আয়নার বন্দি

গল্প

২৩ আগস্ট ২০১৯

আনোয়ারা সৈয়দ হক

হনুমানগুলো এখন পাঁচিলের ওপর পা ঝুলিয়ে সার সার বসে আছে। তারা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে আয়শার শাশুড়ি রাইতুন বিবির দিকে। দুটি হনুমানের কোলে আবার শিশু হনুমান বসে আছে। তারা এতটাই শিশু যে, মায়ের বুকে মুখ লাগিয়ে স্তন্যপান করছে সুযোগ পেলেই। চারপাশে এখন আর কোনো শব্দ নেই। এমনকি গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত যেন স্থির হয়ে ঝুলে আছে ডালে ডালে। একটু আগেই গাছের ডালে ডালে হনুমানদের যে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি চলছিল, সেটাও এখন বন্ধ। এখন প্রায় দুই ডজন হনুমান পাঁচিলের ওপর পাছা ঠেকিয়ে বসে আছে। তারা তাকিয়ে আছে রাইতুনের দিকে। বাতাসে টানটান উত্তেজনা ফেঁপে উঠছে ক্রমশ। যেন আর একটু উত্তেজনা বাড়লেই গ্যাস পোরা বেলুনের মতো তারা ফেটে যাবে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে গ্যাস। আগুন ধরে যাবে। মৃত্যু হবে মানুষের। মৃত্যু না হলেও শ্বাসরুদ্ধ হবে পরিবেশ।

তাদের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে রাইতুন বিবি। তার মুখ ফ্যাকাশে। ঠোঁট কাঁপছে থিরথির করে। দুশ্চিন্তায় শরীরে বিজবিজ করছে ঘাম। আর ঠিক এ সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। রাইতুন বিবির ছেলে সানোয়ার কেশবপুরের বাজারে গেছে গুড় কিনতে। স্বামী মনোয়ার হোসেন যশোর শহরে গেছে মামলার তদবিরে। সময়টা বিকেল। পড়ন্ত রোদে উঠোনের উত্তর দিকে ছায়া ঘনিয়ে আসছে ক্রমশ।

মনে মনে দোয়াদরুদ পড়ছে রাইতুন। হঠাৎ করে এ রকম এক বিপদে পড়বে সে চিন্তা করেনি। অনেক আগে এ রকম এক সমস্যায় পড়েছিল তার ছেলে আনোয়ার হোসেন। তখন সে ছোট ছিল। এখন আনোয়ার বিদেশে থাকে। ছেলেটা তার দুষ্টু ছিল খুব। একবার একটা হনুমানের বাচ্চাকে সে ঘরে আটকে রেখেছিল দুষ্টুমি করে। তখন তার বয়স ছিল বারো বছর। রাইতুন বিবি গিয়েছিল সেদিন তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে ত্রিমোহনী। মনোয়ার হোসেন আর সানোয়ার ছিল বাইরে। মেয়ে লতিফুন্নেসার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সে ছিল শ্বশুরবাড়িতে। এ সময় আনোয়ার অর্থাৎ তার ছোট ছেলের মাথায় দুষ্টুমি চাগিয়ে উঠল।

এদিকে কেশবপুরের হনুমানরা বিখ্যাত মানুষের হাত থেকে, পাত থেকে, রান্নাঘর থেকে, বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাওয়া ফলের ঝুড়ি থেকে খাদ্যদ্রব্য তুলে নিতে থাকে। এমনকি দোকানের ভেতরে ঢুকেও তারা দোকান থেকে বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে ধীরে-সুস্থে বাজারের গাছে লাফ দিয়ে উঠে বসে প্যাকেট খুলে অম্লান মুখে বিস্কুট খায়। আর কেশবপুর বাজারে পাওয়া যায় না কী। হনুমানের নিত্যদিনের উৎপাত সত্ত্বেও প্রতিদিন সকালে কেশবপুরের বাজার গমগম করে তার খাদ্যবস্তুর সম্ভার নিয়ে। কলার কাঁদি ঝুলে থাকে দোকানে। চাল-ডাল, মুগ-মসুর-কলাই থাকে থরে থরে সাজানো। বিস্কুটের প্যাকেট, আলুর চিপসের প্যাকেট, চানাচুরের প্যাকেট- সব ঝুল খায় দড়ি বেঁধে। হনুমানরাও তক্কে তক্কে থাকে। কে তাদের রোখে। আরও তাদের সাহস বেড়েছে যেদিন থেকে এনজিওঅলারা তাদের দেখভাল করছে। তারা কেমন করে যেন বুঝে গেছে কেশবপুরের সমাজে মানুষের বসবাসের যেমন স্থান আছে, তেমনি তাদেরও আছে বেঁচে থাকার অধিকার। আর খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে মানুষের চেয়ে তারা পরিস্কার। সব জিনিসের খোসা ফেলে তারা খায়। এমনকি পেয়ারার খোসাও তারা পেয়ারা খাওয়ার সময় ফেলে দেয়। অবশ্য আরেক দিক থেকে এক হনুমান আরেক হনুমানের মাথার উকুনও খুটে খায়। হয়তো বুঝেসুজেই খায়! তাদের লজিক নিশ্চয় মানুষের লজিক ধরে চলে না।

