পোস্টবক্সের কাল্পনিক চিঠি

০৩ আগস্ট ২০১৯

মীম মিজান

প্রিয় পত্র লেখক ও প্রাপকগণ,

আমি ঝুলে আছি। ছিলাম। হয়তো থাকব না। এই, এই পথটি ধরে যখন গাঁয়ের বালিকা তার দূরান্তে চাকরিরত বাবাকে বার্তা পাঠাতে আসত। আমি দেখতাম কী আবেগের সঙ্গে হলুদ খামটি পুরে দিত আমার জঠরে! অতঃপর একটু চেয়ে থাকত আমার লাল রঙের বহিরাবরণের দিকে। তার চোখ পানে চাইলে আমি দেখতাম চিকচিক করত। মৃদু পায়ে হেঁটে যেত যে পথ ধরে সে এসেছিল।

এক স্বল্পশিক্ষিতা মা। তাকে বছরে বারোবার এই আমার কাছে আসতে দেখতাম। হলুদাভ খামটি আমার মুখ দিয়ে পেটে প্রবেশ করিয়ে কী হাউমাউ করে কাঁদত আমাকে জড়িয়ে! তার চোখ থেকে টপটপ করে পড়া গরম অশ্রু আমাকে করত শিহরিত। আর আমার অভ্যন্তরের হলুদ খামের ভেতরের কালো অক্ষরগুলোর স্নেহ, অনেকদিন পুত্রধনকে না দেখার আকুলতা, পিঠাপুলি বানিয়ে অপেক্ষা করার ব্যাকুলতা আমাকে হিমশীতল করে তুলত। কলেজপড়ুয়া সিরাজুম মুনিরা। আমি তাকে মাসে কমপক্ষে দু'বার আমার সামনে দাঁড়াতে দেখেছি। কী খলখলিয়ে হাসি তার মুখে লেগেই থাকত! তার হাতে বয়ে আনা খামগুলো নীলাভ ছিল। এই নীল খামে ভরে আনত তার রাতজাগা কথাগুলো। তার বাগদত্ত থাকত পাহাড়িয়া বান্দরবানে। সে লিখত, তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আমি বান্দরবানে যাব। শুনেছি সেখানে নাকি বড় বড় পাহাড়। গাছ, জঙ্গলে ভর্তি। কোথাও কোথাও নাকি ঝর্ণা আছে। আমি পাহাড়ের এক ছূড়ায় ছোট্ট একটা চড়ুইভাতি ঘর বানাব। তোমার ওই সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারে আমি থাকব না। তুমি ফিরলে ঝর্ণার জলে স্নান করে খেতে বসব। আমার এই অরণ্য আছে। আমার এই গাছের সঙ্গে বাঁধা দোলনা আছে। আমি গাছেদের সঙ্গে কথা বলি। কবে তুমি আমাকে নিয়ে যাবে মেঘছোঁয়া পাহাড়ের দেশে?

আমি সিরাজুম মুনিরার সেই বুকের কালিতে লেখা পত্রের ওজন বুঝতাম। আমার জঠরকে খুব ভারী মনে হতো তখন।

অশীতিপর এক মানুষ আকরাম হোসেন। হাঁটতেন লাঠি নিয়ে। বয়সের ভারে বেঁকে ছিল কোমর। ঠকঠক শব্দ করে এসে দাঁড়াতেন আমার সামনে, একটি পোস্টকার্ড বের করতেন। খানিক সেই পোস্টকার্ডটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কার্ডটি আমার ভেতরে ফেলে চলে যেতেন। নিজ ভিটাতে একা থাকতেন। উচ্চপদস্থ তনয়ের সুসজ্জিত বাংলোয় বউয়ের কারণে ঠাঁই হয় না। পড়ন্ত কালের দু'মুঠো খাবার ক্রয়ের অর্থের জন্য লিখতে তার আর ভালো লাগত না। আমার স্পষ্ট মনে আছে তার কার্ডের আবশ্যক একটি বাক্য, বাবা আমারও ভালোলাগে না তোর কাছে টাকা চাইতে।

গাঁয়ের পথের সেই বালিকা, স্বল্পশিক্ষিতা মা, বাগদত্তা সিরাজুম মুনিরা আর আকরাম হোসেনের চিঠিভরা খামগুলোর সঙ্গে আরও কিছু খাম জমা হলেই রানার এসে তালা খুলে সযত্নে বের করে নিয়ে আবার তালাবন্দি করত আমাকে। হলুদ, নীলাভ খামের চিঠিগুলো পৌঁছে যেত তাদের প্রাপকের কাছে। নিশ্চয় সেই জমানো কথা, আবেগ, আদর, ব্যাকুলতা, আকুলতা, স্নেহ, প্রেম, দীর্ঘশ্বাস অটুট থাকত পাতায় পাতায়।

আজ আমার শরীর ধুলোময়। মাসান্তেও দেখি না রানারকে আমার তালা খুলতে। এখন নাকি সবার হাতে হাতে পোস্টবক্স। তা দিনের মধ্যে কতবার খোলা হয় সেই পোস্টবক্সের তালা? আর প্রাপক কি বোঝে সেই অনুভূতিগুলো? প্রেরক কি দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ? কাঁদে কি জড়িয়ে ধরে?

তোমাদের আবেগময় হাতের চিঠির অপেক্ষায় একটি জরাজীর্ণ পোস্টবক্স...

বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)