে। নারী উদ্যোক্তা শুধু তৈরি করলেই হবে না, তাদের প্রস্তুত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগিতার মার্কেটে যদি তাদের টিকে থাকতে হয়, তাহলে নতুন নতুন টেকনোলজি ও ডিভাইসের সঙ্গে চলতে হবে। এ জায়গায় আমরা গ্রামীণ নারীকে সহায়তা করছি কিনা- এটাও বিবেচ্য বিষয়।

শমী কায়সার

আমরা ই-কমার্স সেক্টরে কভিড মহামারিকালে একটা গ্রোথ দেখতে পেয়েছি। কভিড অবস্থার আগে ৩-৪ শতাংশ অনলাইন শপগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করলেও কভিড সময়ে এই হার ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। আমাদের ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনে থাকা প্রায় দেড় হাজার কোম্পানির মধ্যে এই হার এখন আরও বেড়ে প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি আছে। নারী উদ্যোক্তা হওয়ার যে মহাযজ্ঞ সৃষ্টি হয়েছে, তা ইনফরমেশন টেকনোলজির উৎকর্ষের জন্য সম্ভব হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে আমাদের এই মেরুদণ্ড তৈরি করে দেওয়ার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তথ্যপ্রযুক্তির এই উন্নতি হওয়ায় নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। বেশ কিছু নারী উদ্যোক্তাকে একসঙ্গে করে যদি একটি মার্কেটপ্লেস, লজিস্টিকস এবং ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করা যায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, নারীরা চাইলেই কৃষিপণ্য উৎপাদন করে ই-কমার্সে খুব সহজে একটি মার্কেটপ্লেস তৈরি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল এবং ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য যে প্রণোদনা দিয়েছিলেন, দুর্ভাগ্যক্রমে সেটি তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছায়নি। এসবের পাশাপাশি তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াটাও জরুরি। আমার গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এই করোনাকালে যেসব নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা টিকে গেছে, তাদের গল্পগুলো আপনারা প্রকাশের ব্যবস্থা করলে আরও ১০ জন নারী আগ্রহী হবেন উদ্যোক্তা হতে। আমি আশা করি, কৃষিক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অংশ নিতে পারবেন বলে আমি মনে করি। ই-কমার্স সেক্টরে সেলস ট্যাক্স আরোপ করা হলে নারী উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাজেটে আমরা দেখেছি, ই-কমার্স সেক্টরকে সেলস ট্যাক্সের আওতায় আনা হয়েছে। আমি এখানে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কারণ, ই-কমার্স সেক্টরে ইভ্যালি বা তাদের মতো বড় কোম্পানি আছে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ। বাকিরা ছোট ছোট উদ্যোক্তা। এই ছোট উদ্যোক্তাদেরও যদি সেলস ট্যাক্স দিতে হয়, তাহলে অনলাইনে তাদের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। তখন তারা খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারবেন না। নারী উদ্যোক্তারাই এ কারণে বেশি ভুগবেন। আমরা চাই, এই সেক্টরকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেলস ট্যাক্সের আওতার বাইরে রাখা। উদ্যোক্তাদের ভালোভাবে টিকে থাকার মতো প্রস্তুত হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

