ডালেতে লরিচরি বৈও চাতকি ময়না রে...

০৭ জুলাই ২০১৯

নাসির উদ্দিন হায়দার

আস্কর আলী পণ্ডিতের পুঁথি 'বর্গ সাস্ত্র'-এর পাণ্ডুলিপি

'কি জ্বালা দি গেলা মোরে

নয়নের কাজল পরানর বন্ধুরে

ন দেখিলে পরান পোড়ে'।

'কি জ্বালা দি গেলা মোরে' বাংলা লোকসঙ্গীতের অবস্মরণীয় একটি গান। এই গানের রচয়িতা পটিয়ার আস্কর আলী পণ্ডিত। লোকসঙ্গীতের ধারায় আধাত্ম্য চেতনাপুষ্ট তার আরেকটি তুমুল জনপ্রিয় গান হলো...

ডালেতে লরিচরি বৈও চাতকি ময়নারে

গাইলে বৈরাগীর গিত গাইও,

ওরে চাতকি ময়না অঙ্গ তোর কালা,

তোমার মনে আমার মনে

(তোর মনে আর আঁর মনে)

একই প্রেমের জ্বালা।

এই গান শুনেনি এই বাংলায় এমন কে আছে? (গানগুলোর মূল শিল্পী শেফালী ঘোষ ও তপন চৌধুরী।) ভাবতে অবাক লাগে, পটিয়ার শোভনদণ্ডী মোকামের গীত ও বৈরাগী, আস্কর আলী পণ্ডিত (১৮৪৬-১৯২৭) যার নাম সেই মেটো গায়কের গান দেড়শ' বছর বেঁচে আছে, এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, এ কি সহজ কথা! আস্কর আলী পণ্ডিতের গানের স্বরলিপি আছে বলে জানা যায় না, ষাট বা সত্তর দশকের আগে এই শিল্পীর গান বেতার ও টেলিভিশন বা গ্রামোফোন ডিস্কে রেকর্ড হয়েছে বলেও অকাট্য প্রমাণ মেলে না। কেবল প্রজন্ম পরম্পরায় প্রধানত মেটো গায়কদের কণ্ঠে প্রায় দেড়শ' বছর ধরে গীত হয়ে আসছে তার গান! তাহলে সহজেই অনুমেয়, আস্কর আলী পণ্ডিতের সৃষ্টির শেকড় বাঙালিয়ানার কতটা গভীরে প্রোথিত।

স্মর্তব্য যে, বিংশ শতাব্দীর '৭০-এর দশক পর্যন্ত আস্কর আলীর গান প্রধানত গীত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলেই, নির্দিষ্ট করে বললে আস্কর আলীর জন্মগ্রাম ও সন্নিহিত অঞ্চলেই। সত্তরের দশকে আবদুল গফুর হালী (১৯২৯ ও ২০১৬) নামক আরেকজন মেটোগায়ক, পরবর্তীতে চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তি) শিল্পী শেফালী ঘোষ ও কল্যাণী ঘোষের কণ্ঠে প্রথম আস্কর আলী পণ্ডিতের গান তুলে দেন এবং পরে তা গ্রামোফোন রেকর্ডে বের করেন। এরপর আস্কর আলী পণ্ডিতের গান চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ কথা আমার নয়, বরেণ্য শিল্পী সঞ্জিত আচার্য্যের। প্রসঙ্গত, সঞ্জিত আচার্য্য ও কল্যাণী ঘোষ আঞ্চলিক গানের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি এবং এই গানের স্বর্ণযুগের সারথি।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কল্যাণী ঘোষ অনেকবার বলেছেন, 'শুধু আস্কর আলী পণ্ডিত নন, মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, রমেশ শীল, খায়েরজ্জামা পণ্ডিত, সেকান্দর পণ্ডিতসহ চট্টগ্রামের কিংবদন্তি শিল্পীর গান প্রচারে আবদুল গফুর হালীর অবদান অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ ৫০ বছর বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে অর্থাৎ বেতার, গ্রামোফোন রেকর্ড বা ক্যাসেটে উল্লিখিত এসব কিংবদন্তি শিল্পীর গান শেফালী ঘোষসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন গফুর হালী। কল্যাণী বলেন, 'আস্কর আলী পণ্ডিতের গান প্রথম আমাকেই শিখিয়েছেন গফুরদা। পরে শেফালী দিদিকেও শেখান। সেসব গান গ্রামোফোন রেকর্ড ও ক্যাসেটে তুমুল জনপ্রিয় হয়। একটা ক্যাসেটে ১০টি গান লাগে। গফুরদা নিজের গান দিতেন দুটি। সাথে আস্কর আলীর দুটি, রমেশ শীলের দুটি, মওলানা হাদীর দুটি বা মোহাম্মদ নাসিরের দুটি, এভাবে গান দিতেন। পরর্বতী প্রজন্মের শিল্পী সেলিম নিজামী, শিমুল শীলদের কণ্ঠেও আস্কর আলীর দুর্লভ অনেক গান তুলে দিয়েছেন তিনি। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, গফুর হালীর মাধ্যমেই আমরা শিল্পী আস্কর আলী পণ্ডিতকে চিনেছি, গফুর হালীই তার গান পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছেন, এটা পরম সত্য।'

