শঙ্কার দ. আফ্রিকা হোক সম্ভাবনার শ্রমবাজার

জনশক্তি

১০ অক্টোবর ২০১৯

ড. তাসনিম সিদ্দিকী

বিদেশ থেকে যখন কোনো প্রবাসীর মৃতদেহের কফিন এসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে, তখন কষ্টে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আর সেই মৃতদেহটি যদি কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধার হয়, তাহলে কষ্টের মাত্রাটা আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেসব মানুষ প্রবাসে ছুটে যায়। দেশত্যাগ করে বছরের পর বছর অজানা-অচেনা দেশে পরে থাকা প্রবাসীদের কষ্ট তাদের মতো করে আর কারও বোঝার কথা নয়। এসব প্রবাসীর অনেকেই শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে বিদেশে পাড়ি জমায়। তাদের কেউ যখন লাশ হয়ে দেশের মাটিতে ফিরে আসে, তখন সেই পরিবারটির কী পরিণতি হয়, তা সবারই বোঝার কথা। তবে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু যখন শারীরিক অসুস্থতা, সড়ক দুর্ঘটনা বা কর্মক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার জন্য হয়, তখন যতটা কষ্ট লাগে, তার চেয়ে বেশি বেদনার যখন সন্ত্রাসী হামলায় কোনো প্রবাসীর মৃত্যু হয়।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাব্বির আহমেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ব্যবসা ও টাকা নিয়ে বিরোধ, বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিবাদ ইত্যাদি কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় গত চার বছরে চারশ'র বেশি বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। এ খবরটি জানার পর স্বাভাবিক কারণেই আমরা যারা প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করছি, তাদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কতসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, তিন লাখের বেশি লোক আফ্রিকা মহাদেশের সর্বদক্ষিণের স্বাধীন দেশটিতে বসবাস করছেন। বলা চলে, তাদের প্রায় সবাই অবৈধভাবে দেশটিতে অনুপ্রবেশ করেছেন। ২০০০ সাল থেকে শুরু হয় এ অনুপ্রবেশের যাত্রা। বিভিন্ন দালালচক্রের মাধ্যমে ২-৩টি রাষ্ট্র ঘুরে ভাগ্যবদলের আশায়-নেশায় এসব লোক সেখানে পাড়ি জমান। মূলত রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে তারা দেশটিতে অবস্থান করছেন। তবে কেউ কেউ সেদেশের নারীদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছেন। বসবাস করছেন বলার চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন বলা যৌক্তিক হবে বলে মনে করছি।

কারণ যেসব লোক দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছেন, তারা মূলত সেদেশে মুদি-কনফেকশনারি-কসমেটিকস সরঞ্জামাদির দোকানদারি করছেন। অনেকে আবার শুরুর দিকে বাংলাদেশিদের দোকানে কর্মচারী হিসেবে চাকরি করে পরে নিজেই দোকানের মালিক হয়ে যাচ্ছেন। এমন অনেকে দেশেই অবৈধ বাংলাদেশিরা কমবেশি বসবাস করছেন, যাদেরকে মাঝেমধ্যে ফেরত পাঠানোর খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখি। এ অবস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকায় যদি বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, সেটি দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ১০-১২ লাখ টাকা খরচ করে আমাদের দেশের অনেক মানুষ অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছেন। অথচ বৈধপথে তাদের দেশটিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেলে ব্যক্তি-পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রও লাভবান হবে। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।