জাকির হোসেন

আমাদের সংগঠনটির বয়স মাত্র ২০ বছর। এ সময়েই আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। ২০০৪ বা ২০০৫ সালে সুপারমার্কেটে একজন ভদ্রমহিলা আমার কাছে এসেছিলেন তার নিজের হাতে তৈরি কিছু পণ্য সুপারমার্কেটে বিক্রি করবেন বলে। পচনশীল পণ্য বা মান ভালো হবে কিনা, এ বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও উনি খুব আগ্রহ করে আসায় আমি পণ্যগুলো নিলাম। প্রথম সপ্তাহে পণ্যটি নিয়ে গ্রাহকদের তেমন সাড়া না পেলেও দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পণ্যটা বিক্রি হওয়া শুরু হলো। পরে তিনি তার উৎপাদন আরও বাড়ালেন। আমি আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস থেকে আরও দু-এক জায়গায় তার ব্যবসাটি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। উনি সফল হয়েছিলেন। আমাদের সংগঠনের অনেক ভিশনের মধ্যে এভাবে নারী উদ্যোক্তাদের সমর্থন দেওয়ার ভিশনও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ঘরে বসেই করা যায়, এখানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ জায়গাটিতে এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের প্রোডাক্টকে যদি এক জায়গায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে তাদের পণ্যগুলো আমরা সুপারমার্কেটের জন্য খুব সহজে সংগ্রহ করে নিতে পারি। আমরা মনে করি, নারী উদ্যোক্তাদের মানসম্মত পণ্য সুপারমার্কেটগুলোতে এলে বাজার ধরতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। মানসম্মত পণ্য গ্রাহকরা কিনতে আগ্রহী। নারীদের এগিয়ে নিতে যারা তৎপর আছেন, আমরা আপনাদের পাশে থাকতে চাই।

নাইস আক্তার

২০১৬ সাল থেকে একশনএইডের এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের মধ্যে প্রশিক্ষণগুলো কাজে লাগিয়ে আমি অনেক উন্নতি করেছি। প্রতিবছর ১১৫ শতাংশ জমিতে পেঁপে চাষ করি। সেখানে আমার দেড় লাখ টাকা খরচ হয়, আমি বিক্রি করি ছয় লাখ টাকায়। আমি বিষমুক্ত সবজি চাষ করি। গরু ও দেড়শ দেশি মুরগি পালন করি। মুরগির ডিম সরবরাহ করি। বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একশনএইড আমাদের সংযোগ করিয়ে দিয়েছে। ফলে আমরা বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা পেয়ে যাচ্ছি। আমরা অনলাইনেও ব্যবসা করছি। অনলাইন ছাড়া ঢাকায় আগোরাসহ বিভিন্ন সুপারস্টোরে পণ্য পাঠাচ্ছি। মার্কেট বাংলা ডটকমে শুকনো খাবার সরবরাহ করি। বাজার পরিচালনা কমিটিতেও আমরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছি। এটা আগে ছিল না। একশনএইডের প্রকল্পের কারণে আমরা এ সাফল্য অর্জন করেছি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গরুর জন্য প্রণোদনা পেয়েছি। একশনএইডের কারণে আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রশিক্ষণ পাচ্ছি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আমাদের সংযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কৃষিঋণ পেয়েছি। কৃষি অফিস থেকে বিভিন্ন সেবা পেয়ে থাকি। গাবতলী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ১৪টি কালেকশন পয়েন্ট রয়েছে। ছয়টি মার্কেট শেড রয়েছে। মার্কেট শেডগুলোতে নিয়মিত নারীরা বসছেন। আঞ্চলিক বাজারগুলোতেও আমরা নিয়মিত পণ্য দিয়ে যাচ্ছি। একশনএইডের মতো সরকার যদি নারী উদ্যোক্তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে আরও মার্কেট শেড নির্মাণ করে, তাহলে নারী উদ্যোক্তারা সেখানে গিয়ে বসতে পারবেন। তারা নিয়মিত ব্যবসা করতে পারবেন। কৃষিঋণ বিতরণে নারীরা হয়রানির শিকার হয়। ঋণ নিতে গেলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলে, জমির দলিল দিতে হবে। সাধারণত সব নারীর জমি থাকে না, ফলে জমির দলিল দিতে পারে না। এ জন্য তাদের হয়রানি করা হয় এবং ঋণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। নারীদের যেন সরকার আইনি সহায়তা দেয়। নারী উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। একশনএইডের মতো সারাদেশে সরকারের যেন প্রকল্প থাকে, তাহলে গ্রামীণ অবহেলিত নারীরা উদ্যোক্তা হয়ে উঠবেন। আমার মতো যেন শত শত নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়। তাদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে সরকার যেন সহায়তা করে। তাহলে নারীরা আর অসহায় থাকবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। এভাবে সারাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধ হবে। একশনএইড আমাদের জন্য যে কাজ করে গেছে, এটা আমাদের বড় পাওয়া। আমরা আগে ঘরের কোণে ছিলাম। কথা বলতে পারতাম না। আমাদের চলার গতি যেন থেমে না যায়। একশনএইড তো আমাদের সঙ্গে সারাজীবন থাকবে না, সরকার যেন আমাদের পথচলা সচল রাখে।

