'জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত অবদান সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার'

প্রকৃতি বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে

প্রকাশ: ২৮ জুন ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বর্তমান অতিমারি। অথচ মানুষের প্রকৃতি বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডের ফলে জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। পরিবেশকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন হবে, উন্নয়নকে কেন্দ্র করে পরিবেশ সাজানো যাবে না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতেই হবে। এটি আমাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। উন্নয়নকে টেকসই করতে যথাযথ প্রক্রিয়া, যেমন- পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, জনমত গ্রহণ, পর্যালোচনা এসব নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব বিষয়ে আইন কঠোরভাবে মানতে হবে। গত ২২ মে 'জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশগত অবদান সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার' শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে মিডিয়া সহযোগী ছিল দৈনিক সমকাল।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

পরিবেশকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন হবে, উন্নয়নকে কেন্দ্র করে পরিবেশ সাজানো যাবে না। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতেই হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। এটি আমাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। বর্তমানে উন্নয়নের যে ধারা- তা ধ্বংসাত্মক, মানুষ ও প্রকৃতিবিরোধী। একটি ক্ষুদ্র লতা থেকে আবিস্কৃত হতে পারে অনেক জটিল রোগের নিরাময়; তাই প্রাণ, উদ্ভিদ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস করে আবাসন, শিল্পায়ন করার প্রক্রিয়া রোধ করতে হবে। উন্নয়নকে টেকসই করতে যথাযথ প্রক্রিয়া, যেমন- পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, জনমত গ্রহণ, পর্যালোচনা এসব নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব বিষয়ে আইন কঠোরভাবে মানতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারব না। যা আমরা সৃষ্টি করতে পারি না, অর্থনীতির নামে তা ধ্বংসের কোনো অধিকার আমাদের নেই।


সাবের হোসেন চৌধুরী

বাংলাদেশে আমরা যতই হতাশার কথা বলি, এখানে আশার আলোও আছে। আজকের আলোচনায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশ কিছু ভালো বক্তব্য এসেছে। আমরা অনেক সুপারিশ পেলাম। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে অনেক সুপারিশ এসেছে। কৃষি আইন ও নগরায়ণ নিয়ে অনেক আইন আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় আইন হলো সংবিধান। জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট বলা আছে। তার পরও আমরা প্রাণ-প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিচ্ছি না। আইন বাস্তবায়নে এখনও রোডম্যাপ হয়নি। পরিবেশ রক্ষায় সংবিধানের ধারাসহ যে সুযোগগুলো আছে, সে অনুযায়ী রোডম্যাপ করে বাস্তবায়নে যেতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বলা হলেও বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে যারা দূষণ করে, তাদের থামানো যাচ্ছে না। সাংঘর্ষিক জায়গাগুলো কোথায় এবং আইন থাকা সত্ত্বেও কেন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না- এসব দুর্বলতা একে একে ঠিক করা দরকার। প্রকৃতির বিষয়ে কোন কোন জায়গায় নীতি এবং আইনে শূন্যতা আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।

ড. ফাহমিদা খাতুন

প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখতে হবে। এগুলো কারা ব্যবহার করবে, সেটাও নীতিমালার অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় হচ্ছে নীতিমালার ব্যর্থতা ও বাজারের ব্যর্থতার কারণে। প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য না থাকলে এগুলো সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্পদই মূল্যবান। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের একটি মূল্য থাকা দরকার। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ বিষয়ে নীতিমালা করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নীতিমালা ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।


রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

এবার জীববৈচিত্র্য দিবসের প্রতিপাদ্য 'আমরাও সমাধানের অংশ'। বর্তমান অতিমারিকাল আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কত ঘনিষ্ঠ। সেই প্রেক্ষিত ধরে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিকভাবে আন্তঃসরকার প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ বিজ্ঞান ও নীতির সম্মেলন ঘটিয়ে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নীতি হতে হবে বিজ্ঞান ও তথ্যভিত্তিক, সে রকম আলোক থেকে এ উদ্যোগ। এই উদ্যোগ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু হয়েছে। তারপর জাতিসংঘ একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্বের সব দেশ থেকে চেষ্টা করা হয়েছে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জড়ো করে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সেবা নিয়ে গবেষণা করার। কী রকম নীতি গ্রহণ করা দরকার, তার নির্দেশনা বড় আলোকে দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত করে সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার। বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি গ্রহণ করে পৃথিবীর বড় বিপর্যয় থেকে নিজেদের উদ্ধার করে অগ্রযাত্রা চালিয়ে যেতে হবে। বাস্তুসংস্থানের দরকার। জৈবিক দিক আছে। সেখানে উৎপাদক আছে, ভোক্তা আছে এবং পচনকারী আছে। অন্যদিকে অজৈবিক বা ভৌত বাস্তুসংস্থান হলো- পানি, বাতাস, ভূমি, সূর্য, খনিজ পদার্থ। এ দুটি সম্পর্ক যদি ভেঙে যায়, তাহলে এ পৃথিবী টিকে থাকা দুরূহ হয়ে যায়। আরেকটি যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা। নতুন গাছ লাগানো ও প্রাকৃতিক বনায়ন ধরে রাখতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিন লাখ ৩১ হাজার সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬১৪ একর দখল হয়ে গেছে। আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে জলজ ও ভেষজ এলাকা বাড়ানো দরকার। কিন্তু ২৪ হাজার নদী বা ৩৭৩টি জলাভূমির মধ্যে সব জায়গায় সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। মাছের উৎপাদন প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। দখল হয়েছে ৭৭০টি নদীর প্রায় ৫৭ হাজার একর। বাঁধ দেওয়ায় তৈরি হচ্ছে বড় পলির স্তর। ফলে সুন্দরবনের মতো জায়গায় আগুন ধরছে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরে সবুজের বিস্তার কমতে কমতে এখন ৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। ফলে সবুজ এলাকা নির্ধারণ করা দরকার। আমাদের বড় সম্পদ হচ্ছে সাগর এবং উপকূল। বঙ্গোপসাগরকে একটি সবুজ ও শান্তিময় সাগর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। একই সঙ্গে কৃষিকে টেকসই করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার না করায় বড় রকমের ভূমির ক্ষয় হচ্ছে। লোকায়ত প্রজাতি অনেক হারিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পাহাড় ধ্বংস হচ্ছে। সবক'টিতে আবার এক রকম আশার ব্যাপারও আছে। জনসম্পৃক্ত করে সহব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগুলোকে লালন করলে ভালো ফল দিচ্ছে। ইলিশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটা আমরা দেখছি। পরিসংখ্যান ব্যবস্থারও যথেষ্ট উন্নয়ন দরকার। সব জায়গা থেকে একটা সুর আসছে, সবুজ উৎপাদন হতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে নতুন চিন্তা করা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো দেশে ৩০ শতাংশ বন ও সবুজের আবরণ দরকার। আমরা অনেক সামনে এগিয়ে গেছি। এখন আমাদের চিন্তা আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে হতে হবে এবং নিজস্ব চিন্তা থাকতে হবে। বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বিজ্ঞানীদের তথ্য দরকার, বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সংযুক্ত করতে হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের সরকারকে এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। আবার রূপসী বাংলার দিকে যেতে চাই। আলোচনার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি করতে চাই, যে জ্ঞান জনগণের কল্যাণে পালিত হবে।

অধ্যাপক ইসরাত ইসলাম

জীববৈচিত্র্যের জন্য যে নিয়ামক থাকা দরকার, তার মধ্যে অন্যতম জলাভূমি। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। নগরভূমি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুষম বণ্টন হচ্ছে না। মানুষ বড় শহরে ভিড় করছে। এই শহরগুলোতে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। জলাভূমি হুমকির মুখে পড়েছে। চট্টগ্রামে পাহাড় হুমকিতে। জলাভূমি রক্ষায় আইন হলেও বাস্তবায়ন নেই। আবাসনের নামে নির্বিচারে জলাভূমি নষ্ট করা হচ্ছে। অনেক ফান্ড আছে, সেই ফান্ড জলাভূমি রক্ষায় ব্যবহার হচ্ছে না। জলাভূমি রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হওয়া উচিত। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে সবার ভূমিকা রাখতে হবে।


অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী

পৃথিবীর অধিকাংশ সাগর-মহাসাগরে অক্সিজেনশূন্য জোন তৈরি হতে পারে, যা সাম্প্রতিক সময়ের আবিস্কার। জ্বালানি তেল, পোড়া তেল, গ্যাস ও কয়লা জ্বালানোর কারণে এসব জ্বালানির বর্জ্য এবং জমিতে ফল-ফসল ক্ষেত-খামারে অনিয়ন্ত্রিত হারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে সেগুলোর অবশেষটুকু খাল-বিল, নদ-নদী হয়ে সাগরে গিয়ে মিশছে। এই নাইট্রাস অক্সাইড সাগরতলকে করে তুলছে অক্সিজেনশূন্য। শুধু সাগর নয়, বনও ধ্বংস করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সব ম্যানগ্রোভ বন কেটে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।


ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

করোনার মধ্যেও বন ধ্বংসের পরিমাণ কমেনি। সবচেয়ে বেশি বন ধ্বংসের স্থান হলো চট্টগ্রাম। ধ্বংসের মধ্যেও যা কিছু টিকে আছে, সেটিও আমাদের অনেকে জানেন না। বন নষ্ট করা যাবে না। বন মানুষের জন্য নয়, এটি বন্যপ্রাণীর জন্য। চট্টগ্রামে ৬৮ হেক্টরের একটি বনে ১১৩ প্রজাতির গাছপালা পেয়েছি। উন্নয়ন করলেও বন্যপ্রাণীর যেন কোনো ক্ষতি না হয়।




আমীর মো. জাহিদ

বর্জ্য মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোথায় কোন জায়গার মাটি দূষণ হচ্ছে, তা বের করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার, জনসাধারণকে সচেতন করে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো, নীতিমালা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে জীববৈচিত্র্য ভালো থাকবে না।




পাভেল পার্থ

কৃষিজমির সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে 'কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন, ২০১৫' চূড়ান্ত করতে হবে। দেশের সব কৃষি প্রতিবেশ, হাইড্রোলজিক্যাল রিজিয়ন ও বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট এরিয়ার বাস্তুসংস্থান ও বৈচিত্র্য সুরক্ষায় স্থানীয় বা আঞ্চলিক গবেষণা ও সুরক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য দলিল গড়ে তুলতে হবে। লোকায়ত জ্ঞান, স্থানীয় সংরক্ষণ পদ্ধতি, জনগোষ্ঠীভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগ এবং দেশীয় জাত বা প্রজাতি বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় কৃষিনীতিতে জীববৈচিত্র্য আইনের বিশ্নেষণ যুক্ত করতে হবে। জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য নীতি গ্রহণ করতে হবে। জীববৈচিত্র্য আইন, ২০১৭ অনুযায়ী জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞায় অবশ্যই মানুষকে যুক্ত করতে হবে। কারণ, মানুষও প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যের অংশ। মানুষকেন্দ্রিক একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে এসে বায়োসেন্ট্রিক বা ইকোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি।

রাকিবুল আমিন

আইপিবিইএস একটি স্বাধীন আন্তঃসরকারি সংস্থা, ১৩০টির বেশি দেশের সরকার যার সদস্য। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইপিবিইএস পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য, বাস্তুসংস্থান ও মানুষের জীবনে প্রকৃতির অবদানবিষয়ক বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন নীতিনির্ধারকদের কাছে সরবরাহ করে। এর পাশাপাশি এই সংস্থা প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো রক্ষা, টেকসই ব্যবহারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও বিকল্পগুলো তুলে ধরে।

আন্তঃসরকার বিজ্ঞাননীতি প্ল্যাটফর্ম কার্যক্রমের বৈশ্বিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরছি। ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার (২০০৫ সালে সহস্রাব্দ বাস্তুসংস্থান মূল্যায়ন প্রকাশের পর) এ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ একটি মূল্যায়ন হাজির করেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃতির অবস্থা ও ধারা এবং এর ওপর সামাজিক প্রভাব, এগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ এবং সবার জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিষয়ে এই প্রথম কোনো আন্তঃসরকারি সংস্থা এমন মূল্যায়ন প্রকাশ করল। এই জটিল যোগসূত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে খুব সাধারণভাবে; তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকাঠামোর মাধ্যমে, যা বৃহত্তর পরিসরে অংশীজনের অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন সম্ভব। সহস্রাব্দ বাস্তুসংস্থান মূল্যায়নের মতে, বাস্তুসংস্থান থেকে মানুষ যেসব উপকার পেয়ে থাকে, তাদের বাস্তুতন্ত্র পরিষেবা বলে। বাস্তুতন্ত্রের পরিষেবাগুলোকে চার ধরনে ভাগ করা সম্ভব- নিয়ন্ত্রণ, বিধান, সাংস্কৃতিক এবং সমর্থন। ওইসিডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২০১৯) উল্লেখ আছে যে, বাস্তুতন্ত্র প্রতিবছর ১২৫-১৪০ ট্রিলিয়ন পরিষেবা প্রদান করে, যা বিশ্বের মোট জিডিপির ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি। মানুষের জন্য প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা একত্রে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের কার্যাদি এবং এর পরিষেবাগুলোর বিশ্বব্যাপী অবনতি ঘটছে। গত ৫০ বছরে পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কারণগুলো ত্বরান্বিত হয়েছে। গত ৫০ বছরে প্রকৃতিতে বিশ্বব্যাপী যে হারে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে, তা মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে প্রকৃতির সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার এবং স্থায়িত্ব অর্জনের লক্ষ্য অর্জিত হবে না এবং ২০৩০ সাল ও তার পরবর্তী লক্ষ্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব। আমূল পরিবর্তনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অন্যান্য বৈশ্বিক সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি প্রকৃতিকে টেকসইভাবে সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও ব্যবহার সম্ভব।

