তবুও তিনি ভিসি থাকবেন!

১০ অক্টোবর ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

খুন হওয়া আবরার ফাহাদ ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের নিজ বিভাগের ছাত্র। ফাহাদের সরাসরি শিক্ষক তিনি। নিজ ছাত্র খুনের খবর পেয়েও তিনি ফাহাদকে দেখতে যাননি। এমনকি শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ৩৫ ঘণ্টার মধ্যেও তার দেখা না পাওয়ায় ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ ঘটনায় হতবাক সরকারের শীর্ষ মহলও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলেছেন, ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্যের ঘটনাস্থলে যাওয়া উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি দু'দিন আগেই উঠেছিল। গতকাল একই দাবি জানাল বুয়েট শিক্ষক সমিতিও। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সব মহল থেকেই এখন তার পদত্যাগ চাইছে।

জানা গেছে, তিন বছর আগে ২০১৬ সালের ২৩ জুন বুয়েটের উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নিয়োগ পান। ওই বছরের ২৪ মে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বুয়েটের এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা একরাম। তাঁর মৃত্যুতে উপাচার্য পদ শূন্য হলে সরকার উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে। এই বিভাগেরই দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আবরার ফাহাদ।

চার বছরে জন্য নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য সাইফুল ইসলামের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ২২ জুন। তবে এখনই তাঁর পদত্যাগ চাইছে বুয়েটের সব মহল। অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে অপসারণ করা হবে কি-না, জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো, সোহরাব হোসাইন সমকালকে বলেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তিনি এ বিষয়ে কিছু বলার অধিকার রাখেন না।

জানা গেছে, বর্তমান উপাচার্যের মেয়াদের গত তিন বছরে বুয়েটে আরও দুটি বড় ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এর একটিতেও তার প্রশাসনিক দক্ষতা দেখাতে পারেননি। প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, উপাচার্য বরাবরই শিক্ষার্থীদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও খুব কম। যে কোনো ইস্যুতে তিনি প্রশাসনের অন্যদের পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলাতেন। গত জুনে শিক্ষার্থীদের একটি আন্দোলনকে তিনি ছাত্রলীগ নেতাদের দিয়ে প্রশমিত করার চেষ্টা করেন। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরও বিক্ষুব্ধ হন। ওই ঘটনায় টানা সাত দিন ধরে বুয়েট অচল হয়ে ছিল। পরে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করেন।

সূত্রগুলো জানায়, গত ১৫ জুন থেকে ১৬ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনে পুরোপুরি অচল হয়ে ছিল বুয়েট। বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের নবনিযুক্ত পরিচালককে অপসারণ, ছাত্রদলের গোলাগুলিতে নিহত সাবেকুন নাহার সনির নামে ছাত্রী হলের নামকরণ, গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো, নিয়মিত শিক্ষক মূল্যায়ন প্রোগ্রাম চালু রাখা, যাবতীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও ন্যাম ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা ছিল তাদের দাবি। এ ছাড়া নির্বিচারে ক্যাম্পাসের গাছ কাটা বন্ধের দাবিও জানান শিক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যে যেসব গাছ কাটা হয়েছে, উপাচার্যের উপস্থিতিতে তার দ্বিগুণ গাছ লাগানোর দাবি তাদের। ক্যাম্পাসকে ওয়াইফাইয়ের আওতায় আনা, বুয়েটের প্রবেশমুখে ফটক নির্মাণ, ব্যায়ামাগারের আধুনিকায়ন এবং পরীক্ষার খাতায় রোল নম্বরের পরিবর্তে কোডিং সিস্টেম চালুর দাবি জানিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রছাত্রীরা জানান, গত ২২ মে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের নতুন পরিচালক পদে নিয়োগ পান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম মিয়া। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই পদটিতে নতুন নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। নিয়োগটি হয়েছে তড়িঘড়ি করে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, অধ্যাপক কাশেমের আগে পদটিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার ওই পদ থেকে সরেননি; তাঁকে সরানো হয়েছে। যদিও অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার শিক্ষার্থীদের নতুন ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে মেনে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। ওই আন্দোলনের পর অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে এ পদে বসানো হয়। বুয়েটের একাধিক সূত্র জানায়, তাকে এ পদে বসাতে বুয়েট ছাত্রলীগের নেপথ্য ভূমিকা আছে। এখন তিনিও বর্তমান উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে একমত বলে বুয়েট শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে ছাত্রছাত্রীদের জানিয়েছেন।

শুধু ছাত্র-শিক্ষকরাই নন; বর্তমান উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়েছেন বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীরাও। গতকাল শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততায় উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের পদত্যাগ চেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক সমিতি এবং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল বুধবার আবরার হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবিতে আন্দোলনে সমর্থন জানাতে এসে শিক্ষক সমিতি ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এ দাবি জানালে শিক্ষার্থীরাও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন।

সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্রায় ৩০০ শিক্ষকের সমন্বয়ে বৈঠকের পর শিক্ষার্থীদের সামনে আসে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। বৈঠকে শিক্ষকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কথা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একেএম মাসুদ। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে উপাচার্যের পদত্যাগসহ ১০টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষার্থীদের সামনে অধ্যাপক একেএম মাসুদ বলেন, 'আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় বুয়েট উপাচার্যের অদক্ষতা ও নির্লিপ্ততায় তাঁর পদত্যাগ দাবি করছে শিক্ষক সমিতি। উপাচার্য যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে সরকারের কাছে দাবি, তাঁকে যেন অপসারণ করা হয়।' এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও 'পদত্যাগ পদত্যাগ' বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, উপাচার্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি নিজের অসুস্থতার কথা বলে ক্যাম্পাসে আসেননি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা মারা গেলেও তাঁর কিছু আসে যায় না। কাজেই নৈতিকভাবে তিনি উপাচার্য থাকার যোগ্যতা রাখেন না। এ সময় তাঁরা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন।

এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বুয়েট ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে এক সমাবেশ থেকে উপাচার্যের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবি জানায় বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ৭ দফা লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সেখানে ৭ দফা দাবির মধ্যে পঞ্চম দফায় বলা হয়- 'বুয়েট অ্যালামনাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘ দিনের নির্লিপ্ততা, অব্যবস্থা ও ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থতার ফল। অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের তদন্ত, বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে উপাচার্যসহ বুয়েট প্রশাসনের ধারাবাহিক অবহেলা ও ব্যর্থতা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে মদদ জুগিয়েছে। তাই অবিলম্বে উপাচার্যের অপসারণসহ প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মান অতীতের মতো সমুন্নত রাখতে সুযোগ্য, নির্ভীক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের পদায়ন করতে হবে।'

এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে মুঠোফোনে কল করা হলে ফোনটি বন্ধ দেখায়। আবরারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ওই সময় তিনি কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছিলেন। এদিকে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী কামরুলকেও মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)