জেগে থাকবে স্বাস্থ্য বিভাগ

২৩ মে ২০২০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০

রাজবংশী রায়

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারি চলছে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন চারশ'র বেশি মানুষ। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা। করোনার প্রাণঘাতী সংক্রমণের মধ্যেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলসহ বেশকিছু জেলা লণ্ডভণ্ড হয়েছে। প্রাণহানির পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমনই এক দুঃসময়ের প্রেক্ষাপটে দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ।

এমন ঈদ আগে কখনও আসেনি। ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছর ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ গ্রামে যান। কিন্তু করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে এবার গ্রামে ফিরতে নিরুৎসাহিত করায় ঈদযাত্রার চিরচেনা সেই রূপ দেখা যাচ্ছে না। পথে পথে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে এরপরও কিছু মানুষ গ্রামে ফিরেছেন।

গত ২৬ মার্চ থেকে টানা সরকারি ছুটি চলছে। করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার নেতৃত্বে থাকা স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ঈদ সামনে রেখে অন্যরা ছুটি পেলেও স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ কোনো ছুটি পাচ্ছেন না। চলমান করোনা প্রতিরোধযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে জেগে থাকবেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় ৪২টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ৬৪টি জেলা সদর হাসপাতাল, ৩৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিশেষায়িত হাসপাতাল, ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র- সবগুলো প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। একইসঙ্গে বেসরকারি সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানও খোলা রাখতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ করোনাকালে ঈদের ছুটিতেও জেগে থাকবে পুরো স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান সমকালকে বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্য বিভাগের সবার ছুটি গত ২৬ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ওই আদেশ বহাল থাকবে।

প্রতিবছর ঈদের সময় হাসপাতাল চালু রাখতে ডিউটি রোস্টার আগে থেকেই তৈরি করা হতো। সে অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এত বছর পালা করে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু এবার সে সুযোগ নেই। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের পাশাপাশি অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে একবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রক্রবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এক আদেশে সব প্রতিষ্ঠানকে সপ্তাহের সাত দিনই নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার সমকালকে বলেন, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারা কেউই ঈদের ছুটির কথা চিন্তাই করছেন না। ঈদের ছুটির চেয়ে মহামারির এ সময়ে কীভাবে রোগীর সেবা দেওয়া যায়, সেটিই তাদের কাছে মুখ্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও এ বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত আছেন। কেউ কেউ রোগীর পাশে থাকাকেই সৌভাগ্য বলে মনে করছেন। দুর্যোগময় এই সময়ে নিজেদের ডেডিকেশন প্রমাণ করতে চান তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা সমন্বিত কন্ট্রোল রুম, হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকবে বলেও জানান তিনি।

জেগে থাকবেন সম্মুখযোদ্ধারা : দেশের প্রথম করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল রাজধানীর উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল। দুইশ' শয্যার এই হাসপাতালে ১২৯ চিকিৎসক, ১৪২ নার্স ও সমসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন। এই হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন ডা. মুহম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি সমকালকে বলেন, হাসপাতালের পুরো জনবলকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক গ্রুপ একটানা ১০ দিন ডিউটি করার পর তাদের নির্ধারিত হোটেলে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। ওই সময়ে অপর একটি গ্রুপ দায়িত্ব পালন করে। ১০ দিন দায়িত্ব পালন শেষে ওই গ্রুপ কোয়ারেন্টাইনে চলে যায়। তৃতীয় গ্রুপ তখন দায়িত্ব পালন করে। এভাবে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা দায়িত্ব পালন করছেন।

ঈদে পৃথক কোনো রোস্টার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, ঈদ সামনে রেখে নতুন করে কোনো রোস্টার হয়নি। করোনা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করা কেউই বাসায় ফিরতে পারবেন না। আগে থেকে চালু করা রোস্টার মেনে হাসপাতালে ডিউটি করতে হবে। যাদের ডিউটি থাকবে না, তারা হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। এতে করে পরিবারের কারও সঙ্গে ঈদ করার সুযোগ মিলবে না তাদের। এ নিয়ে কারও দুঃখ নেই বলেও জানান তিনি।