দিলরুবা হায়দার

নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও জড়িত। এ মুহূর্তেও আমরা একটা বড় দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। করোনাকালে অনেক মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। গ্রামে অনেক মানুষ কৃষিকাজ করে জীবন ধারণ করছেন। এ সময়ে কৃষির সঙ্গে অনেক মানুষ যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে একশনএইডের কাজ বেশ আশাজাগানিয়া। বন্যাদুর্গত এলাকায় নারী কৃষক তৈরি ও উদ্যোক্তা বানানো খুবই কঠিন। খুলনা অঞ্চলে নারীরা লবণাক্ততার কারণে সেভাবে কাজ করতে পারছেন না, এ জায়গায় আমাদের কাজ করার আছে। ইউএন উইমেন থেকে পাঁচ বছর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলাম। সেখানে আমাদের ছোট ছোট সহায়তায় অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন। গ্রামীণ নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আছে, একটু সহায়তা করলে তারা এগিয়ে যেতে পারে। ডিজিটাল মার্কেটে বিশাল সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এখানে আমরা গ্রামীণ নারীদের সেভাবে যুক্ত করতে পারিনি। ইন্টারনেট কানেকশন এখন বাংলাদেশের কোনায় কোনায় পৌঁছে গেছে। নারীরা এই সুযোগ নিতে পারে।

মেহজাবিন আহমেদ

আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, বাজেট ও স্থানীয় সরকার নিয়ে কাজ করছি। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের নামে জমির কাগজপত্র না থাকায় ঋণ মেলে না। কৃষিক্ষেত্রে নারীরা বিশাল অবদান রাখার পরও তাদের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নেই। একশনএইড নারীদের জন্য বাজার নিয়ে কাজ করছে, এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা বাজারবিষয়ক তথ্যও অনেক সময় পান না। মার্কেট চেইনের সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের সংযোগ কম। টেকনোলজির ব্যবহারও তারা তেমন করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ভালো কাজ করতে পারে।



সঞ্চালক
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
দৈনিক সমকাল

প্রধান অতিথি
আফরোজা খান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
জয়িতা ফাউন্ডেশন

সভাপতি
ফারাহ কবির
কান্ট্রি ডিরেক্টর
একশনএইড বাংলাদেশ

স্বাগত বক্তব্য
ড. শওকত আকবর ফকির
প্রকল্প সমন্বয়কারী
মেকিং মার্কেট ওয়ার্ক ফর উইমেন (এমএমডব্লিউডব্লিউ) প্রকল্প
একশনএইড বাংলাদেশ

আলোচকবৃন্দ
আব্দুর রউফ
অতিরিক্ত সচিব ও জয়িতা ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পরিচালক (সিবিডিপিজেএফ)

ওসমান হারুনী
সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার
(খাদ্য ও পুষ্টি)
নেদারল্যান্ডস দূতাবাস

শারমিন ইসলাম
জেন্ডার অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি

শমী কায়সার
চেয়ারম্যান, ই-ক্যাব

জাকির হোসেন
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ সুপারশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন

নাইস আক্তার
এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের উপকারভোগী ও নারী কৃষি উদ্যোক্তা
গাবতলী, বগুড়া

দিলরুবা হায়দার
প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট
ইউএন উইমেন বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস

মেহজাবিন আহমেদ
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর
ইউএন উইমেন বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস

অনুলিখন
জাহিদুর রহমান ও তন্ময় মোদক
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com