জমে উঠেছে অনলাইন কোরবানির হাট

০৬ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০১৯

হাসান জাকির

ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু আসা শুরু হয়েছে হাটগুলোতে। প্রচলিত হাটে গরু-ছাগল বিক্রি এখনও জমে ওঠেনি। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে বেচাবিক্রির ধুম পড়বে। কিন্তু ব্যতিক্রম অনলাইন কোরবানির হাটে। এরই মধ্যে জমে উঠেছে ভার্চুয়াল এ পশুর হাট। এবারের অনলাইন হাটে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। আগে যেখানে গরু বা ছাগলের ছবি দেখে ক্রেতা তার পছন্দের পশুটি কিনে নিতেন; এবার দেখা মিলবে কাঙ্ক্ষিত পশুটির ভিডিওচিত্র। ফলে গরুর আকার, রঙ এবং ধরন নিয়ে গ্রাহকের আর দ্বিধা থাকবে না। তিনি অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গরু-ছাগল কিনে নিতে পারছেন। প্রতিষ্ঠিত অনলাইন মার্কেটপ্লেস ছাড়াও স্বল্প পরিসরে ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা।

প্রক্রিয়াজাত মাংস অনলাইনে বিক্রি করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা 'বেঙ্গল মিট' এবারও ঈদ উপলক্ষে ইন্টারনেটে গরু বিক্রি করছে। বেঙ্গলমিটের কোরবানি (https://qurbani.bengalmeat.com) পোর্টালটিতে সহস্রাধিক গরু রয়েছে। এ হাটে ৬৬ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার মধ্যে মিলছে নানা ধরনের গরু। ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গরু বিক্রি হয়ে গেছে। পোর্টালটিতে মাঝারি দামের গরুর চাহিদা বেশি।

বেঙ্গলমিটের কোরবানি এবং খুচরা বিক্রয় প্রকল্পপ্রধান আসাদুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, আমরা চলতি বছর দারুণ সাড়া পাচ্ছি। অনলাইনে শুধু গরুই বিক্রি করছি না, ক্রেতা চাইলে পুরো কোরবানি ব্যবস্থাপনার কাজটিও করে দিচ্ছি। আমাদের বিশেষত্ব হচ্ছে, আমরা পুরো অর্গানিক (জৈব) উপায়ে পালিত গরু বিক্রি করছি। অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা ওষুধের মাধ্যমে মোটাতাজা হয়েছে, এমন গরু বিক্রি করি না। তিনি জানান, পাবনার কাশিনাথে ১০০ বিঘা জমিতে নিজস্ব খামার রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পাশাপাশি অন্য খামারিদের থেকেও গরু সংগ্রহ করে থাকে বেঙ্গলমিট। গরুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে গরুই আমরা বিক্রি করি না কেন, নূ্যনতম তিন-চার মাস নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখি। অনেক গরু এক বছর বা তার বেশি সময়ও পালন করি।

গরুর নানা তথ্য দিয়ে বেঙ্গলমিটের পোর্টালটির সার্চ অপশনকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। পোর্টাল থেকে ক্রেতা জেনে নিতে পারছেন গরুর বয়স, ওজন, জাত, রঙ, কী ধরনের খাবার খাওয়ানো হয়েছে কিংবা কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি। কেনার পরে হোম ডেলিভারিতে গরুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পশু স্বাস্থ্য সনদও হস্তান্তর করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া সংশ্নিষ্ট গরু কোরবানি দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা হলে তার দায়-দায়িত্বও নিয়ে থাকে বেঙ্গলমিট কর্তৃপক্ষ। এ বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় কোরবানির গরু হোম ডেলিভারি সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ক্রেতা কোরবানির ঝামেলা না নিতে চাইলে সম্পূর্ণ হালাল এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাংস ব্যবস্থাপনা করে ক্রেতার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করছে তারা।

একটি গরুতে মাংসের পরিমাণ সম্পর্কে আসাদুজ্জামান খান বলেন, সাধারণত মাঝারি মানের একটা গরুর মাথা ও পায়ের মতো অঙ্গ বাদে মোট ওজনের ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত মাংস হয়ে থাকে। মাংসের পরিমাণ নিয়ে আমরা ক্রেতাকে আগেই ধারণা দিয়ে থাকি। এটা নিয়ে দ্বিধান্বিত হওয়ার কিছু নেই। আর বেঙ্গলমিটের গরু কিনতে হলে পুরোটাই অনলাইনে নির্ভর করতে হবে। সরাসরি গরু দেখা কিংবা দামাদামির কোনো সুযোগ নেই। গরু পছন্দ হলে অনলাইনে দাম পরিশোধের পাশাপাশি বেঙ্গলমিটের নিজস্ব শপে কিংবা অফিসে গিয়েও দাম দেওয়া যাবে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজ (Daraz.com.bd) এবার দ্বিতীয়বারের মতো তাদের পোর্টালে গরু বিক্রি করছে। দারাজ তার নন্দিনী প্ল্যাটফর্মে 'অ্যাকশন এইডে'র সহায়তায় পালন করা ৮৭টি গরু বিক্রির জন্য তুলেছে।

