করোনায় ডায়াবেটিস রোগী কী করবেন

০৬ জুন ২০২০

ডা. এ হাসনাত শাহীন

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। প্রাণঘাতী এই রোগের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছেই। সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতোই এ রোগে আক্রান্ত হলে জ্বর, শুকনো কাশি, গায়ে ব্যথা দিয়ে শুরু হয়। তবে কিছু সংখ্যক আক্রান্তের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক হয়। ১৫ শতাংশ মারাত্মক হতে পারে। আর ৫ শতাংশ আক্রান্তের সংকটপূর্ণ অবস্থ্থা হতে পারে, যেখানে ভেন্টিলেটর প্রয়োজন। সাধারণত অধিক বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ অথবা অন্য রোগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, হাঁপানি বা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস রোগীদের ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দৈনন্দিন জীবনপ্রণালি ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং কায়িক শ্রমের অভাব এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও প্রচুর ডায়াবেটিস রোগী রয়েছেন। এসব ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে অনেকে বয়স্ক। তাছাড়া বেশিরভাগ ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই। সাধারণত বেশিরভাগ ডায়াবেটিস আক্রান্তের মধ্যেই বিশেষ করে যাদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস তাদের উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ প্রভৃতি থাকে। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই কম থাকে। আবার অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে যে কোনো সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তাই করোনা সংক্রমণের এই সময়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের অধিক সতর্কতা জরুরি। করোনার বৈশ্বিক মহামারিতে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা

অবশ্যই রক্তের শর্করার মাত্রা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা নির্ধারণ করে নিন। কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আগের ওষুধ বা ইনসুলিন বাদ দেবেন না অথবা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কমবেশি করবেন না।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা

ডায়াবেটিসে আপনার নির্দেশিত খাদ্য তালিকা অনুসরণ করুন। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান। খাবারের তালিকায় রাখুন প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল। আর পান করুন পর্যাপ্ত পানি। কোনো অবস্থাতেই চিনি, গুড় বা এগুলো দিয়ে তৈরি খাবার বা পানীয় গ্রহণ করবেন না।

হাঁটা বা ব্যায়াম

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া একেবারেই বাইরে বের হবেন না। হাঁটা বা ব্যায়ামের জন্য রাস্তা বা পার্কে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়ির আঙিনা বা ছাদে হাঁটুন। জায়গা না থাকলে ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন।

ডায়াবেটিস পরীক্ষা

অবশ্যই নিয়মিত বাসায় সপ্তাহে দু-তিনবার রক্তে শর্করার মাত্রা গ্লুকোমিটারের সাহায্যে পরিমাপ করুন। রক্তে শর্করার তারতম্য হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

রুটিন ফলোআপ

করোনার এই মহামারিকালে আপনার রুটিন ফলোআপে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকের সঙ্গে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শ গ্রহণ করুন। সব হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

সাধারণ পরামর্শ

১. বাজার, শপিংমল, জনবহুল স্থান যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

২. একান্ত প্রয়োজনে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পরিধান করুন। বাইরে থেকে ফিরে যে কোনো বস্তু স্পর্শ করার আগে ভালো করে হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। বাইরে পরে যাওয়া জামা-কাপড় দ্রুত বদলে সেগুলো যথাসম্ভব তাৎক্ষণিক সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৩. হাত মেলানো, কোলাকুলি, বাচ্চাদের চুমু দিয়ে আদর করা থেকে বিরত থাকুন।

৪. ঘরে অবস্থানকালে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলুন। অযথা নাকে-মুখে ও চোখে হাত দেবেন না। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় হাতের কনুইয়ের ভাঁজে বা টিস্যু দিয়ে নাক-মুখ ঢাকুন। ব্যবহূত টিস্যু দ্রুত বদ্ধ বিনে ফেলুন।

৫. টয়লেট ব্যবহারের পর, হাঁচি-কাশির পর, খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে, খাওয়ার আগে, প্রাণী বা প্রাণী বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে অবশ্যই সাবান ও পরিস্কার পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে।

৬. দুশ্চিন্তামুক্ত থাকুন। ধূমপান ত্যাগ করুন।

৭. আপনার প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনসুলিন যথাযথভাবে মজুদ রাখুন। তবে অতিরিক্ত উদগ্রীব হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ওষুধ বা ইনসুলিন কিনে ফেলার দরকার নেই। বাজারে এগুলোর কোনো ঘাটতি নেই।

৮. সতর্কতার পরেও করোনা সংক্রমণের লক্ষণ যেমন সর্দি, জ্বর, কাশি, গলাব্যথা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে সরকার নির্দেশিত করোনা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে দ্রুত যোগাযোগ করুন। তা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা টেলিমেডিসিন সেবা চালু করেছে। প্রয়োজনে তাদের পরামর্শ নিন।

৯. নিজের বা পরিবারের অন্য কারও করোনা সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেলে ডায়াবেটিস রোগীকে আলাদা থাকতে হবে।

করোনার প্রতিষেধক ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি না থাকায় প্রতিরোধের মাধ্যমে সচেতন হওয়াই এখন পর্যন্ত কার্যকর উপায়। তাই বাসায় থাকুন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলুন; সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। া

[কনসালট্যান্ট, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিভাগ, ইমপাল্‌স হাসপাতাল, তেজগাঁও, ঢাকা]

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)