তবু অনন্ত জাগে

লাল গরু

০৬ আগস্ট ২০১৯

মঞ্জুর মোর্শেদ রুমন

একটা দুষ্টচক্র আমাদের যেন চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। প্রতিনিয়ত খুন, ধর্ষণ, নৃশংসতার খবর আমাদের মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছিল। এরই মধ্যে উত্তর থেকে ধেয়ে আসে বন্যা। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বানভাসি লাখো মানুষ এখনও যুদ্ধ করে চলেছে বন্যার জলে। সেই দুর্যোগকেও পেছনে ফেলে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দেখা দেয় ডেঙ্গু। ঢাকা থেকে ইতিমধ্যেই যা ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজারের ওপর মানুষ। আসছে মৃত্যুর খবর। আবার দিন তারিখ মেনে এই দুর্দিনেই হাজির ঈদ। ত্যাগের মহিমা নিয়ে আগত ঈদুল আজহায় মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস পাক এই প্রত্যাশা। আসুন মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াই।

নাম সবুজ। বয়স সাত। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। বয়সের তুলনায় শরীরটা লিকলিকে, রোগা, পাতলা। অভাবী এ সংসারে এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তার ওপর সবুজের একটার পর একটা অসুখ লেগেই আছে। সবুজের বাবা কুদ্দুস আলী আর মা আম্বিয়া বেগমের চিন্তার শেষ নেই। গ্রাম্য কবিরাজ, তাবিজ, কবজও নিয়েছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এ দিকে শহরে যে ভালো ডাক্তার দেখাবে, সে টাকাও নেই।

তিন ভাইবোনের মধ্যে সবুজ ছোট। সবুজদের থাকার জন্য প্রাইমারি স্কুলের উত্তর গেটের পাশে একটা ছোট ঝুপড়ি ঘর। তাও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভেজার মতো অবস্থা। বর্ষাকাল তাদের জন্য মনে হয় অভিশাপ হয়ে আসে। একটু জোরে বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর সব ভিজে একাকার। তখন বেঁচে থাকাটা দায় হয়ে দাঁড়ায়।

সবুজের বাবা কুদ্দুস আলী চাকরি করেন তাদের পাশের গ্রামের বদরুল চৌধুরীর বাড়িতে। বদরুল চৌধুরীকে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ চেনে না যে তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। গ্রামে যে বাড়িটিতে থাকে সেটা ডুপ্লেক্স বাড়ি, শহরে আরও চারটি বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। কুদ্দুস আলীর চাকরি বলতে দৈনদিন বাজার খরচ, গেটম্যানের দায়িত্ব, কোনো কিছু লাগলে তা এনে দেওয়া- এসব টুকিটাকি কাজ। মাস শেষে যা মাইনে পান তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চালান।

ঈদের কয়েক দিন আগে সবুজ তার মাকে জিজ্ঞেস করে, 'মা, ও মা। আমাদের বাড়ির আশপাশের সবাই কোরবানির গরু কেনে। শুধু আমরা কিনি না। কিন্তু কেন? এবার আমরাও কোরবানির গরু কিনব। কোরবানি দেব।'

এ কথা শোনার পর আম্বিয়া বেগম নীরবে চোখের পানি ফেলেন। চোখ মুছে বলেন, 'হ্যাঁ বাবা। এবার আমরাও কোরবানি দেব।'

- তুমি বাবাকে বলবে কিন্তু।

- ঠিক আছে।

রাতে খেতে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে সবুজ বলে,

-বাবা, ইয়া বড় একটা লাল গরু কিনব আমরা! সেটা দিয়ে কোরবানি দেব। নইলে কিন্তু আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাব, আর ফিরে আসব না।

-ছি! বাবা। এসব কথা আর কখনও মুখে আনবে না। দেখিস এবার একটা লাল গরু দিয়ে আমরা কোরবানি দেব। কি, খুশি তো? সবুজ মুচকি হেসে মাথা নাড়াল।

সারাটা রাত শুধু ছেলের কথা ভাবছে আর এপাশ-ওপাশ করছে। ছেলেকে দেওয়া কথা কীভাবে রাখবে সে। যার তিনবেলা খাবার জোটে না তার আবার কোরবানি। কিন্তু এই ছেলেটা যদি তা বুঝত।

দেখতে দেখতে কোরবানির দিন ঘনিয়ে এলো। আর দশ দিন বাকি। সবুজ আবারও তার বাবাকে গরুর কথা মনে করিয়ে দিল। পুত্রের কথা শুনে কুদ্দুস আলী দিশেহারা হয়ে উঠলেন। কীভাবে ছেলেকে বুঝ দেওয়া যায়। অবশেষে একটা উপায় খুঁজে পেলেন। বদরুল চৌধুরী তো প্রতি বছর তিনটি গরু কোরবানি দেন। একটি গরু যদি কয়েক দিনের জন্য তাদের কাছে রাখে, তাহলে কেমন হয়? ভাবতেই মুহূর্তের মধ্যে কুদ্দুস আলীর বিমর্ষ মুখ রাঙা হয়ে ওঠে।

আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। এদিকে কুদ্দুস আলী একমাত্র ছেলে সবুজকে মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত। আর কত? ইতিমধ্যে বদরুল চৌধুরীর তিনটি গরু কেনাও হয়ে গেছে। এদের মধ্যে দুটো লাল, একটি কালো। সকালবেলায় বদরুল সাহেব বের হবেন- এমন সময় কুদ্দুস আলী পেছন থেকে ডাকলেন,

-স্যার।

-পেছনে তাকিয়ে বদরুল সাহেব বললেন, কিরে, কিছু বলবি?

-না, ইয়ে মানে।

-কি, না ইয়ে মানে করতেছস, কিছু বলার থাকলে স্পষ্ট করে বল।

-না মানে, আপনি তো কোরবানির জন্য তিনটি গরু কিনছেন।

-হ্যাঁ, তো?

-একটা লাল গরু যদি আমাকে কয়েক দিনের জন্য দিতেন। আমার অবুজ ছেলের বড় ইচ্ছা এবার লাল গরু দিয়ে কোরবানি করার। আমি ঈদের আগেই আপনার গরু আপনাকে দিয়ে দেব। শুধু...

কথাটা শেষ করার আগেই বদরুল চৌধুরী কুদ্দুস আলীকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল আর বলল,

-আমি প্রতি বছর তিনটে গরু দিয়ে কোরবানি দেই, কিন্তু খাওয়ার লোক নেই। যা, এবার একটা গরু তোর! তোকে এই লাল গরুটি দিয়ে দিলাম।

এ কথা শোনার পর কুদ্দুস আলীও হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। তবে সে কান্না কষ্টের না, আনন্দের। তার অবুঝ ছেলেকে এবার ঈদে অন্তত মিথ্যা বলতে হবে না।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com