দিন বাড়ি যায়

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মির্জা গোলাম সারোয়ার

এক পলক প্রতীক্ষা

করিম সাহেব এক সপ্তাহ আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যম সারির কর্মকর্তা ছিলেন। অবসরের পর মনমানসিকতা ভালো না থাকায় এতদিন তিনি বাসা থেকে বের হননি। এ ক্ষেত্রে মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘ ৩৬ বছরের চাকরিজীবনের অনেক সুখ-দুঃখের ঘটনা সবসময় তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি মনে করে তিনি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কখনও হৃদয়ে বেদনা জাগিয়ে চোখ সজল হয়ে ওঠে। এসব দেখে স্ত্রী রেবেকা তাকে বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর জন্য যেতে বলেন। এতে তার মনটা ভালো থাকবে। কিন্তু করিম সাহেব যেতে চান না। কারণ তিনি ভাবেন, চাকরি থাকাকালীন যে সম্মান ও মর্যাদা তিনি পেয়েছেন, এখন যদি তা না পান! কিংবা তাকে যদি অবজ্ঞা বা অবহেলা করা হয়; করুণার চোখে দেখা হয়, তবে তা সহ্য করতে পারবেন না। তিনি শুনেছেন, অবসরের পর মানুষ নাকি বেশি দিন বাঁচে না। কেন বাঁচে না, এখন তা তিনি কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন। এ জন্য তিনি কোথাও না গিয়ে কারও সঙ্গে বেশি কথা না বলে বিষণ্ণ হয়ে একা চুপচাপ থাকেন। একাকিত্বই যেন তার নিত্যসঙ্গী। হাসি-খুশি আর তরতাজা মানুষটা অবসরের পর একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। কথা বলতে ভুলে গিয়ে শুধু ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। স্ত্রী ও সন্তানরা তার এ অবস্থা দেখে বাড়ির বাইরে বেড়ানোর জন্য বারবার অনুরোধ করেন।

অগত্যা করিম সাহেব অবসরের এক মাস পর প্রথম বাড়ি থেকে বের হয়ে বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হন। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল, জানা-অজানা সবাই তাকে করুণা ও অবহেলার চোখে দেখছে। বাসস্ট্যান্ডে এসে তিনি ঠেলাঠেলি করে বাসে ওঠেন। কিন্তু কোনো সিট না পেয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে একপাশের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। বৃদ্ধ বলে মানবিকতা দেখিয়ে কেউ তাকে সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে বলে না। করিম সাহেবের কোমরে ব্যথা। তাই দাঁড়িয়ে থাকতে তার বেশ কষ্ট হয়। তিনি ভাবেন, ছোটকালে তিনি যখন বাসে যেতেন, তখন কোনো বয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি সিট ছেড়ে দিয়ে ডেকে এনে বসাতেন। অন্যরাও তাই করত। কিন্তু এখন যুগ বদলেছে। তার আশপাশে অনেক বালক এবং অল্পবয়স্ক ব্যক্তি বসে থাকলেও তার প্রতি কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।

করিম সাহেব কোমরের ব্যথায় চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ভাবেন, বাসে না চড়ে সিএনজিতেই গেলে তাকে এ ধরনের কষ্টের মধ্যে পড়তে হতো না। হঠাৎ একটি ছেলে এসে আঙ্কেল বলে তার হাত ধরে। করিম সাহেব চোখ খুলতেই অনুমান ১২ বছরের ছেলেটি বলে, আঙ্কেল,  আমার পেছনে আসুন। এই বলে ছেলেটি এক প্রকার জোর করেই তাকে নিয়ে পেছনে  নিয়ে তার সিটে বসায় এবং সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় ছেলেটির দুই চোখে তৃপ্তির ঝিলিক দেখা যায়।

যেসব অল্প বয়সী যুবক বাসে বসে ধূমপান করছিল, লজ্জা পেয়ে তারা হাতে থাকা সিগারেট জানালা দিয়ে ফেলে দেয়। কয়েকটি ছেলে নিজেদের সিট ছেড়ে দিয়ে বাসে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক লোকদের বসতে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই বাসের পরিবেশ পাল্টে যায়। বয়স্ক লোকদের মুখে হাসি দেখা দিয়ে বাসের ভেতর স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকে। করিম সাহেব ভাবেন, এসব পরোপকারী ছেলেই তো ভবিষ্যতে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অনেক তৃপ্তি পেয়ে তিনি চোখ বন্ধ করে থাকেন। বাস এগিয়ে যেতে থাকে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)