যেসব বাংলাদেশি নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের বেশিরভাগই সেখানে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তার মানে এসব লোক গণহারে বলে থাকেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের জীবন স্বদেশে নিরাপদ নয়। তাই তারা জীবন-জীবিকার স্বার্থে আশ্রয় চান সুদূর আফ্রিকার দেশটিতে। হয়তো এসব আশ্রয় চাওয়া মানুষের কষ্ট লাগে নিজের দেশের বিরুদ্ধে এমন অসত্য অপবাদ দিতে। কিন্তু নিরুপায় হয়েই তাদেরকে এ অনৈতিক কাজটি বেছে নিতে হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গত ৪ বছর ৯ মাসে ৪৫২ জন এবং চলতি বছরে ৮৮ জনকে লাশ হয়ে দেশে ফেরা প্রসঙ্গে। এসব প্রবাসীর মধ্যে খুব কম সংখ্যকেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা বা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে সেই সংবাদও খুব একটা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এসব মৃত্যু হয়েছে সন্ত্রাসী হামলায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দোকানে সে দেশীয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা মালামাল লুট করতে এসে গুলি করে বাংলাদেশি মালিক-কর্মচারীদের হত্যা করেছে। আবার কখনও কখনও বাংলাদেশিরাই পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এমনও খবর পাওয়া যায়, দেশের জায়গা-জমি বিরোধের ঝাল মেটাতে বিদেশের মাটিতে বসে নিজ দেশের নাগরিককে হামলা করা হচ্ছে। কখনও কখনও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। এসব হামলার বেশিরভাগই হচ্ছে আফ্রিকান ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের মাধ্যমে। সুতরাং প্রবাসীরা নিজেরা যদি নৈতিকতার চর্চা করেন, তাহলে হয়তো প্রাণ হারানোর সংখ্যাটা আরও কমে আসবে। যারা চুক্তিভিত্তিক বিয়ের মাধ্যমে সে দেশটিতে বসবাস করছেন, তাদের একটা অংশ বিয়ে ভেঙে যাওয়া বা সেই নারীর স্বজনদের সঙ্গে বিরোধের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সে দেশের নারীকে বিয়ে করে নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করেন। আর এ শক্তির জানান দিতে কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে বিনা পরিশ্রমে অধিক আয়ের পথ হিসেবে বেছে নেন অপরাধ জগৎ। তারা প্রায়ই সেখানে বসবাস করা অন্য বাংলাদেশিদের তথ্য সে দেশীয় সন্ত্রাসীদের সরবরাহ করেন। পরে ফাঁদ পেতে নিজ দেশের নাগরিককে বিপদে ফেলেন।

আমাদের কোনো নাগরিককে যেন সে দেশ থেকে লাশ হয়ে দেশে ফিরতে না হয়, সে জন্য এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আর এ জন্য জনসচেতনতাবোধ জাগ্রত করতে হবে। যারা অবৈধ পথে দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি জমাতে চান, তাদের বোঝাতে হবে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যেন পা না বাড়ান।

পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় এন্টারপ্রাইজ ভিসা চালু করতে আমাদের সরকারকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। যদি সেদেশে গিয়ে ব্যবসা করে আমাদের নাগরিকরা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে নিয়ে আসতে পারে, এটা তো আমাদের জন্যই বড় অর্জন হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিভাষণ সংস্থার সম্মেলনে বিষয়টি বাংলাদেশকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। ঢাকা-জোহানেসবার্গের মধ্যে যদি সুসম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা আসবে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্রমবাজার ধরতে পারলে তুলনামূলক বেশি লাভবান হওয়া যাবে। যেহেতু সে দেশে ব্যবসা করার ভালো সুযোগ রয়েছে। এর ফলে শিক্ষিত বা কোনো বিশেষ কাজে প্রশিক্ষিত জনশক্তির বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ফলে বেকার যুবকদের কাজের একটা বড় ক্ষেত্র তৈরি হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের দূতাবাস থাকলেও এ দেশে তাদের কোনো দূতাবাস নেই। কীভাবে ঢাকাতে দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস নিয়ে আসা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। যে তিন লাখেরও বেশি বাংলাদেশি দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছেন, তাদের ব্যাপারে সে দেশে আমাদের দূতাবাসকে আরও আন্তরিক হতে হবে। মনে রাখতে হবে, এসব মানুষ আমাদেরই স্বজন। ভাগ্য বিড়ম্বনায় তারা হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে দুই পয়সা রোজগারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তারা কীভাবে নিরাপদে সেখানে থাকতে পারেন, সেটি দেখা আমাদের দূতাবাসের নৈতিক দায়িত্ব।

অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রামরু

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]