তো রাইতুনের ছোট ছেলেটা একদিন দুষ্টুমি করে একটা হনুমানের বাচ্চাকে তাদের শোবার ঘরে আটকে রেখেছিল। ভেবেছিল কেউ টের পাবে না। তারপর সে যখন কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে হাত-পা ধুচ্ছে, তখন চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ছয়টি প্রমাণ সাইজের হনুমান। তাদের চোখ লাল। নাকের ছিদ্র বড় বড়। শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। বুকের ওপর হাত দিয়ে থাবা মারছে কেউ কেউ। সেখান থেকে গমগম করে শব্দ উঠছে বাতাসে। একটা হনুমান এগিয়ে এলো আনোয়ারের সামনে। সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠার আগেই তার গালে এসে পড়ল ঠাস করে এক চড়। ভাগ্যিস থাবার নখ বসে যায়নি গালে। তাহলে কুকুরের কামড়ের ইনজেকশন অ্যান্টি-র‌্যাবিস নিতে হতো শরীরে। তারপর থেকে আনোয়ারের দুষ্টুমি বন্ধ। একজন এসে ঘরের দরজা খুলে দিতে লাফ মেরে বেরিয়ে পড়ল হনুমানের বাচ্চা। আর হনুমানের দল বাচ্চাটাকে নিয়ে শোরগোল করতে করতে চলে গেল বাড়ি ছেড়ে।

তা সে অনেক দিনের কথা। সেই আনোয়ার এখন বিদেশে। বিদেশ মানে আবুধাবি। সেখান থেকে সে বাবাকে টাকা পাঠায়। আর সেই টাকা দিয়ে মনোয়ার হোসেন একের পর এক কিনে চলেছে গাঁওগেরামের জমি। জমি কেনার আবার ভেজালও আছে। কিন্তু মনোয়ারের কাছে এসব ভেজাল হলো নস্যি। বরং জমিতে ভেজাল না থাকলেই যেন তার মন খারাপ হয়। তাহলে কোর্ট-কাছারিতে তার যাওয়া-আসা কমে যায়! আদালতে ফাইট করে জমি দখল করার ব্যাপারেই তার যত আনন্দ।

