তুমুল গাঢ় সমাচার

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ

ধারাবাহিক

২৩ আগস্ট ২০১৯ | Updated ২২ আগস্ট ২০১৯

বিনায়ক সেন

পর্ব ::২৪

[পূর্ব প্রকাশের পর]


২. রবীন্দ্রনাথের এলিয়ট

টি.এস. এলিয়ট নিয়ে গত এক শতাব্দী ধরে এত লেখালিখি হয়েছে যে, এ নিয়ে বাড়তি কোনো তথ্য বা তত্ত্ব যোগ করা দুরাশা মাত্র। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ যেমন, ইংরেজি কবিতার ক্ষেত্রে এলিয়টও তেমনি। তারপরও এলিয়ট পাঠে কিছু প্রশ্ন দানা বাঁধে যার উত্তর সহজে মেলে না। আমার কাছে প্রশ্নগুলো ধাঁধার মত মনে হয়। এই প্রশ্নগুলোকে তিনটি শিরোনামে বিন্যস্ত করা যায় :

ক. রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু এলিয়ট রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে এত নির্বিকার ছিলেন কেন? তার প্রবন্ধ-সাহিত্যে, এমনকি সম্প্রতি ৩-খণ্ডে প্রকাশিত এলিয়টের সংগৃহীত চিঠিপত্রে কোথাও রবীন্দ্রনাথের কোন উল্লেখ পর্যন্ত নেই। এলিয়ট-সখা এজরা পাউন্ড রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন, পত্রালাপ করেছেন, গিয়ে একাধিকবার সরাসরি দেখা করেছেন, কিন্তু এলিয়ট এত দৃষ্টিকটুভাবে নীরব কেন ছিলেন পূর্বাপর? অথচ দু'জনেই তো ছিলেন কম-বেশি একই পথের পথিক- একত্ববাদী (ইউনিটেরিয়ান) আদর্শে, বিশ্বজনীন চিন্তায় ও পূর্ব-পশ্চিমের যোগসূত্র স্থাপনে তৎপর?

খ. এলিয়ট পরবর্তী জীবনে খ্রিষ্টীয় ধর্মাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন, এ রকম কথা চালু রয়েছে। কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য ধর্ম, ভাষা ও দর্শনের ছাত্র হিসেবে সংস্কৃত ও পালি ভাষায় বেশ কিছুটা দক্ষতা জন্মেছিল তার। পাণিনি-ভতৃহরি পাঠ করেছিলেন তিনি। পতঞ্জলির দর্শন, সাংখ্য, উপনিষদ সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন ছিল তার। বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে তার বাস্তবিক অনুরাগ ছিল। এলিয়টের কবিতায় ও সামগ্রিক দর্শনবোধে প্রাচ্যবিদ্যার প্রভাব কতখানি ফলদায়ী হয়েছিল?

গ. তৃতীয় প্রশ্নটি আধুনিকতার পাশ্চাত্যনির্ভর সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতা নিয়ে। আধুনিক চিত্রকলায় পিকাসোর কিউবিস্ট নিরীক্ষার ওপরে আফ্রিকার চিত্রকলার (মুখোশ ও ভাস্কর্য) প্রভাব সুবিদিত। এমনটাই ঘটেছিল পল ক্লী-র ক্ষেত্রে। এনি এলবার্সের শিল্পকলায় যেমন প্রভাব ফেলেছিল আজটেকদের আর্ট। অর্থাৎ প্রতীচ্যের আধুনিকতার নির্মাণে প্রাচ্যের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। এলিয়টের বা পাউন্ডের কাব্যচর্চায় 'আধুনিকতার' নির্মাণে প্রাচ্যের সরাসরি বা পরোক্ষ অবদানের যে সাক্ষ্য মেলে, তাতে করে কি পাশ্চাত্যনির্ভর আধুনিকতার ইতিহাসকেই পুনর্লিখন করার তাগিদ দেখা দেয় না? তাতে করে ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী যাকে বলেছিলেন, ‘Provincializing Europe’ সে ধরনের তাগিদেরই বাড়তি সমর্থন পাওযা যায় না কি?



রবীন্দ্রনাথের তরফে এলিয়টের প্রতি মনোযোগী উৎসাহের সপক্ষে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত জড়ো করা সম্ভব। সেগুলো সংক্ষেপে একঝলক দেখে নিতে পারি।

১. বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন গদ্য কবিতা বিষয়ে লিখবার জন্য। সেই তাগিদে রবীন্দ্রনাথ লেখেন তার 'গদ্যকাব্য' প্রবন্ধটি, যেটি বুদ্ধদের-সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে (পরবর্তীকালে 'সাহিত্যের স্বরূপ' গ্রন্থে 'কাব্য ও ছন্দ' নামে প্রকাশিত)। এ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুকে রবীন্দ্রনাথ যে পত্র লেখেন তাতে এলিয়টের নাম উঠে আসে :

'গদ্যকাব্য সম্বন্ধে তর্ক না করে যথেচ্ছা লিখে যাওয়াই ভালো। আজ যারা আপত্তি করচে কাল তারা নকল করবে। এলিয়ট প্রমুখ অনেক কবি নির্মিল নিশ্ছন্দ কবিতা লিখে চলেচেন...'