আবদুল গফুর হালী মূলত আস্কর আলী পণ্ডিতেরই ভাবশিষ্য, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা আস্কর আলীরই পাশের গ্রাম রসিদাবাদে। গফুর হালী পরবর্তীতে বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারায় চাটগাঁইয়া গানে 'নবযুগের স্রষ্টা' হিসাবে খ্যাতিমান হয়েছেন। গফুর হালী টানা ৫০ বছর (১৯৬০-২০১০) আস্কর আলী পণ্ডিতের গান প্রচার করেছেন। তাতে আস্কর আলীর সঙ্গীতপ্রতিভা নতুন করে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছে। গফুর হালী এই দীর্ঘ সময়ে শেফালী ঘোষ, সঞ্জিত আচার্য্য, কল্যাণী ঘোষ, কল্পনা লালা, সেলিম নিজামী, শিমুল শীল ও হৃদয় খানের মতো শিল্পীর কণ্ঠে আস্কর আলী পণ্ডিতের গান তুলে দিয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ ২০১০ সালেও তিনি তারকা শিল্পী হৃদয় খান ও পান্নার কণ্ঠে আস্কর আলী পণ্ডিতের 'কি জ্বালা দি গেলা' (মূল শিল্পীও শেফালী ঘোষ) গানটি তুলে দেন। হৃদয় খানের কণ্ঠে নতুন প্রজন্মের কাছে গানটি দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে।

সাহিত্য বিচারে আস্কর আলী পণ্ডিত একজন লোককবি। তবে কালের প্রবাহে কবিত্ব ছাড়িয়ে তার সাংগীতিক পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছে। তার গান বাংলা লোকসঙ্গীতের অমূল্য সম্পদ। আসলেই আস্কর আলী পণ্ডিত একজন কালোত্তীর্ণ সঙ্গীত প্রতিভা। আমরা তাকে চাটগাঁইয়া গানের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কারণ ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর চাটগাঁইয়া সঙ্গীতের দিকপাল রমেশ শীলসহ অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর গানে আস্কর আলী পণ্ডিতের প্রভাব সুগভীর। তবে আনোয়ারা উপজেলার ঊষখাইন গ্রামের মহান আধ্যাত্মিক সাধক, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ সৈয়দ আলী রেজা প্রকাশ কানু শাহই (১৭৫৯-১৮৩৭) হলেন চাটগাঁইয়া সঙ্গীতের মহত্তম প্রতিভূ।

কানু শাহ'র একটি পদ স্মরণযোগ্য...

গীত যন্ত্র মহামন্ত্র, বৈরাগীরও কাম

তাল যন্ত্র মহামন্ত্র, প্রভুর নিজ নাম।

(জ্ঞানসাগর ও কানু শাহ)

বিগত ২০০ বছরে কানু শাহ'র এই দর্শন (তালযন্ত্র মহামন্ত্র, প্রভুর নিজ নাম) তার উত্তরসূরি সাধক ও শিল্পী আস্কর আলী পণ্ডিত, মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, খায়েরজ্জামা পণ্ডিত, রমেশ শীল ও আবদুল গফুর হালীর সাহিত্য ও সঙ্গীতে অতি দৃশ্যমান। কানু শাহ বলেন, 'গীতযন্ত্র বৈরাগীরও কাম'। আর আস্কর আলী বলেন, 'গাইলে বৈরাগীর গীত গাইও...।'