আজও সে যশোর শহরের কাছারিতে গিয়েছে। ফিরতে তার রাত হবে। সানোয়ার গেছে কেশবপুর বাজারে। আজ কিছু মানুষ আসার কথা আছে রাত্তিরে। তারা সানোয়ারের বন্ধুবান্ধব সব। রাতে তারা খাবে। শুধু খাবে না, নতুন বউয়ের মুখও দেখবে সকলে। তাই পড়ন্ত বিকেলে শাশুড়ির নির্দেশ অনুযায়ী আয়শা প্রায় অন্ধকার ঘর থেকে বিয়ের সময় পাওয়া বড় হাত আয়নাটাকে বাড়ির ভেতরের বারান্দার তাকের ওপর রেখে নিজের চুলের পরিচর্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আয়শার মনে ছিল বিষাদ। শরীরে ছিল ক্লান্তি। সদ্য বিবাহিত সে। শাশুড়িকে বলার সাহস হয়নি যে, তার এসব সাজগোজ ভালো লাগে না। বস্তুত মাত্র সতেরো বছর বয়সে সে বিয়েও করতে চায়নি। কিন্তু তার কথা কে শোনে। ফলে আয়শার মাঝে মাঝেই আজকাল মনে হয়, তার জীবন হচ্ছে এক দুঃখের জীবন। দুঃখকে যদি বাটখারা দিয়ে মাপা যেত, তাহলে আয়শা হয়তো দেখত তার দুঃখের বোঝা মণের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে। এ বিয়ে সে করতে চায়নি। এখন সে বিয়েই করতে চায়নি। জীবনকে না চিনে বিয়ে করতে তার আপত্তি ছিল। প্রতিবাদও করেছিল। সে জন্য তার ওপর নেমে এসেছিল অসুরের অত্যাচার। তার কলেজ যাওয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঘরে তালাচাবি দিয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। কিল লাথি ঘুসি মেরে তার মুখ থেঁতলে দিয়েছিল কুদ্দুস মিয়া। বাবা হয়ে নিজের মেয়ের ওপর এ রকম অত্যাচার কে কবে দেখেছে বা শুনেছে? তার মা স্বামীর এ রকম ব্যবহারের প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। স্বামীর লাথি-চড় তো তারও নিত্যদিনের পাওনা। অথচ আয়শার মনের ভেতরে কোথা থেকে যে বড় হওয়ার বীজ এসে গ্রথিত হয়েছিল সে জানে না। একবার খুলনার রেডিওতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অনুষ্ঠান হয়েছিল। আয়শা তার স্কুলের তরফ থেকে সেখানে গিয়েছিল অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। সেখানে অনুষ্ঠান পরিচালক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বড় হয়ে সে কী হবে? আর তার উত্তরে আয়শা বলেছিল, বড় হয়ে সে মাতৃভাষার শিক্ষক হবে। কারণ মাতৃভাষা ছেলেবেলা থেকে ঠিকমতো না শিখলে দেশপ্রেম মনের ভেতরে ভালো করে উপ্ত হয় না।

কে তাকে তার ওই বয়সে এ রকম কথা শিখিয়েছিল সে জানে না। কিন্তু তার মনে আছে তার কথা শুনে পরিচালক খুশি হয়ে বলেছিলেন, আমি আশা করি তোমার এই কথা শুনে আজ থেকে তোমার মতো বয়সের ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে।

কিন্তু আয়শার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। প্রতিবাদ সত্ত্বেও বিয়ে হয়ে গেল তার। সদ্য বিবাহিত আয়শার হাত থেকে এখনও মেহেদির রঙ চলে যায়নি। চুলের খাঁজে এখনও তার আফসানের গুঁড়ো লেগে আছে। চোখের ভাঁজে এখনও এক ধরনের বিমূঢ়তা। এবং কুমারী শরীরে পাকা এবং অভিজ্ঞতালব্ধ পুরুষের হাত পড়লে যে ধরনের শিথিলতার জন্ম হয়, সেটিও পূর্ণমাত্রায় বিরাজমান। কিন্তু তার মনের গভীরে সে একটি চলন্ত বিষাদ।

শাশুড়ির নির্দেশ অনুযায়ী আয়শা নিজের বুদ্ধিতে ঘর থেকে আয়না বের করে বাইরের বারান্দার তাকের ওপর মেলে রেখে ঘরের ভেতরে গিয়েছিল চিরুনি আনতে। তার বেরোতে একটু দেরি হয়েছিল। কারণ সে বুঝে পাচ্ছিল না যে, ঠিক কোন চিরুনিটা চুল আঁচড়াবার জন্য বেশি উপযোগী হবে। এর ফলে তার বাইরে বেরিয়ে আসতে একটু দেরি হয়েছিল। তার শাশুড়ি ছিল রান্নাঘরে। সে তখন চিনির পায়েস রান্না করছিল। এমন সময় আয়শা বাইরে বেরিয়ে দেখে ভেতরের বারান্দায় টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে একটা হনুমান আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। এর আগে এ রকমভাবে কোনো হনুমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে আয়শা দেখেনি, কারণ সে এ গ্রামের মানুষ না। বস্তুত সে কোনো গ্রামেরই মানুষ না, সে যশোর শহরের মেয়ে। তার বাবা ইটখোলায় হিসাবরক্ষকের কাজ করে। আয়শা ভালোভাবে ম্যাট্রিক পাস করে স্থানীয় একটি কলেজে আইএতে ভর্তি হয়ে মাত্র কয়েক মাস পড়েছে, এর ভেতরেই তাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন তার বাবা কুদ্দুস মিয়া।