২. কবি বিষুষ্ণ দের 'চোরাবালি' কাব্যগ্রন্থে বিদেশি প্রসঙ্গ- অনুষঙ্গের প্রাবল্য দেখে রবীন্দ্রনাথের অস্বস্তি হয়েছিল। এ নিয়ে কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তার মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। সেখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের Waste Land, Ash-Wednesday, Ariel Poems প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কতটা মনোযোগের সাথে পাঠ করেছিলেন। পুরো উদ্ৃব্দতিটা তুলে ধরছি : '... বিষ্ণু দের লেখার একটা কারণে আমার খটকা লাগে। আমরা য়ুরোপীয় সাহিত্য এক সময়ে গভীর আনন্দ ও অধ্যবসায়ের সঙ্গেই পড়েছিলুম। মনটা তার সঙ্গে ভাবের কারবার করেছিল, কিন্তু বিদেশি নামগুলো স্বভাবতই রচনার মধ্যে এসে পড়ে না। ... ক্রেসিডা গ্রীক পুরাণের তর্জমা থেকে পড়েছি, তার সঙ্গে মনের এত বেশি মাখামাখি হয়নি যে, ভাবের অন্তরঙ্গমহলে যখন তখন আপনি এসে চেনা জায়গা নিতে পারে। এলিয়ট-এর কবিতার ভাষার আত্মীয়মহলে অসঙ্কোচে বিদেশি নামের বা পুরাণের ঢুকে পড়া দেখেছি, তাঁর এই বিশেষত্ব এত স্বকীয় যে, অন্য কারো পক্ষে এটা অনুকরণের সুস্পষ্ট মুদ্রাদোষ হয়ে পড়ে। এ রকম স্খলন যদি দৈবাৎ হয় তবে সেটা নিয়ে লজ্জিত হওয়া প্রত্যাশা করি কিন্তু বার বার যদি হয়, তবে সেটাকে কী বলব? বিশেষত তুলনা করে দেখলে দেখা যাবে যে, দেশীয় পুরাণ থেকে তার কবিতায় নামগুলি পথ পায় না। সহজ বলেই কি?'

এখানে বলা দরকার যে, এলিয়ট তার কবিতার নির্মাণে অন্য সূত্র থেকে (অন্য কবির লেখা, পুরান মহাকাব্য বা দার্শনিক টেক্সটের) বিচ্ছিন্ন লাইন, উপমা, চিত্রকল্প, খণ্ড সংলাপ, বাক্যাংশ প্রায়শ ব্যবহার করতেন। সেসব মৃত লাইন এলিয়টের হাতে ব্যবহূত হয়ে এক নতুন জীবন পেত; কখনো কখনো মূলের অর্থই বদলে যেত; আবার কখনো নতুনের সাহচর্যে এসে পুরাতন ভাবভঙ্গি অপ্রত্যাশিতভাবে আধুনিকতার দ্যোতনা পেত। রবীন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছেন যে, এ কাজটি এলিয়ট অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সম্পাদন করেছেন বলেই এটি তার কাব্যকলার একটি জরুরি প্রকরণ-অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

৩. কবি বিষ্ণু দে এলিয়টের Ariel Poem-এর প্রথম কবিতা ‘Journey of Magi’ অনুবাদ করে 'সংশোধনের জন্য' রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এটির তিনটি পাঠ পাওয়া যায়। বিষ্ণু দের অনুবাদ সংশোধন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন, "ইতিমধ্যে শ্রী বিষ্ণু দে 'পুনশ্চ'-এর নকলে 'এলিয়ট'-এর একটা তর্জ্জমা পাঠিয়াছিল, পড়ে দেখলুম। কমলি ছোড়তি নেই- গদ্যের ঘাড়ে পদ্য কামড়ে ধরেচে।" বিষ্ণু দের নিজের অনুবাদটি রবীন্দ্রনাথের হাতে সংশোধিত হয়ে 'পরিচয়' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর আরেকটি পাঠ পাওয়া যায় কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের 'স্বগত' প্রবন্ধমালার 'কাব্যের মুক্তি' প্রবন্ধে। আর সবশেষ পাঠটি সংকলিত হয় 'পুনশ্চ' কাব্যগ্রন্থে 'তীর্থযাত্রী' শিরোনামে। এই তিনটি পাঠের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য বয়ে গেছে। ধারণা হয় যে, রবীন্দ্রনাথ সে পর্যায়ে (১৯৩০-৩১ সালের কথা হচ্ছে এখানে) বাংলায় গদ্যছন্দের প্রকাশভঙ্গি, সীমা-পরিসীমা নিয়ে অনবরত 'এক্সপেরিমেন্ট' করে চলেছিলেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি এলিয়টের কবিতাকেই বিশেষ করে বেছে নিয়েছিলেন। এর থেকে আধুনিক বাংলা কবিতার গোড়ার পর্বের টালমাটাল পথ চলার ছবিটিও বেশ ফুটে ওঠে। 'জার্নি অব দি মেজাই' কবিতাটির প্রথম স্তবকের তিনটি পাঠ যথাক্রমে নিচে তুলে ধরা হলো। সমগ্র কবিতা ধরলে পাঠান্তরের অমিল আরো বেশি করে চোখে পড়বে।