এবার আস্কর আলী পণ্ডিতের সুরসাগরে ডুব দেওয়া যাক।

আস্কর আলী পণ্ডিতের কাব্য ও গানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব সুগভীর। তার কাব্যগাথার পরতে পরতে আঞ্চলিক শব্দের বিচিত্র প্রয়োগ দৃশ্যমান। আবার আস্কর আলীর অনেক গান প্রায় আঞ্চলিক ভাষায় রচিত, সে হিসেবে এগুলোকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান বলা যায়। আর তাই যদি হয়, আস্কর আলী পণ্ডিত আঞ্চলিক গানের একজন পথিকৃৎ রূপকার। আঞ্চলিক ও সাধন সঙ্গীতের ধারায় কবিয়াল সম্রাট রমেশ শীল, খায়েরজ্জামা পণ্ডিত, মোহাম্মদ নাসির, এমএন আখতার ও আবদুল গফুর হালীর গানে আস্কর আলীর প্রভাব লÿণীয়।

ফকির লালন সাঁই, হাসন রাজাদের সমসাময়িক আস্কর আলী পণ্ডিতের সৃষ্টি বিপুল। কিন্তু মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরও আস্কর আলীর প্রতিভা ও তার সৃষ্টির প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি। সংরক্ষণের অভাবে তার সৃষ্টির অনেকটাই হারিয়ে গেছে। অবশ্য বাংলা একাডেমিতে তার কাব্য 'জ্ঞানচৌতিসা' সংরক্ষিত রয়েছে। সাহিত্যিক আহমদ ছফা আস্কর আলীর গান সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি কয়েকশ' গান সংগ্রহও করেছিলন। সাহিত্যপত্র বলাকা সম্পাদক শরীফা বুলবুলকে ১৯৯৭ সালে লেখা এক চিঠিতে আস্কর আলীকে নিয়ে কিছু একটা করার আকুতি জানিয়েছিলেন ছফা। তিনি লিখেছেন, '...পরিশেষে তোমাকে শোভনদণ্ডী গ্রামের আস্কর আলী পণ্ডিতের গানগুলোর প্রতি একটু যত্নবান হওয়ার অনুরোধ করব। আস্কর আলীর গান এখন নানা গায়কের কণ্ঠে রেডিও, টিভি এবং ক্যাসেটে প্রায়ই শোনা যায়। অথচ আস্কর আলী কত বড় গীতিকার, মূল্যায়নের কোনো প্রয়াসই গ্রহণ করা হয়নি। আস্কর আলীর সুরের এক বিশেষ মাদকতা এবং দাহিকাশক্তি আছে। এই জিনিস বাংলা গানের এক বিশেষ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। আমি তো তাকে সিলেটের হাছন রাজার মতো বড়ো ভাবুক এবং গীতিকার মনে করি।'

আহমদ ছফার মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় আস্কর আলী আসলে কত বড় একজন শিল্পী।

প্রসঙ্গত, লেখক ও গবেষক শামসুল আরেফীন আস্কর আলী পণ্ডিতের ওপর জ্ঞানগর্ভ কাজ করেছেন। আরেফীন গত দেড় দশক ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও 'আস্কর আলী পণ্ডিত : একটি বিলুপ্ত অধ্যায়' নামে উঁচু দরের একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাতে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন এই লোককবি। আমি মনে করি, আস্কর আলী অধ্যয়নে আরেফীনের 'আস্কর আলী পণ্ডিত : একটি বিলুপ্ত অধ্যায়' অবশ্য পাঠ্যগ্রন্থ।

আস্কর আলীর জন্ম ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। পটিয়ার শোভনদণ্ডী গ্রামে ছিল তার বসতি। পিতার নাম মোসরফ আলী। ১৯২৭ সালে আস্কর আলী পণ্ডিত মৃত্যুবরণ করেন। 'জ্ঞানচৌতিসা' কাব্যে আস্কর আলী তার জীবনবৃত্তান্ত উল্লেখ করেছেন এভাবে,

তথা হিন মুই দিন আস্কর আলি নাম।

দুঃখের বসতি এই শোভনদণ্ডী গ্রাম

(জ্ঞানচৌতিসা, পৃষ্ঠা-৫।)

একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, কাব্যে কবি তার নাম আস্কর 'আলি' লিখলেও পরে তা হয়ে গেছে 'আলী'। আস্কর আলীর শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তার সৃষ্টি বিশ্নেষণ করলে নিশ্চিত ধারণা জন্মে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। আস্করের বিষয় ও সম্পত্তি ভালোই ছিল, দেড় দ্রোণ জমিতে হালচাষ করতেন। কবিরাজি চিকিৎসা আর দলিল লিখেও তিনি আয় করতেন। সুতরাং তার বৈষয়িক অবস্থা মন্দ ছিল না। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়, ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি গ্রামে কাব্যপ্রতিভা দেখানো, গান-বাজনা করা তখনকার সময়ে সহজ কাজ ছিল না। তথাপি তিনি তাই করেছেন। এর অন্তর্নিহিত শক্তি হয়তো তিনি পেয়েছিলেন তার গুরু ও মুর্শিদের কাছ থেকে। মুর্শিদের নাম-পরিচয় তিনি নিজেই বয়ান করেছেন তার গানে।