মানবজাতির টিকে থাকতে প্রকৃতির কোনো বিকল্প নেই। মানুষের জীবনে প্রকৃতির বেশিরভাগ অবদান পুরোপুরি পূরণীয় নয়, কিছু তো একেবারেই অপূরণীয়। যথা- সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান বছরে মোট ৫ দশমিক ৬ গিগাটন কার্বন শোষণ করে। প্রকৃতির অবদান কখনও স্থান ও কালভেদে এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসমভাবে বণ্টিত হয়। ১৯৭০ সালের পর থেকে কৃষিজ উৎপাদন, মাছ চাষ, উৎপাদন ও অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন বাড়লেও প্রকৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্র নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক অঞ্চলেই মনুষ্যজনিত একাধিক কারণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। স্থলভাগের ৭৫ শতাংশ ও সমুদ্রের শতাংশ এলাকা মনুষ্যজনিত কারণে পরিবর্তন এবং জলাভূমির ৮৫ শতাংশ এলাকার বেশি হারিয়ে গেছে। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে এখন বহুসংখ্যক প্রজাতি বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে লোকালয়ে আবাদ করা স্থানীয় পর্যায়ের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য ও বংশবিস্তার ক্রমেই কমছে। ২০১৬ সাল থেকে কৃষির জন্য ব্যবহূত গৃহপালিত ছয় হাজার ১৯০ স্তন্যপায়ী প্রাণীর ৫৫৯টি প্রজাতি (৯ শতাংশের বেশি) বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরও এক হাজার প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বজুড়েই স্থানীয় পর্যায়ে ও এর বাইরে বংশগতভাবে সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিগুলো ক্রমে মানুষের হস্তক্ষেপে বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই একই রকম হয়ে উঠছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে নষ্ট করছে।

ওয়েবিনারে পরিবেশবিদ, শিক্ষক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিকসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন। তারাও তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। নিচে সেই মতামতগুলো তুলে ধরা হলো-

ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রকল্প জমা দিলেও এখনও অনুমোদন পাওয়া পায়নি। অথচ সৈকতের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য এ প্রকল্পগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মেজহাব উদ্দিন মান্নু, কুয়াকাটা

কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল রক্ষায় এখনই উদ্যোগ না নেওয়া হলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে।

সুদীপ্ত চাকমা

সমতল অঞ্চলের প্রযুক্তি পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োগের কারণে এবং পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ের প্রযুক্তি প্রয়োগ না করার কারণে মাটিক্ষয় ও ভূমিধস হচ্ছে। সমতল অঞ্চল থেকে আসা লোকজনের পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে অজ্ঞতার ও গাছ কেটে বসতি স্থাপন করার কারণে সমস্যা হচ্ছে। সমতল অঞ্চল থেকে আসা লোকজন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মাচাং ঘর না করে মাটি কেটে ঘর তৈরি করছে। তাতেও মাটিক্ষয় ও ভূমিধস হচ্ছে। দেশের একমাত্র কুমারী বন সাঙ্গু-মাতামুহুরী উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

মো. এনামুল হক

যমুনা নদীর চরাঞ্চলে কৃষি কার্যক্রম করতে গিয়ে নদীর জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। খাল, বিল, ছড়ার পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদের সফট পয়েন্টে বালু ভরাট করে নদের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে।