দারাজ নন্দিনীর প্রজেক্ট লিড সায়ন্তনী ত্বিষা জানান, তাদের প্রতিটি গরু শতভাগ অর্গানিক। গরুগুলো লালন-পালন করেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের নারী উদ্যোক্তারা। কোনো রকম ক্ষতিকারক হরমোন বা স্টেরয়েড ব্যবহার ছাড়াই এদের প্রাকৃতিক খাবারে লালন-পালন করা হয়েছে। পোর্টালটিতে শুধু ছবি নয়, ক্রেতা ভিডিও দেখে গরু কিনতে পারছেন। এখানে প্রদর্শিত গরুগুলোর দাম ৪২ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। তবে মূল্যছাড় ভাউচার এবং ব্যাংক কার্ডে মূল্যছাড় নিতে পারবেন ক্রেতা।

দারাজে আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত গরু অর্ডার করা যাবে। এখানেও বেঙ্গলমিটের মতো দামাদামির সুযোগ নেই। ৯ আগস্ট থেকে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী গরু ডেলিভারি দেবে দারাজ।

অনলাইনে সবচেয়ে বড় গরুর হাট বসিয়েছে ক্লাসিফায়েড মার্কেটপ্লেস বিক্রয় ডট কমে (https://bikroy.com). পোর্টালটি পশু ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই উন্মোচিত। যে কেউ নিবন্ধন করে পোর্টালটিতে পশু যেমন বিক্রি করতে পারবেন, তেমনি কিনতেও পারবেন। তবে বেশি সংখ্যক গরু বিক্রি করতে পোর্টালটির সদস্যপদ নিতে হবে।

বিক্রয় ডটকমের পরিচালক (মার্কেটিং, অ্যাড সেলস ও জবস) ঈশিতা শারমিন সমকালকে বলেন, বিক্রয় ডটকম আক্ষরিক অর্থে অনলাইন পশুর হাটকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের প্ল্যাটফর্মটিতে দেশের যে কোনো অঞ্চল থেকে যে কেউ গরু কেনাবেচা করতে পারছেন। পোর্টালটিতে ৫০ হাজার টাকার কমেও যেমন গরু পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি ১০ লাখ টাকার গরুও মিলছে। এখানে খামার ও গৃহস্থ- দুই ধরনের পশুই রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালে কোরবানির সময় তাদের পাঁচ হাজার ৪২০টি পশুর মধ্যে এক হাজার ৫৪৪টি বিক্রি হয়েছিল। ২০১৮ সালে সাত হাজার ২৪৬টির মধ্যে বিক্রি হয়েছিল দুই হাজার ২৯৩টি পশু। এ বছর ইতিমধ্যে ১০ সহস্রাধিক পশু প্রদর্শিত হয়েছে বিক্রয় ডটকমে, যার মধ্যে তিন সহস্রাধিক বিক্রি হয়ে গেছে। বিক্রির তালিকায় গরু ৬৩ শতাংশ আর ছাগল ৩৭ শতাংশ।

তিনি বলেন, বিক্রয় ডটকম কর্তৃপক্ষ গরু বেচাকেনায় কোনো রকম হস্তক্ষেপ করে না। এখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা নিজেদের মধ্যে দরাদরি করে পশু বেচাকেনা করেন। ফলে পশু কেনাবেচার পুরো দায়দায়িত্ব ক্রেতা-বিক্রেতার নিজেদের। এক্ষেত্রে ক্রেতা প্রতারিত হতে পারেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ঈশিতা শারমিন জানান, আমরা সবসময় ক্রেতাকে নিজে গরু দেখে কেনার পরামর্শ দেই। সম্ভব না হলে বিক্রেতার কাছ থেকে ছবি ও ভিডিও চেয়ে নিতে পারে ক্রেতা। প্রয়োজন মতো দামাদামি করেও নিতে হবে। দরদামের সময় পশুটি কীভাবে ডেলিভারি করা হবে এবং সেটির চার্জ কে দেবে, এসব বিষয়ও আলাপ করে নেওয়া উচিত। প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে পশুটি হাতে বুঝে পাওয়ার পর দাম পরিশোধের পরামর্শ দেন তিনি।

প্রতিষ্ঠিত এ তিনটি অনলাইন পোর্টাল ছাড়াও 'গরু-ছাগলের বিরাট হাট', 'গরু-ছাগলের হাট', 'ক্যাটল শো'- এ রকম নানা নামে ফেসবুক পেজ ও গ্রুপভিত্তিক কোরবানির পশু বেচাকেনা হচ্ছে। এসব পেজ থেকেও চাইলে পছন্দমতো গরু কিনতে পারেন ক্রেতা। তবে এসব গ্রুপ ও পেজ থেকে কোরবানির পশু কিনে প্রতারিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পশু বুঝে পাওয়ার পর দাম পরিশোধের পরামর্শ দিয়েছেন ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠিত পোর্টাল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ছাড়া ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পশু কেনাবেচায় শুধু ক্রেতা নয়, বিক্রেতাকেও সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। না হলে অর্থ এবং পশু দুই-ই খোয়া যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।









© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)