দেশের করোনা ডেডিকেটেড দ্বিতীয় হাসপাতাল রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এই হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের দায়িত্বে আছেন ডা. শাহজাদ হোসেন মাসুম। তিনি সমকালকে বলেন, প্রতিবছর ঈদের আগে সবাই ছুটির জন্য আসতেন। এবার কেউ ছুটি চাননি। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাস্তবতা মেনে নিয়েই দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

ডা. শাহজাদ হোসেন আরও বলেন, তার স্ত্রীও একজন চিকিৎসক। ঈদের দিন সকালে তারা দু'জনেই দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের দুই ছেলে বাসায় থাকবে। সহকর্মীরা যাতে আরও উৎসাহিত হন- এ কারণে তিনি নিজে ঈদের দিন সকালে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের চাহিদা অনুযায়ী হয়তো আমরা সেবা দিতে পারছি না। অনেকে অভিযোগ করেন চিকিৎসক, নার্সরা রোগীর কাছে যান না। এটি কিন্তু না দেখেই তারা বলছেন। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তার ইউনিটেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে অন্তত ১০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। রোগীর সংস্পর্শে না গেলে তো কেউ আক্রান্ত হতেন না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নতুন ভবন ও বার্ন ইউনিটের ভবন করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ৫৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রায় দেড়শ' চিকিৎসক, দুই শতাধিক নার্স ও সমসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, এবার তার কাছে কেউ ছুটির আবেদন করেননি। কারণ সবাই জানেন, বর্তমানে আমরা একটি দুর্যোগকাল অতিক্রম করছি। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেটি মেনে নিয়েই কাজ করছেন।

করোনা ডেডিকেটেড মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের করোনা সেলের সভাপতি ও ইএনটি বিভাগে প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ সমকালকে বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে তাদের হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। অন্য সময়ে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে সবাই বাসায় যেতেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেন। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। হাসপাতালে টানা ১০ দিন ডিউটি করে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে হোটেলে। এই সময়টাতে ভিডিও কল ছাড়া পরিবারের সদস্যদের দেখার আর কোনো সুযোগ নেই। কোয়ারেন্টাইন শেষ করে আক্রান্ত না হলেই কেবল ছয় দিনের জন্য বাসায় যেতে পারবেন। সুতরাং এমন বাস্তবতায় কেউ ঈদের ছুটি চাননি।

করোনা ডেডিকেটেড না হলেও রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একশ'র কাছাকাছি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। উপসর্গ লুকিয়ে রোগীরা সেবা নিতে যাওয়ার পাশাপাশি উপসর্গহীন রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে এত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। এবার ঈদের ছুটিতে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া সমকালকে বলেন, তার প্রতিষ্ঠান সরাসরি করোনা ডেডিকেটেড না হলেও সন্দেহভাজন রোগীদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড আছে। নমুনা পরীক্ষায় কারও পজিটিভ হলে তাকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে অন্যান্য সাধারণ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যাতে কোনো অবহেলা না ঘটে সে বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক আছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, 'বিশ্বব্যাপী সবাই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। এটা বেঁচে থাকার ও জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ। ভাইরাসকে পরাজিত করে জীবন বাঁচানোর এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা রোগীর পাশে থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। আবার কেউ প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি কোনোদিন ভুলবে না। ঈদে সবাই যখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন, কিছুটা হলেও আনন্দ ভাগাভাগি করবেন, সেখানে তারা থাকবেন হাসপাতালে রোগীর সেবায়। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাস্তব অবস্থা আমরা জানি। এরপরও সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, দুর্যোগময় পরিস্থিতির বাস্তবতায় আপনারা শতভাগ উজাড় করে দিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হোন। মানুষের একমাত্র ভরসা ও আস্থার জায়গা আপনারা। দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে আপনাদেরই মাঠে থাকতে হবে।'







© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)