কয়রায় পাউবোর দুই প্রকল্পের অস্তিত্ব নেই

সাড়ে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ

০৭ জুন ২০২০

শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা)

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আগে কয়রা উপজেলার ঘাটাখালী ও হরিণখোলা এলাকায় পাউবোর প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করে। বর্তমানে এর অস্তিত্ব নেই- সমকাল

খুলনার কয়রা উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুটি পোল্ডারে বাঁধ মেরামতের জন্য বাস্তবায়িত ও চলমান প্রকল্পের সাড়ে ৯ কোটি টাকার কাজের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্নিষ্টদের দাবি, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাঁধের বেশিরভাগ স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বাঁধ মেরামত সংশ্নিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মান ভালো না হওয়ায় যে কোনো ছোটখাটো দুর্যোগে কাজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

পাউবো সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে কয়রা উপজেলার ১৩-১৪/২ এবং ১৪/১ পোল্ডারে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ছয় কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত দেখানো হয়েছে এসব প্রকল্পের আওতায়। এর মধ্যে বেশিরভাগই দরপত্র ছাড়া ডিপিএম (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পদ্ধতিতে পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। এ কারণে কাজের মানের চেয়ে বরাদ্দ আত্মসাতের হিসাব কষেছেন জড়িতরা। ফলে যে কোনো ছোটখাটো দুর্যোগ এলেই দৃশ্যমান কাজের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন অভিযোগ স্থানীয় মানুষের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে পাউবোর ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারে উপজেলার দশহালিয়া, গোবিন্দপুর ও হোগলা এলাকায় পাঁচটি প্যাকেজে এক কিলোমিটার বাঁধ মেরামত দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি কাজ দরপত্রের মাধ্যমে করা হয়। বাকি চারটি ডিপিএম পদ্ধতিতে করা হয়েছে। প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দের এ পাঁচটি প্রকল্পের বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। দুর্যোগের কারণে মেরামত কাজের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে দাবি করে এ পোল্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিম মিয়া জানিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দের টাকা দেওয়া হয়নি।

উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে পাউবোর ১৪/১ নম্বর পোল্ডারে ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যের মেরামত কাজ দরপত্রের মাধ্যমে মো. মুনসুর আলী নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পায়। কাজটির চুক্তি মূল্য ছিল ৭০ লাখ টাকা। ওই কাজটি মোজাফফর আলী নামে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষ হলেও মাত্র ২৫ ভাগ কাজ শেষ করেন তিনি। বর্তমানে সেটুকুরও অস্তিত্ব নেই। জানতে চাইলে ইউপি সদস্য মোজাফফর আলী বলেন, 'সত্তর শতাংশ কাজ শেষ করার পর আম্পানে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন কাজে বিনিয়োগের টাকা ফিরে পাওয়া নিয়ে চিন্তায় আছি।'

ওই কাজের ঠিকাদার মুনসুর আলী সাতক্ষীরার বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'ঘূর্ণিঝড়ে নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় মাটির কাজ ধুয়ে গেছে। জিও ব্যাগ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। মোজাফফর মেম্বরকে বলেছি আবার নতুন করে কাজ করে দিতে।'

এ ছাড়া ডিপিএম পদ্ধতিতে কয়রা সদর ইউনিয়নের ঘাটাখালী ও হরিণখোলা এলাকায় ২৪ ও ২২ লাখ টাকা বরাদ্দে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। সোনালী এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্প দুটি রিয়াছাদ ও খলিল নামে স্থানীয় দুই শ্রমিক সরদার বাস্তবায়ন করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজ হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ওই স্থান দুটি ভেঙে যায়। এতে কয়রা উপজেলা সদরসহ ১৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। একই পদ্ধতিতে উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাজীপাড়া এলাকায় ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দে ৩০০ মিটার বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। ওই প্রকল্পটিও সোনালী এন্টারপ্রাইজের নামে দেখিয়ে শ্রমিক সরদার খলিলকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সোনালী এন্টারপ্রাইজের মালিক এইচ এম শাহাবুদ্দীন কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, 'অনেক সময় পাউবো কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তাদের পছন্দের লোক দিয়ে কাজ করিয়ে নেন। সেভাবেই হয়তো আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।'

ওই পোল্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি অস্বীকার করে বলেন, 'ডিপিএমের আওতায় ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ায় বরাদ্দ আটকে দেওয়া হয়েছে।'

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) নাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে চলমান এবং বাস্তবায়িত প্রকল্পের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে এ মুহূর্তে মেরামত কাজের অস্তিত্ব নেই। এসব প্রকল্পের বরাদ্দ প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।'

পাউবোর আমাদি উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে কয়রা উপজেলায় পাউবোর ১২১ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৩০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে ২১টি স্থানে। এর মধ্যে স্থানীয় মানুষ ১৪টি স্থানে অস্থায়ীভাবে রিংবাঁধ দিয়ে নদীর পানি প্রবেশ বন্ধ করেছে। সাতটি স্থান দিয়ে নদীর পানি ওঠা-নামা চলছে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)