চট্টগ্রামে সুপ্রধান, সংসারের মান্যমান

শ্রীযুক্ত মওলানা ফজল রহমান

পটিয়ার অ ন্তপাতি সাতবাড়িয়া গ্রাম স্থান

এই ফজল রহমান হলেন চন্দনাইশের সাতবাড়িয়া এলাকার পীর। তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর খলিফা ছিলেন। ভক্তরা তাকে হাফেজ শাহ বা হাফেজ বাহাদুর নামে ডাকতেন। আর আস্কর আলী পণ্ডিত 'হাফেজ বাহাদুর' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তিনি পীরের দরবারে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং রাতভর ভক্ত ও শিষ্যদের নিয়ে গান-বাজনা করতেন।

এই পর্যায়ে আস্কর আলী পণ্ডিতের সাহিত্য কীর্তি উল্লেখ করা যায়। তার সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে তিনটি কাব্য, ছয়টি সঙ্গীতের সংকলন।

পঞ্চসতী প্যারাজান (অপূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক, প্রকাশকাল ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান-অজ্ঞাত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪৮। বিষয় : প্যারজান ও দিদারের প্রণয় কাহিনি।

জ্ঞানচৌতিসা (অপূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক-বাচা মিঞা সওদাগর ও আবদুল রসিদ। প্রকাশকাল ১৯৫১। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অজ্ঞাত। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৪৬। বিষয়ও জ্ঞান ও চৌতিসা কন্যার প্রণয় কাহিনি।

বর্গ সাস্ত্র বা মাত্রিওভাষা (অপূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক শ্রীযুক্ত মিঞা আবদুল হাদী। প্রকাশকালও ১৯১৪। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানওপটিয়া গোবীন্দ প্রেস। পৃষ্ঠা সংখ্যাও২৩।

নন্দবিলাস (অপূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক, প্রকাশকাল ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানওঅজ্ঞাত। পৃষ্ঠা সংখ্যাও৪

নন্দবেহার :প্রথম ভাগ (অপূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক, প্রকাশকাল ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানওঅজ্ঞাত। পৃষ্ঠা সংখ্যাও১০।

গীত বার মাস, দ্বিতীয় ভাগ (পূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক : আবদুল হাদি, প্রকাশকালও১৯০৭। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানওচট্টগ্রাম ভারতী প্রেস। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৬।

হাফেজ বাহাদুর। গীত বারমাস ও কবিতা : প্রথম ভাগ (পূর্ণাঙ্গ)। প্রকাশক ও প্রকাশকালওঅজ্ঞাত। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানওসাঙ্গুভ্যালি প্রিন্টিং ওয়ার্কস, রেঙ্গুন, ৩১৩৩ও২৭। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৮

এর মধ্যে 'পঞ্চসতী প্যারজান, জ্ঞানচৌতিসা, হাদীস বাণী 'এই তিনটি কাব্য। 'নন্দবিলাস, নন্দসাগর, গীত বারমাস (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ), হাফেজ বাহাদুর (প্রথম থেকে চতুর্থ ভাগ), নন্দবেহার, বর্গ সাস্ত্র বা মাত্রিওভাষা' মূলত গানের সংকলন। (সূত্রওআস্কর আলী পওিত : একটি বিলুপ্ত অধ্যায়, শামসুল আরেফীন)

আস্কর আলী পওিতের কাব্যে বারমাসি ও পুঁথির সুবাস আছে। আর সংগীতে আছে লোকজ ঐতিহ্যের চিরায়ত রূপ। আসলে আস্কর আলী ছিলেন একজন ভাবুক কবি, যিনি আবার সুফীমতে মত্ত। তিনি মাইজভাওারী তরিকা বা লোকধর্মের অনুসারী হলেও তার গান শুধু গুরল্ফম্ন প্রশস্টিত্মমূলক নয়, ঐশীপ্রেমে ভরপুর।

আস্কর আলীর আধ্যাত্মচেতনাপুষ্ট একটা সাধনওসংগীত হলো...