বিয়ের আগে অনেক কেঁদেছিল আয়শা। বাবার পায়ে পড়ে কেঁদেছিল। কলেজে গিয়ে বন্ধুদের কাছে বসে কেঁদেছিল। ক্লাসের টিচারদের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেছিল। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কেউ না। বরং বাংলা টিচার হায়দার আলি আরও ঠাট্টা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, এখুনই তো বিয়ে করার সুময়রে আয়শা। যৌবন ঢলঢল শরীল এখুন, এখুনি তো শরীলের চাষ দরকার, বুঝলিরে মেয়ে। এইরকুম শরীল কি আর বেশিদিন থাকবেনে রে বোকা। সোয়ামির হাত শরীলে একবার পড়ূক, তখুন টের পাবি দুনিয়া একদিকে আর সোয়ামি আরেকদিকে।

কথাটা সকলের আড়ালে বলে এমন খ্যা খ্যা করে হেসেছিল হায়দার আলি যে, আয়শার হঠাৎ করে নিজেকে লোকটার সামনে ন্যাংটা বলে মনে হয়েছিল। সে চোখ নিচু করে সরে এসেছিল সেখান থেকে। আর তার বাবা কুদ্দুস মিয়া বলেছিল, গঞ্জের এতবড় ব্যবসায়ীর ছেলে, হলোইগে দোজবর, আরেট্টু বয়স বেশি, পুরুষ মানসির শরীলে কি দোজবর লিখা থাকে?

বিয়ের পিঁড়িতে সে বসেছিল অনেকটা টানাহেঁচড়া হয়ে। গায়ে হলুদের দিনও বাবা একটা চড় মেরেছিল তাকে। এরপর অভিমানে বুক ফুলে উঠেছিল তার। ভেবেছিল একবার বাপের বাড়ি ছেড়ে গেলে সে আর কোনোদিন ওখানে ফিরে যাবে না, হলোইবা সেটা তার বাপের বাড়ি।

তো বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আসার আগে একবারও কাঁদেনি আয়শা। যত কান্না তার মা জয়নব বিবি কেঁদেছিল। এতে করে কিছু মানুষ আয়শাকে খারাপ বলেছিল। আয়শা তাদের পাত্তা দেয়নি। তো সেসব কথা এখন পরে। এখন কেশবপুরে তার শ্বশুরবাড়ি। বাড়িটা বাজারের কাছে। ফলে হনুমানদের দৌরাত্ম্য বেশি। বিয়ের পরদিন ভোরবেলা বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘরের দরজা খুলতেই দরজার সামনে একটা হনুমানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল সে। সে ভেবেছিল বুঝি যশোরের তসবির মহলে দেখা কিংকং ছবির গরিলাটা কীভাবে তার শ্বশুরবাড়িতে এসে হাজির হয়েছে! তার চিৎকার শুনে বাড়ির মানুষের ঘুম চটে গিয়েছিল। সানোয়ার লাফ মেরে বিছানায় উঠে বসেছিল। তারপর ধমক দিয়ে বলেছিল- নতুন বউ, এরকুম চ্যাঁচায়ে বাড়ি মাথায় করতিছো ক্যান? হনুমান কোনোদিন চোখে দেখোনি?

না এ রকমভাবে হনুমান কোনোদিন চোখে দেখেনি আয়শা। সে বরং বাঁদর দেখেছে। যশোরের মুরলিতে রাস্তায় রাস্তায় বাঁদরের খেলা দেখেছে। তাদের চেহারা হনুমানের চেয়ে সুন্দর। তাদের অবয়ব ছোট, এত ছোট যে দেখলে আদর করতে ইচ্ছে করে। আর এই হনুমানটার দশাসই চেহারা। মুখ ঝামাপোড়া। চেহারা ভুঁষো কালো। লেজ অতিশয় লম্বা। চোখে লালের ছিটে। আর বড় বড় চোখ। সে চোখে ভালোবাসার চেয়ে যেন ক্রোধ বেশি। অবস্থা দেখে আয়শার মনে হয়েছিল সে যেন শ্বশুরবাড়িতে নয়, হাবিয়া দোজখে এসে হাজির হয়েছে। এ সবই হলো তার পাপের ফল।

