শিক্ষকদের যৌন কেলেঙ্কারি

নারায়ণগঞ্জে কন্যাসন্তান নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

০৭ জুলাই ২০১৯

এমএ খান মিঠু, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক স্কুলশিক্ষক ও এক মাদ্রাসা শিক্ষকের একাধিক শিশু শিক্ষার্থীর সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর অভিভাবক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শিক্ষকদের এমন বিকৃত যৌনাচারের ঘটনায় অভিভাবকরা, বিশেষ করে কন্যাসন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। স্কুলে পাঠিয়ে মেয়ে বাসায় না ফেরা পর্যন্ত কাটছে ভয়-শঙ্কায়। অনেক অভিভাবকই এখন তাদের কন্যাকে কোচিংয়ে একা যেতে দিচ্ছেন না, বা বসে থেকে মেয়েকে পড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ মেয়ের কোচিং বন্ধ করে দিয়েছেন। এদিকে এ ধরনের ঘটনা রোধে অভিভাবকদের সচেতন থাকার অনুরোধের পাশাপাশি নানা উদ্যোগ নিচ্ছে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের প্রেস উইংয়ের প্রধান সাজ্জাদ রুমন বলেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে পুলিশ স্কুল-কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সুসম্পর্ক তৈরির প্রতি জোর দিয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থী বিশেষ করে মেয়েদের বলা হয়েছে, এ ধরনের কোনো ঘটনার আঁচ পেলে বা স্কুুল অথবা মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক যদি কোনো ছাত্রীকে অনৈতিক কোনো সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আকার-ইঙ্গিতও দেয়, তাহলে তারা যেন সঙ্গে সঙ্গে থানায় অথবা জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯'-এ ফোন করে বিষয়টি জানায়। তাহলে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।

গত ২৭ জুন সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজির অক্সফোর্ড হাই স্কুলের ২০ জনের বেশি ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করা শিক্ষক আরিফুল ইসলাম আরিফ আটক হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বিষয়টি। আরিফকে গ্রেফতারের পর তার জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। কীভাবে সে একের পর এক ছাত্রীকে তার লালসার শিকারে পরিণত করেছে, তা জানার পর র‌্যাবের কর্মকর্তারাও হতবাক হয়ে যান।

ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ৪ জুন ফতুল্লার মাহমুদনগর এলাকার বাইতুল হুদা প্রি-ক্যাডেট মাদ্রাসার কোমলমতি ১২ শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতারের পর সেও কোমলমতি ছাত্রীদের সঙ্গে বিকৃত যৌন আচরণের বিষয়টি স্বীকার করে।

র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই শিক্ষক মাদ্রাসার ১০ থেকে ১২ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগসহ তার মোবাইলফোন ও কম্পিউটারে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে।

এর বাইরেও মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শ্নীলতাহানি এবং বলাৎকারের মতো ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের আরও কয়েকটি মাদ্রাসায়। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। নিরাপদ স্কুল-মাদ্রাসা খুঁজছেন তারা।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও মানবাধিকার কর্মী বিল্লাল হোসেন রবিন বলেন, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লায় দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহু ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর অভিভাবক হিসেবে আমরা উদ্বিগ্ন। না জানি কত স্কুল-মাদ্রাসায় এমন ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের সন্তানরা

ভয়ে বা লজ্জায় আমাদের কাছে বলে না। এখন কিসের ভরসায় সন্তানদের স্কুল-মাদ্রাসা বা কোচিং সেন্টারে পাঠাব? তিনি বলেন, শিক্ষক যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে তো এটা ভয়ঙ্কর বিষয়। এর থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে। না হলে স্কুল-কলেজে অনেক মেয়ের জীবন কলঙ্কিত হবে।

সমাজকর্মী সালেহা বেগম মনে করেন, সামাজিক মূল্যবোধ একেবারে শেষ হয়ে গেছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের চেয়ে শিশুরা এখন বেশি হয়রানির শিকার হওয়ার কারণ হিসেবে সালেহা বেগম বলেন, শিশুরা চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারে না। তাদের সহজেই চকলেটের প্রলোভনে অথবা ভয়ে ঘাবড়ে দেওয়া যায়। এ জন্য বিকারগ্রস্তরা শিশুদের টার্গেট করছে। তিনি বলেন, প্রতিটি স্কুুল-মাদ্রাসায় সরকারিভাবে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। নজরদারি বাড়ানো উচিত স্কুল, প্রাইভেট টিচার ও কোচিং সেন্টারগুলোতে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ কমানো সম্ভব।

শিক্ষকদের যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, অক্সফোর্ড স্কুলে যে ঘটনাটা ঘটেছে, তাতে আমার প্রাণের সম্পদ, কলিজার টুকরাদের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে শিক্ষক নামে কুলাঙ্গার।

© সমকাল 2005 - 2020

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]