বসি রইলি ও মন কার আশে

রঙের বাজার ভাঙ্গি যাইব চোখের নিমিষে।

তেল থাকিতে বাত্তিরে নিভে কাল তুফানের বাতাসে

গুরল্ফম্নপদ ধরি হীন আস্কর আলী কয়

সময়ে না করলে সাধন অসময় কি হয়

নাইয়রত্তুন নাস্টত্মা নিলে স্বামীয়ে ভালবাসে

এই গান বিশেস্নষণ করলে বোঝা যায় কতটা ঐশীপ্রেমে মশগুল ছিলেন আস্কর আলী। অবুঝ মনকে তিনি মনে করিয়ে দেন, কাল তুফান আসার আগেই সাধন সাঙ্গ করতে হবে। কারণ, 'সময়ে না করলে সাধন অসময় কি হয়'। এখানে মনে পড়ে যায় লালন সাঁইয়ের সেই বাণী, 'সময় গেলে সাধন হবে না...।' কাছাকছি সময়ের দুই বাউলের সৃষ্টিতে কী আওর্য মিল!

এই গানে চট্টগ্রামের সামাজিক বিবাহওবন্ধনের একটি মধুর অনুসঙ্গকে অলৌকিক প্রেমের উপমা হিসাবে ব্যবহার করেছেন আস্কর আলী। চট্টগ্রামে গৃহস্থ বধুরা বাপের বাড়ি নাইয়র গেলে ফেরার সময় নাস্টত্মা আনেন, স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির লোকজন এই নাস্টত্মা পেয়ে আনন্দিত হন। এটা এ অঞ্চলের একটা সামাজিক ঐতিহ্য। লৌকিক জীবনের এই উপমা কবি ব্যবহার করেছেন 'নিদান কালের সম্বল' হিসাবে।

আগেই বলেছি আস্কর আলী পওিত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের প্রধানতম রূপকার। তার গান ও সুরের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের অনেক কিংবদ ন্তী শিল্পীর গানেও রয়েছে। আস্কর আলীর সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজন লোকশিল্পী হলেন খায়েরজ্জমা (১৮৭৬ও১৯৫১), রমেশ শীল (১৮৭৭ও১৯৬৭), মোহাম্মদ নাসির (১৯০৩ও১৯৭৯), এম এন আখতার (১৯৩১ও২০১২), আবদুল গফুর হালী (১৯২৯ও২০১৬)। তাদের প্রায় প্রত্যেকের গানে আস্কর আলীর সংগীত প্রতিভার গভীর প্রভাব রয়েছে। যেমন 'বসে রইলি ও মন কার আশে...' গানের কাছাকাছি সুরে রচিত হয়েছে খায়েরজ্জামার বিখ্যাত 'বানারশী গামছা গায়, ভইনর বানারশী শাড়ি গায়/আনা ধরি সীতা পারে ভইনে খিলকীর দরজায়...' গানটি। রমেশ শীলের বিখ্যাত গান 'আঁধার ঘরত রাইত কাডাইয়ম কারে লই' (মূল শিল্পীওশেফালী ঘোষ), মোহাম্মদ নাসিরের 'মন পাখিরে বোঝাইলে সে বোঝে না', এম এন আখতারের 'কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে' গানে আস্কর আলী পওিতের 'এবার মরিমরে আমি বিষ খাইয়া' গানের সুরের প্রভাব সুস্পষ্ট। আবার আস্কর আলীর 'কি জ্বালা দি গেলা' গানের সুরে রচিত হয়েছে আবদুল গফুর হালীর জনপ্রিয় 'ন মাতাই ন বুলাই গেলিরে বন্ধুয়া...' গানটি। এমনকি আস্কর আলী পওিতের 'পাড়ার বরি কূলের কলঙ্কিনী' গানটির বাণীর সুস্পষ্ট প্রভাব লÿ্য করা যায় কবিয়াল রমেশ শীলের 'প্রাণ বন্ধুয়ারে আমি পাড়ার বৈরি কূলের কলঙ্কিনী' গানে।

আস্কর আলী পওিত আসলেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ও মরমী গানের প্রধান রূপকার। পৌণে ২০০ বছর তার গান আদরে হৃদয়ে লালন করছে বাঙালী জাতি। আশা করা যায়, শিল্পী আস্কর আলীর সুরসাগরে ডুব দিয়ে অরূপরতন খুঁজে বেড়াবে সংগীতের রূপজীবীরা, অন ন্তকাল ধরে।

নাসির উদ্দিন হায়দার, চাটগাঁইয়া গানের গবেষক ও সাংবাদিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)