তারপর এখন, আজ এই বিকেলে আরেক বিপদ। পড়ন্ত রোদে সে বারান্দার তাকে হাত আয়না রেখে ঘরে ঢুকেছিল চিরুনি আনতে। তারপর বাইরে বেরিয়ে দেখে তার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল চেহারার হনুমান। সে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে তার আয়নায় মুখ দেখছে একেবারে যেন স্তব্ধ হয়ে। তার চারপাশে পাহাড়ের মাথার মতো থমকে থাকা স্তব্ধতা। অবস্থা দেখে আয়শার গলা চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল। এরপর পায়েস রাঁধতে রাঁধতে বেরিয়ে এসেছিল শাশুড়ি। আয়শার চিৎকার শুনে লাফ মেরে হনুমান পাঁচিলের মাথায় উঠে বসেছিল। তারপর মুখের ভেতর দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ বের করতেই যেন চোখের নিমেষে বাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একটার পর একটা হনুমান। ধূসর কালো, প্রাণবন্ত, রাগী, দশাসই শরীর, এনজিও-পুষ্ট হনুমান। আয়শার শাশুড়ি অবস্থা দেখে জোরগলায় বলেছিল, করিছিস কি হতভাগী? আয়না ক্যান বাইরে বের করিছিস? নিশ্চয় আয়নায় নিজেগের মুখ দেখে ওরা ভাবতিছে আমরা ওগের কাউরে ভিতরে বন্দি করে রাখিছি। এমনিতেই আমাগের ওরা ভালো চোখে দেখে না। সেই যে আনোয়ার একবার ওদের বাচ্চারে আটকে রাখিল ঘরে, তারপর থেইকে আমাগের বাড়িটারে ওরা সন্দেহের চোখে দেখে। শিগগির ভিতরে যা।

শাশুড়ির কথা শুনে দ্রুত পায়ে আয়শা চলে এসেছে ঘরে। তারপর থেকে ঘরে বসে সে বুকে হাত দিয়ে খুনখুন করে কাঁদছে। সে কান্নার আওয়াজ বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু কান্নার দমকে আয়শার বুক ফুলে ফুলে উঠছে। আয়শা এখন কী করে। তার শ্বশুরবাড়ি ভরে উঠেছে হনুমান দিয়ে। বাড়িতে শুধু সে আর শাশুড়ি।

রাইতুন বিবির বুকেও কাঁপুনি শুরু হয়েছে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে তারও এ রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল প্রথম প্রথম। সেও ভিন গাঁয়ের মেয়ে হয়ে কেশবপুরে এসেছিল এককালে। হনুমান দেখে, তাদের জীবনযাত্রা দেখে এত বছরে অভ্যস্ত হলেও তারও বুকের ভেতরে কাঁপুনি ওঠে এ রকম দৃশ্য দেখলে।

বউকে ঘরে পাঠিয়ে রাইতুন এখন হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে হনুমানের রাজসভায়। তার ঠোঁট কাঁপছে ভয়ে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখের ভেতরে ভয় ঢুকেছে। শরীরে বিজবিজে ঘাম। তার বাড়িভর্তি ফলের গাছ। এখুনি ইচ্ছে করলে হনুমানগুলো তার বাড়িতে তাণ্ডব শুরু করে দিতে পারে। গাছগুলো মুহূর্তে ফলশূন্য করে দিতে পারে। রান্নাঘরের চুলো থেকে চ্যালাকাঠ নিয়ে বাড়ির চালে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। এমনকি তারা ইচ্ছে করলে সানোয়ারের সদ্য বিবাহিত বউটিকেও পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যেতে পারে। বন্দির বদলে বন্দি। খুনের বদলা খুন।

হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ রাইতুন বিবির মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে শান্ত গলায় জোরে জোরে কথা বলতে লাগল। ওরে, আমরা তোদের কাউরে এখেনে বন্দি করিনি। আয়নায় শুধু মুখ দেখা যায়, কাউরে বন্দি করা যায় না। আয়নায় শুধু নিজের ছবি ওঠে, আর কারও ছবি ওঠে না। এই দ্যাখ, বলতে বলতে রাইতুন বিবি হাতের ঝটকায় দেয়ালের তাক থেকে আয়না টেনে মাটিতে ফেলে দিল। ফ্রেম থেকে আয়না ছুটে গিয়ে খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল মাটিতে। পারদের দিকটা সোজা হয়ে পড়ল। সেদিকে কারও কোনো প্রতিবিম্ব নেই।

এতক্ষণের স্থবিরতার ভেতরে যেন হঠাৎ চাঞ্চল্য দেখা গেল। নড়ে উঠল বাতাস। নড়ে উঠল গাছের পাতা। হনুমানের বাচ্চা দুটো খামচে ধরল তাদের মায়ের বুক। জয়তুন বিবির কাণ্ড দেখে পাঁচিলের মাথা থেকে লাফ মেরে নামল দুটো হনুমান। তারা মতব্বর গোছের হবে। এগিয়ে এলো তারা গদাইলস্করি চালে রাইতুনের কাছে। দেখে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করল রাইতুনের। কিন্তু না, বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। এটাই নিয়ম। আর রাইতুন কি এই জায়গায় কম দিন সংসার ধর্ম করছে?

হনুমান দুটো এসে রাইতুনের পায়ের কাছে দাঁড়াল। ওদের একজন হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করল আয়নার টুকরো। খণ্ডগুলো চ্যাপ্টা হয়ে মাটিতে পড়েছিল বলে সেগুলো আর তুলতে পারল না। তাই পা দিয়ে ঘষে ঘষে দেখল। অনেকক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে দেখল। তারপর যেন সন্তুষ্ট হয়ে নিজেদের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে কিছু অঙ্গভঙ্গি করল। তারপর একজন একজন করে ছেড়ে চলে গেল বাড়ির উঠোন ও পাঁচিল।

দম ফেলে বাঁচল এবার রাইতুন। ঘরে ঢুকে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল, এখুন আর কেঁইদে কী করবি। বিয়ের আয়না ভাঙিছি বলে কেঁইদে কী করবি, জানে বেঁইচে আছিস, তাই ভাগ্যি বলে মানবি। তোরে যে খামচি দেয়নি, তাই ভাগ্যি বলে মেনে নে আয়শা।

এতবড় সান্ত্বনাতেও আয়শার কান্নার বেগ কমল না। বরং তার গতি আরও বাড়ল। সে হাপুশ চোখে এবার কাঁদতে শুরু করল। তার নিজের জীবনের কথা ভেবে কাঁদতে শুরু করল। সে এই বয়সে বিয়ে করতে চায়নি। শিক্ষাকেই সে জীবনে প্রাধান্য দিয়েছিল। নরনারীর দৈহিক সম্পর্ক তার ভেতরে বিবমিষার সৃষ্টি করে যেহেতু সে মনের দিক থেকে এখনও প্রস্তুত নয়। নিজেকে তার বেশ্যার মতো মনে হয়, কারণ যে পুরুষটি রাতের বেলা তার দেহের ওপর হামলে পড়ে, তাকে আঁচড়ে কামড়ে তার শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে ভেতরের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তাকে সে চেনে না। কোনোদিন চেনেনি। কোনোদিন চিনতেও চায়নি। নিজেকে তার একটি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলে মনে হয়। একটি হনুমান আয়নার ভেতরে বন্দি হয়ে আছে, এই সন্দেহে আজ এক হনুমান বাহিনী তার শ্বশুরবাড়িতে চড়াও হয়েছে। তাকে মুক্ত করতে, আয়নার বেষ্টনী থেকে বের করে আনার জন্য জিহাদি মনোভাব নিয়ে বাড়ির সীমানা ঘিরেছে। অথচ আয়শাকে যখন ঘরের ভেতরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, সময়ের পর সময়, তাকে করে রাখা হয়েছিল তার স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন তাকে উদ্ধার করার জন্য হাজির হয়নি কোনো মানব বাহিনী। আয়নার ভেতরে বন্দি তো কোনো হনুমান নয়, আয়নার ভেতরে বন্দি হলো আয়শা বেগম। চিরজীবনের জন্য বন্দি।

আয়শার কান্নার দৈর্ঘ্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বাড়তেই থাকে।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com