এক যে আছে নিতু...

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মোশারফ হোসাইন

পৃথিবীতে প্রতি ৪০ লাখে একজন প্রোজেরিয়া রোগী পাওয়া যায়। এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই এবং এই রোগাক্রান্ত শিশুরা সাধারণত ১৩ বছরের বেশি বাঁচে না। ডাক্তারদের সেই হিসাবমতে, নিতুর হাতে আছে আর  একটি বছর।

'নিজের মৃত্যুটা খুব কাছে জেনেও পড়াশোনা, ছবি আঁকা এবং গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনকে উপভোগ করার চেষ্টায় ব্যস্ত তাকলিমা জাহান নিতু। নিতুর বয়স মাত্র ১২ বছর। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, বিরল ব্যাধি প্রোজেরিয়ায় আক্রান্ত এ শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে জীবনের অনেকটাই শেষ প্রান্তে। সময় ঘনিয়ে আসছে তার, তবুও জীবনকে উপভোগ করছে অন্য স্বাভাবিক শিশুদের মতোই। শিশুটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, আর কিছুদিন পরেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে পৃথিবী ছাড়বে। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ থাকায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে কটুকথা শুনতে হয় তাকে। গোপনে চোখের পানি মুছে নিতুর মা জ্যোৎস্না খানম বলেন, 'আমার মেয়েকে কখনও কেউ কোলে তুলে আদর করেনি, সবাই তাকে ভয় পায়, দানব বলে দূরে ঠেলে দেয়। তবে এসব কিছুই থামাতে পারেনি তার নিত্যদিনের আনন্দ-উল্লাসকে। এখনও সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যায়, ছবি আঁকে ও পুতুল খেলে নিজের অবসর সময় কাটায়। নিতুর দিনমজুর বাবা আর গৃহিণী মায়ের এখনও আশা, উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো আবারও সুস্থ হয়ে উঠবে তাদের আদরের চতুর্থ সন্তান। সিলেটের হবিগঞ্জ শহরের তাসনুভা-শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়াশোনা করে নিতু। যেমন লিখতে পারে, ছবিও আঁকতে পারে ঠিক তেমনি। অন্যান্য শিশুর সঙ্গে খেলাধুলা করলেও কথা বলে খুবই কম। নিতুর জন্ম ২০০৭ সালে। জন্মের তিন মাস পরই নিতু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে নিতুর হাত-পা, মুখ ও শরীরের চামড়া শুকিয়ে ধীরে ধীরে বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে। উদ্বিগ্ন হয়ে বিষয়টি নিয়ে নিতুর বাবা এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আলোচনা করেন। ওই প্রতিবেশী তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেন। এরপর নিতুকে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান তার মা। ওই চিকিৎসক নিতুকে গ্যাস্ট্রিকের কিছু ওষুধ দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই চিকিৎসক নিতুর ভুল চিকিৎসা করেন এবং রাতারাতি তার সব চুল পড়ে যায়। ধীরে ধীরে পড়ে যেতে থাকে তার পায়ের নখ। শরীরের রগগুলো শক্ত হয়ে চামড়ার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। এরপর তারা নিতুকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, নিতু প্রোজেরিয়া নামের এক বিরল রোগে ভুগছে এবং এই রোগে আক্রান্ত হলে শিশুরা দ্রুত বৃদ্ধের মতো হয়ে যায়। পৃথিবীতে প্রতি ৪০ লাখে একজন প্রোজেরিয়া রোগী পাওয়া যায়। এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই এবং এই রোগাক্রান্ত শিশুরা সাধারণত ১৩ বছরের বেশি বাঁচে না। ডাক্তারদের সেই হিসাবমতে, নিতুর হাতে আছে আর একটি বছর। চাইলেও আজীবন মায়ের বুকে ঘুমাতে পারবে না নিতু। বছর খানেকের মধ্যেই মৃত্যু তাকে কেড়ে নেবে মায়ের বুক থেকে, তার আপনজনদের থেকে, তার অদেখা এই সুন্দর পৃথিবী থেকে। বছর খানেক পর থেকে পড়াশোনা করবে না আর নিতু। গাইবে না গান। খেলবে না কোনো খেলা। আঁকবে না সুন্দর পৃথিবীর সুন্দর ছবি। ওপারে ভালো থাকবে মেধাবী নিতু।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]