নুরুল মোহাইমিন

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় প্রভাবশালীদের বন দখল, বৃক্ষ নিধন, বনের ভেতর দিয়ে রেল-সড়ক পথ ও বৈদ্যুতিক লাইন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, চাষাবাদ, অত্যধিক পর্যটকসহ নানা কার্যক্রমে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। সিলেটের চা বাগানগুলোতে অত্যধিক পরিমাণে বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে এগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড় ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে। এসব কার্যক্রম জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ।

আমিন হামজা জিহাদ

বনের গাছ কেটে ধ্বংস করার চেয়ে বেশিই ক্ষতি হচ্ছে বিদেশি জাতের গাছ লাগানোর কারণে। ইটভাটায় শুধু টাকার জন্য কৃষকরা মাটি বিক্রি করছেন না, ইটাভাটার মালিকরা একটি কাঠামোর মধ্যে কৃষকদের ফেলে দিচ্ছেন। ফলে জমির মালিকের তার জমি বিক্রি কিংবা ভাড়া দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

মঞ্জু রানী প্রামাণিক

জাতীয় বাজেটে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।

এস এম মিজানুর রহমান

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, চাটমোহর, পাবনা

জলজসম্পদের ওপর সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় বিল এলাকায় কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে 'গণশুনানি' এবং 'পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ' বাধ্যতামূলক করা দরকার। চলনবিলের পাখি, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকরী কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। পদ্মা ও যমুনার সঙ্গে চলনবিলকেও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনা উচিত। সর্বোপরি চলনবিলকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে 'চলনবিল কর্তৃপক্ষ' গঠন করে এই বিল সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। চলনবিলকে 'পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণা করে তা সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুপারিশ করছি।

সাইফুল ইসলাম

চলনবিলের সরকারি জলাভূমিগুলো প্রভাবশালীদের দখলে। বিলের মৎস্য অভয়াশ্রমগুলো অরক্ষিত। চলনবিলে প্রশাসনের নাকের ডগায় কৃষিজমিতে পুকুর খননের উৎসব চলছে। ফলে বিল তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে, হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা

জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বন, পাহাড়, জলাভূমি রক্ষা করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য জলাশয়, বনাঞ্চল ও টিলাভূমিকেই নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ (বালু, পাথর) আহরণের কারণে বন, জলাভূমি, পাহাড় ধ্বংস হচ্ছে। উন্নয়ন পরিকল্পনা বা বালু-পাথরমহালের তালিকা থেকে এসব জায়গা বাদ দিতে হবে। তা না হলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যাবে না।

আলিউর রহমান

চট্টগ্রাম বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন দ্রুত কমে আসছে। সরকারিভাবে যে বনাঞ্চলের কথা বলা হয়, বাস্তবে তা নেই।


ইউজিন নকরেক

মধুপুর শালবনে টেলকী নামক স্থানে ১৯৭৭-৭৮ সালে প্রাকৃতিক শালবনের পাঁচশ একর জমির প্রাকৃতিক শালগাছসহ প্রায় হাজার প্রজাতির গাছ কেটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ স্থাপন করা হয়। এতে গত পাঁচ দশক ওই বনে শব্দদূষণের কারণে ব্যাপক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০১৯ সালে সুফল প্রকল্পের আওতায় মধুপুর প্রাকৃতিক বনের মধ্যে বিভিন্ন গাছ কেটে পুনরায় বনায়ন করা হচ্ছে, যেটি একটি ভুল পদক্ষেপ। এতে মধুপুরের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন হুমকির মুখে পড়েছে।

সঞ্চালক

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
প্রধান নির্বাহী
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)

প্রধান অতিথি

সাবের হোসেন চৌধুরী
সভাপতি
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

আলোচক

ড. ফাহমিদা খাতুন
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর
জোট আইইউসিএন বাংলাদেশের
জাতীয় কমিটির সভাপতি

ইসরাত ইসলাম
অধ্যাপক, আরবান অ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

সাইদুর রহমান চৌধুরী
অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
সাবেক নির্বাহী পরিচালক
অরণ্য ফাউন্ডেশন

আমীর মো. জাহিদ
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট

পাভেল পার্থ
পরিচালক
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক

রাকিবুল আমিন
বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি
আইইউসিএন

অনুলিখন

জাহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com