ক. বিষ্ণু দে-কৃত অনুবাদ :

'আমাদের সে যাত্রা হিমে
বছরের সবচেয়ে খারাপ সময়ে
অভিযান ওরকম দীর্ঘ অভিযান :
পথঘাট কাদায় গভীর ক্ষুরধার হাওয়া
দুর্গম পথ, শীতের চরম।
আর উটগুলি উত্ত্যক্ত, খুরে ঘা, তেরছা মেজাজ
থেকে থেকে শুয়ে পড়ে গলন্ত বরফে।'
খ. বিষ্ণু দে-কে প্রেরিত রবীন্দ্রনাথ-কর্তৃক সংশোধিত পাঠ :
'শীতরুক্ষ আমাদের যাত্রা,
ভ্রমণ দূরদেশের দিকে।
অত দীর্ঘ ভ্রমণের সময় এ তো নয় একেবারেই।
পথ দুর্গম, বাতাস ক্ষুরের মত শান দেওয়া
কনকনে শীত।
উটগুলো হয়রান, পায়ে ক্ষত, বিরক্ত বিমুখ, তারা
গলে-পড়া বরফে শুয়ে শুয়ে পড়ে।'
গ. সুধীন্দ্রনাথের 'কাব্যের মুক্তি' প্রবন্ধে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ-কৃত অনুবাদের উদ্ৃব্দতি :
'কনকনে ঠাণ্ডায় হল আমাদের যাত্রা-
ভ্রমণটা বিষম দীর্ঘ, সময়টা সবচেয়ে খারাপ,
রাস্তা ঘোরালো, ধারালো বাতাসের চোট,
একেবারে দুর্জয় শীত।
উটগুলোর ঘাড়ে ক্ষত, পায়ে ব্যথা মেজাজ চড়া,
তারা শুয়ে শুয়ে পড়ে গলা বরফে।'
ঘ. 'পরিচয়' পত্রিকায় (মাঘ-১৩৩৯), প্রকাশিত [ও 'পুনশ্চ' কাব্যগ্রন্থে 'তীর্থযাত্রী' নামে অন্তর্ভুক্ত] রবীন্দ্রনাথ-কৃত এলিয়টের অনুবাদ :

'কন্‌কন্‌ে ঠাণ্ডায় আমাদের যাত্রা-
ভ্রমণটা বিষম দীর্ঘ, সময়টা সব চেয়ে খারাপ,
রাস্তা ঘোরালো, ধারালো বাতাসের চোট,
একেবারে দুর্জয় শীত।
ঘাড়ে ক্ষত, পায়ে ব্যথা, মেজাজ-চড়া উটগুলো
শুয়ে শুয়ে পড়ে গলা বরফে।'
তবে 'পুনশ্চ' কাব্যে এলিয়টের কবিতা যে 'তীর্থযাত্রী' শিরোনামে অনূদিত হয়ে সমমানে স্থান পেল তা আকস্মিকভাবে ঘটেনি। যে বছর পুনশ্চ প্রকাশ পায়, সে বছরই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত 'পরিচয়' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রবন্ধ 'আধুনিক কাব্য' (১৯৩২)। সেখানে রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রুফ্রক' (১৯১৭) থেকে দীর্ঘ উদ্ৃব্দতি দিচ্ছেন আধুনিক (গদ্য) কবিতার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার জন্য। কোন বিষয়ই আর কবিতার ত্রিসীমার বাইরে থাকছে না- এটি বোঝাতে তিনি এলিয়টকেই বেছে নিয়েছেন। পুরো উদ্ৃব্দতিটি তুলে ধরার দাবি রাখে :

'কেউ সুন্দর, কেউ অসুন্দর; কেউ কাজের, কেউ অকাজের; কিন্তু সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো ছুতোয় কাউকে বাতিল করে দেওয়া অসম্ভব। সাহিত্যে, চিত্রকলাতেও সেইরকম। কোনো রূপের সৃষ্টি যদি হয়ে তাকে তো আর কোনো জবাবদিহি নেই; যদি না হয়ে থাকে, যদি তার সত্তার জোর না থাকে, শুধু থাকে ভাবলালিত্য, তা হলে সেটা বর্জনীয়। এইজন্য আজকের দিনে যে সাহিত্য আধুনিকের ধর্ম মেনেছে, সে সাবেককালের কৌলীন্যের লক্ষণ সাবধানে মিলিয়ে জাত বাঁচিয়ে চলাকে অবজ্ঞা করে, তার বাছবিচার নেই। এলিয়টের কাব্য এইরকম হালের কাব্য, ব্রিজেসের কাব্য তা নয়।'

[ক্রমশ]

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com