বিতর্কিতদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে গোয়েন্দারা

চিঠি যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকেও

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাহাদাত হোসেন পরশ

ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিসহ অবৈধভাবে যারা নামে-বেনামে কোটি কোটি
টাকার মালিক হয়েছেন, তাদের সম্পদ জব্দ হচ্ছে। সরকারের একাধিক সংস্থা আওয়ামী
লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের বিতর্কিত নেতাদের সম্পদের খোঁজ নেওয়া শুরু
করেছে। বিতর্কিত যুবলীগ নেতাদের গ্রেফতারের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং আইনেও
তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। এরই মধ্যে যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক
খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়েছে। ওই
মামলা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা হয়েছে। তবে মানি লন্ডারিং আইনে
দায়ের করা মামলার তদন্ত করবে সিআইডি। অন্য মামলাগুলোর তদন্ত করবে ঢাকা
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।


পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন,
নামে-বেনামে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তার খোঁজ নেওয়া
হচ্ছে। যদি তারা সম্পদের হিসাব দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।


ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, অবৈধভাবে কে কী পরিমাণ সম্পদ
অর্জন করেছে তা দেখবে সিআইডি। অস্ত্র, মাদক ও মদের আসর বসানোর যে অভিযোগ
রয়েছে তার তদন্ত শুরু করেছে ডিবি।


একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঢাকায় অর্ধশতাধিক ক্লাব রয়েছে। এর মধ্যে
৩০টি ক্লাবে ক্যাসিনো চলত। যারা এসব ক্লাবের সঙ্গে জড়িত নতুনভাবে তাদের
তালিকা তৈরি করছেন গোয়েন্দারা। এসব তালিকা ধরে তাদের সম্পদের খোঁজ নেওয়া
হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়ে কোন হিসাব নম্বরে কার কত টাকা রয়েছে তা
জানার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদি সম্পদ অর্জনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না
পারে, তাহলে তাদের ব্যাপারে নেওয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।


এরই মধ্যে র‌্যাব ও ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে যুবলীগ নেতা খালেদ স্বীকার করেছেন,
নামে-বেনামে তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বিদেশেও তার সম্পদ রয়েছে।
নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল
গাড়ি। খালেদের কাছ থেকে প্রভাবশালী আরও অনেকের নাম জানা গেছে।


রিমান্ডে খালেদের কাছ থেকে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, যুবলীগের প্রভাবশালী
নেতারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের টেন্ডার ও জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজেদের
মধ্যে সমঝোতা করে চলতেন। বিভিন্ন দপ্তর তারা ভাগ করে নিতেন। তাই নিয়ন্ত্রণ
নিয়ে বড় ধরনের কোনো সংঘাত হতো না। তবে এসব দপ্তর থেকে পাওয়া অর্থ মাসোহারা
হিসেবে বিভিন্নজনের কাছে চলে যেত।


পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে যারা
অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন চাইলে তাদের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকে অভিযান
চালানো সম্ভব ছিল। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের ব্যাপারে উষ্ফ্মা
প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। তবে দীর্ঘদিন এসব বিতর্কিত নেতার সঙ্গে
পুলিশ প্রশাসনের অনেক অসাধু কর্মকর্তার গভীর সখ্য ছিল। মতিঝিলে সবচেয়ে বেশি
ক্লাব রয়েছে। ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও ডিবির কর্মকর্তাদের চোখের
সামনে বছরের পর বছর চলত ক্যাসিনো।


খালেদ গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, এক সময় তিনি ফ্রিডম পার্টির কর্মী ছিলেন।
এরপর যুবদলের রাজনীতিও করেছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সখ্য রয়েছে
তার। দিনে-রাতে অস্ত্রধারী ক্যাডার পরিবেষ্টিত হয়ে চলতেন তিনি। একাধিক দেশে
তার সম্পদ রয়েছে। যুবলীগ নেতা মিল্ক্কী হত্যার পর মতিঝিল এলাকায় আধিপত্য
প্রতিষ্ঠা করেন খালেদ। যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের
ছত্রছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে খালেদের হাতে। মতিঝিল, ফকিরাপুল
এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। খিলগাঁও-শাহজাহানপুর হয়ে
চলাচলকারী গণপরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন তিনি। কোরবানির ঈদে
শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ ছিল তার
হাতে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), রেল ভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি
উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ।
সরকারি দপ্তরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা আলাদা ক্যাডার ছিল। রাজউকের
টেন্ডারে নিয়ন্ত্রণ ছিল খালেদের হাতে। রেল ভবনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন
খালেদের ভাই মাসুদ। রাজউক ভবনের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন খায়রুল ও উজ্জ্বল।


এছাড়া যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট কোটি কোটি টাকার
সম্পদের মালিক হয়েছেন। সম্রাটের সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৯ নম্বর
ওয়ার্ড কাউন্সিলর একে মমিনুল হক সাঈদ, আওয়ামী লীগ নেতা আলী আহমেদের
ব্যাপারে তথ্য নেওয়া শুরু হয়েছে।


দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পুলিশের মাঠ পর্যায়ের অনেক সদস্যকে ম্যানেজ করেই
ক্যাসিনো চালানো হতো। দু'জন সৎ কর্মকর্তা ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নেওয়ার চেষ্টা করলেও অসৎ কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়েন। এছাড়া যুবলীগ
উত্তরের তিনজন নেতার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন গোয়েন্দারা। তারা মিরপুর
এলাকায় জুয়ার আসর বসাত। মিরপুর-১, পল্লবী, উত্তরা-৪, উত্তরা-১৩ নম্বর
সেক্টরে বসত জুয়ার আসর। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আটটি স্থানে যুবলীগ মহানগর
দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতার তত্ত্বাবধানে ক্যাসিনো ব্যবসা চলত। গুলশান লিংক
রোডের ফু-ওয়াং ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, নিউমার্কেট এলাকার এজাজ ক্লাব,
কলাবাগান ক্লাব, পল্টনের জামাল টাওয়ারেও বসত ক্যাসিনোর আসর। ক্যাসিনোগুলোতে
ওয়ান টেন, ওয়ান-এইট, তিন তাস, নয় তাস, কাটাকাটি, নিপুণ, চড়াচড়ি, ডায়েস,
চরকি রামিসহ নানা নামের জুয়া খেলা হতো। লোভ সামলাতে না পেরে অনেকেই পথে
বসেছেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)