রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা

ঘনবসতি ও অসচেতনতায় দ্রুত ছড়াতে পারে করোনা

২১ মে ২০২০

আবু তাহের, কক্সবাজার

কক্সবাজারের বিশাল রোহিঙ্গা কাম্পে গত বৃহস্পতিবার প্রথম করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়। তিনি হলেন বালুখালী লম্বাশিয়া ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের এক যুবক। এরপর থেকে ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। পরদিন শুক্রবার একই ক্যাম্পে আরও দুই রোহিঙ্গার আক্রান্ত হওয়ার রিপোর্ট আসে। এতে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ক্যাম্পের দুটি ব্লকে প্রায় আড়াই হাজার ঘর লাল পতাকা দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এই দুটি ব্লকে প্রায় ১০ হাজার লোক থাকে। এরপর শনি ও রোববার আরও দুই রোহিঙ্গার আক্রান্তের রিপোর্ট আসে। সোমবারও একজন শনাক্ত হয়। তিনি কুতুপালং ৬ নম্বর ক্যাম্পের ডি ব্লকের বাসিন্দা। এ অবস্থায় শুধু প্রশাসন নয়; সংশ্নিষ্ট লোকজন, স্থানীয়সহ সবার মধ্যেই উদ্বেগ বেড়েছে। তারা এর জন্য ক্যাম্পগুলোতে অতি ঘনবসতি আর বাসিন্দাদের অসচেতন চলাচলকে দায়ী করেছেন। কুতুপালং ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেছেন, ঘনবসতি ও অসচেতনতার কারণেই ক্যাম্পে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী ডা. আবু তোহা ভূঁইয়া জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচ দিনে মোট ছয়জন শনাক্ত হয়েছে। তাদের বিভিন্ন আইসোলেশন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের দুটি ব্লক লাল পতাকা দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে।

তিনি জানান, শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও সংস্থার সমন্বয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। করোনা রোধে পদক্ষেপ নিয়ে আরও আলোচনা হচ্ছে। সংশ্নিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডা. তোহা আরও জানান, ক্যাম্পে ১২টি আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। এতে এক হাজার ৯০০ বেড আছে। সোমবার ৫০ বেডের আরও একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়েছে। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন ব্লকে মাঝিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ অসুস্থ হলে প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে। আগের তুলনায় বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা হবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা সংক্রমণের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কর্মরত সেবা সংস্থাগুলোর লোকজনও আতঙ্কিত। অনেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে আবেদন জানিয়েছেন। ব্যাপক ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে ওই এলাকাকে।

কুতুপালং ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, উখিয়া-টেকনাফে ৩২টি ক্যাম্প এমনিতে এইচআইভি, হাম, পোলিও, চর্মরোগসহ নানা ছোঁয়াচে রোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। এখন করোনা হানা দিয়েছে এখানে।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন বড়ুয়া রাজন বলেন, ক্যাম্পে রোগী শনাক্ত হওয়া স্বভাবতই উদ্বেগের বিষয়। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সামাজিক দূরত্ব মানে না। বারবার হাত ধোয়া, মাস্কের ব্যবহার তারা করে না। প্রতি বর্গমাইলে সেখানে এক লাখের বেশি মানুষের বাস। অধিক সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে থাকে পরিবারগুলো। বিশাল এই জনগোষ্ঠী ব্যবহার করে গণশৌচারগার। সেখানে হাত ধোয়াসহ স্বাস্থ্য সচেতনতার নিয়ম মানা কঠিন কাজ। সরেজমিন দেখা যায় ভয়াবহ পরিস্থিতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দোকান, বাজার, মসজিদগুলোতে অনেকটা আগের মতোই ভিড়। রোহিঙ্গাদের সরল জবাব- 'আল্লাহ তাদের এ রোগ দিলেও তিনি রক্ষা করবেন।'

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পে স্থানীয়রা প্রবেশ না করলেও রোহিঙ্গারা বাইরে ঘোরাঘুরি করে। তারা আইনকানুন মানে না। লকডাউন কী, তারা বুঝতে চায় না। স্থানীয় হাটবাজার-স্টেশন, দোকানপাট সবখানেই রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ৮ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার জেলার সঙ্গে উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পও লকডাউন করা হয়। কিন্তু শত শত এনজিওকর্মী অবাধে ক্যাম্পে যাতায়াত করছে। এতে স্থানীয়দের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ক্যাম্প এলাকার অভ্যন্তরে বাস করা প্রায় ১০ হাজার স্থানীয় মানুষ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ক্যাম্পের বাস্তব অবস্থা দেখলে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। যে অবস্থা চলছে পুরো জেলার মানুষ এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই ইউনিয়নে ১৫টি ক্যাম্পের অবস্থান। এসব ক্যাম্পে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার বাস। আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি। একই কথা বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার বখতিয়ার আহমেদ। তিনি বলেন, লকডাউন বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই ঝুঁকিতে এখন সবাই।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এমনিতেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। তার ওপর করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় সবাই উদ্বিগ্ন। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে চলাচল। প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অন্য সব কার্যক্রম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘসহ বেশ কিছু দেশি-বিদেশি সেবা সংস্থা এ নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে তিনি জানান। এদিকে উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা।











© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)