বন্যায় নানা রোগ :সতর্ক থাকুন

২১ জুলাই ২০১৯

আব্দুলল্গাহ শাহরিয়ার,সহযোগী অধ্যাপক, শিশু কার্ডিওলজি বিভাগ এনআইসিভিডি, ঢাকা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে পানির নিচে। যত দিন যাচ্ছে দেশের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা আরও বাড়ছে। সারাদেশে চলমান ভারি বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পানীয়জল ও বর্জ্য পদার্থ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ভেঙে চলাচল করছে। বন্যার দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণে এই পানিতে বংশবিস্তার করছে হাজার হাজার রোগজীবাণু। দুর্গতরা আক্রান্ত হয়ে পড়ছে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পেটের বিভিন্ন পীড়াজনিত ডায়ারিয়া, রক্ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারা-টাইফয়েড, ভাইরাল হেপাটাইটিস, কৃমির সংক্রমণ, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতি। কীটপতঙ্গ যেমন- মশা, মাছি বিস্তার লাভ করে এবং এরা রোগ-জীবাণুও ছড়ায়। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে নেওয়া চাই কার্যকর পদক্ষেপ।

বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করুন

বন্যার সময় পানির উৎস সংক্রমিত হয়ে যায়। এ কারণে পানি থেকে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পানি ভালোমতো ফুটিয়ে নিতে হবে।

টিউবওয়েলের পানি পান করা নিরাপদ। তবে টিউবওয়েলের পানি এক ঘণ্টা চেপে ফেলানোর পর তা সংগ্রহ করতে হবে।

বন্যার পানিতে টিউবওয়েল ডুবে গিয়ে থাকলে সেই টিউবওয়েলের পানি খাওয়া নিরাপদ নয়। এ ক্ষেত্রে এক কলস পানিতে তিন-চার চা চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে টিউবওয়েলের ভেতর এই পানি ঢেলে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।

পানি বিশুদ্ধ করার জন্য বাসার পানির ট্যাঙ্কে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতি এক হাজার লিটার পানিতে ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার এক ঘণ্টা রাখলে পানি বিশুদ্ধ হবে। এ ক্ষেত্রেও জীবাণু ধ্বংস হবে না।

ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়

বন্যায় প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়রিয়া। ডায়রিয়া প্রতিরোধের জন্য খাবার আগে সাবান দিয়ে নিরাপদ পানির সাহায্যে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। পায়খানা করার পরে হাত একইভাবে পরিস্কার করতে হবে। স্যানিটারি পায়খানা পায়খানা ব্যবহার করতে হবে। ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা শুরু হলে পরিমাণমতো খাবার স্যালাইন খেতে হবে। দুই বছরের কম শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-১২ চা চামচ খাবার স্যালাইন দিতে হবে। দুই থেকে ১০ বছরের শিশুকে দিতে হবে ২০ থেকে ৪০ চা চামচ। ১০ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে যতটা বেশি দেওয়া যায়। খাবার স্যালাইন বা ওআরএস না থাকলে বিকল্প হিসেবে বাড়িতে প্রস্তুতকৃত লবণ-গুড়ের শরবত খাওয়াতে হবে। এর সঙ্গে ভাতের মাঁড়, চিঁড়ার পানি, ডাবের পানি, কিছু পাওয়া না গেলে শুধু নিরাপদ পানি খাওয়ানো যেতে পারে। প্রতি শিশুকে এ সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো যেতে পারে। যদি পাতলা পায়খানা ও বমির মাত্রা বেড়ে যায় এবং শিশুর পানিশূন্যতার ভাব দেখা যায়, তাহলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে রোগীর শিরাপথে স্যালাইনের প্রয়োজন হতে পারে।

