পর্যটন দুঃসময় পেরোনোর স্বপ্ন

০৬ জুন ২০২০

গোলাম কিবরিয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশে। রয়েছে সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় বান্দরবানের অপরূপ পাহাড় ঘুরে। পুরো পার্বত্য অঞ্চলই যেন অঘোষিত পর্যটনকেন্দ্র। আছে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, কৃষি, মৎস্য শিকার, আদিবাসী সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা ঘিরে পর্যটনের আলাদা সম্ভাবনা। এক কথায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনায় ভরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে অন্য সবকিছুর মতোই দেশের পর্যটনের টালমাটাল অবস্থা। পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ থাকায় প্রকৃতি আপন রূপে ফিরে এলেও এ খাত সংশ্নিষ্ট বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সময়টা যে ভালো যাচ্ছে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

করোনাকালের দিনকাল নিয়ে ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এবং ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা খবির উদ্দিন আহমেদ জানান, করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিস্কার না হওয়ায় বিশ্বব্যাপী মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অবস্থা আগামী কয়েক বছর চলবে হয়তো। এর মধ্যেই আমাদের বাঁচতে হবে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ রিসোর্টই কিন্তু গ্রামাঞ্চলে তথা শহরের বাইরে অবস্থিত। এখানে মানুষ প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারে, পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকিও কম। সর্বোপরি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আগামী দিনগুলোয় আমাদের ভ্রমণ করতে হবে।' করোনা-পরবর্তী পর্যটন শিল্পে অর্থনৈতিক লোকসান পোষাতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, 'এই তিন মাস পুরোপুরি ব্যবসায়িক ধ্বসের পরে দেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এবং রিসোর্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার জীবিকার কথা চিন্তা করে সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, ১৫ শতাংশ ট্যাক্সের পরিবর্তে সাড়ে ৪% ভ্যাট পুনর্নির্ধারণ করা। এ নিয়ে সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাবনা শিগগির উপস্থাপন করব।'

বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে কথায় কথায় উঠে আসে করোনার কারণে পর্যটনের গাণিতিক ক্ষতির অঙ্ক। তিনি বলেন, 'আটাব-এর ৩ হাজার ৯০০ সদস্যের বাইরে বাংলাদেশে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করেন এমন ট্যুরিজম ব্যবসায়ীর সংখ্যাটাও কম নয়। পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত পরিবহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্যুর গাইড ও ভ্রমণস্থানের আশপাশের হস্তশিল্প এবং স্যুভেনিয়র নির্মাতা ও ব্যবসায়ীরাও আমাদের পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব পেশাজীবী আজ মহাসংকটময় অবস্থায় আছে। টু্যুরিজম বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী মার্চ ও এপ্রিল মাসে পর্যটন শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ ১৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে শুধু লাইসেন্স নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোই যুক্ত। কিন্তু পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পেশাজীবীর সঠিক হিসাব নির্ণয় করলে ক্ষতির পরিমাণটা দাঁড়াবে কমপক্ষে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। দুই মাসের ক্ষতির হিসাবে এই অবস্থা চালু থাকলে তবে বছর শেষে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৮০ হাজার কোটি টাকা, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'

দেশের পর্যটনে নতুন ধারা যুক্ত করেছে অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপগুলো। তরুণদের হাত ধরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে অধিকাংশ গ্রুপই খারাপ সময় পার করছে। ট্যুর গ্রুপ বিডির (টিজিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরানুল আলম বলেন, করোনার প্রভাবে পুরো বিশ্বে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত খাত পর্যটন শিল্প। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকটেও পর্যটনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অনলাইননির্ভর ট্রাভেল গ্রুপগুলো। এই গ্রুপ বা কোম্পানিগুলো বেশিরভাগই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যারা অল্প পুঁজি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ করে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনার বর্তমান প্রভাব, কর্তৃপক্ষের সঠিক নির্দেশনার অভাব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেকেই আর্থিক অনিরাপত্তায় ভুগছে। ক্ষুদ্র অনেক উদ্যোক্তাই নিজেদের জমানো অর্থ কিংবা ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে পর্যটন স্থাপনা যেমন হোটেল, রিসোর্ট, বোট এবং লোকাল জিপের ব্যবসায় জড়িত হয়েছে, তাদের কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।'

করোনা-পরবর্তী পর্যটন নিয়ে রয়েল টিউলিপ কক্সবাজারের মার্কেটিং কমিউনিকেশন্স সুমাইয়া আক্তার বলেন, ভ্রমণে নতুন পরিবর্তনে অভ্যস্ত হতে হবে। গড়ে ১০ জন মানুষের একজন যখন পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত সেখানে তিন মাসের অধিক সময় ধরে বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ ব্যবসা। আশা করছি করোনার প্রভাব কমলেই আবার সরব হয়ে উঠবে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। প্রস্তুত হচ্ছে সবাই। এবার একেবারেই ভিন্ন এই প্রস্তুতি। ট্যুরিস্টদের জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, শরীরের তাপমাত্রা মাপক যন্ত্র, ফুটওয়্যার ডিজ-ইনফেক্টর, ব্যাগ-লাগেজ ডিজইনফেক্টর। পাবলিক এরিয়া ও বারবার ব্যবহার করা জায়গা যেমন- লিফট, দরজার হ্যান্ডেল, মিটিং স্পেস, লবি ইত্যাদি জায়গা বারবার জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মেনে চলা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারি বিধিনিষেধ। ভ্রমণে নানান প্রস্তুতির পাশাপাশি করোনা মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগের সঙ্গেও আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। হোটেলে অবস্থানকালে পুল, রেস্টুরেন্ট এড়িয়ে চলুন। খাবার রুমে অর্ডার করুন। সর্বোপরি আপনার নিরাপত্তার কথা আপনাকেই ভাবতে হবে।'

আঁধার ঘেরা রাতের শেষে যেমন আশার আলো হয়ে ভোরের সূর্য ওঠে, তেমনি সবারই প্রত্যাশা করোনার সংকট কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক হবে পৃথিবী। সব কিছু ফিরে পাবে পুরোনো রূপ। আবার মানুষ ভ্রমণ করবে পথ থেকে পথে, পাহাড়ে-সমুদ্রের প্রান্তরে। সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা প্রিয় মাতৃভূমির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়ে পড়বে সবাই। এই অস্থির সময় পার করে দেশের পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা। া

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)