খাবার গ্রহণে সতর্কতা

বন্যায় পচা-বাসি খাবার খেতে বাধ্য হয় অসংখ্য মানুষ। এর ফলে ছড়িয়ে পড়ে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য আন্ত্রিক রোগ। কিন্তু এ সময়ে খাবার গ্রহণে সতর্ক হতে হবে। বাসি-পচা খাবার খাওয়া যাবে না। এ সময় খিচুড়ি খাওয়া স্বাস্থ্য উপযোগী। খাবার প্লেট সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এ কথা সত্যি যে, বন্যায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ায় প্লেট বা থালাবাসন বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ঠিকমতো ধোয়া হয় না। এটা ঠিক নয়।

মলত্যাগে সতর্ক হতে হবে

বন্যার সময় যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করা চলবে না। যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করার ফলে পেটের পীড়া তো রয়েছেই, উপরন্তু কৃমির সংক্রমণ বেড়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট স্থানে মলত্যাগ করতে হবে এবং মলত্যাগের পরে সাবান বা ছাই দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। মলত্যাগের সময় কখনও খালি পায়ে থাকা চলবে না, কৃমি খালি পায়ের পাতার ভেতর দিয়ে শরীরে সংক্রমিত হয়। এ সময় বাসার সবাইকে কৃমির ওষুধ খেতে হবে। দুই বছর বয়সের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

আকস্মিক দুর্ঘটনা থেকে সাবধান থাকতে হবে

বন্যার কারণে যেমন রোগের বিস্তার বৃদ্ধি পায়, তেমনি দেখা দেয় আকস্মিক দুর্ঘটনা। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কতার মাধ্যমে এসব দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। বন্যায় সাধারণত বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া, সাপ ও পোকামাকড়ের কামড়ের ঘটনাগুলো বেশি ঘটে।

বন্যায় পানির নিচে বহু টাওয়ার, খুঁটি, ট্রান্সফরমার লাইনের তার ডুবে যায়। তাই বৈদ্যুতিক লাইনের নিচ দিয়ে নৌকা বা ভেলা চালানো যাবে না অথবা বিদ্যুতের টাওয়ার, খুঁটি, তার বা ট্রান্সফরমার স্পর্শ করা যাবে না। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা পড়ে থাকতে দেখলে তা স্পর্শ না করে বিদ্যুৎকর্মীদের জরুরিভাবে খবর দিতে হবে। বৈদ্যুতিক লাইনের তার কোথাও পানির কাছাকাছি দেখামাত্র সেখান থেকে দূরে সরে যেতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ বিদ্যুৎ অফিসে খবর দিতে হবে। বন্যার সময় আমাদের দেশে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। যাদের বিষধর সাপ কামড়ায় তাদের অর্ধেকের শরীরেই বিষ প্রবেশ না করার কারণে বিষক্রিয়ার কোনো লক্ষণ থাকে না। বিষধর সাপের কামড় সন্দেহ করলে কামড়ের ওপরের অংশে ভাঁজ করা কাপড় কিংবা সরু ফাঁপা রাবারের নল দিয়ে দ্রুত বেঁধে দিতে হবে। ক্ষতস্থান দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্কার করে কিছুটা রক্ত বের করে দিতে হবে। রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিতে হবে।

শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের প্রতি বিশেষ নজর

বন্যার সময় শিশু বা বৃদ্ধ মানুষের সামান্য পানিতে ডুবে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। কেউ পানিতে ডুবে গেলে প্রথমেই নাক, মুখ ও গলা পরিস্কার করতে হবে। সাহায্যকারী ব্যক্তির মুখ থেকে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির মুখে শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে শ্বাস ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে মুখ থেকে মুখে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।

বন্যাদুর্গতদের পুষ্টি ঘাটতি এড়ানোর জন্য যথাযথ খাবার সরবরাহ করতে হবে। এ সময় শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যার সময় কারও কারও মানসিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবার সহমর্মিতা একান্ত প্রয়োজন। বন্যাদুর্গত এলাকায় স্বাভাবিক টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো রোগব্যাধি বিস্তার লাভ করার আগেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]