সাক্ষাৎকার : ড. অনুপম সেন

ব্রিটিশ লুণ্ঠনের ক্ষত এখনও শুকায়নি

১১ মার্চ ২০১৮

নাসির উদ্দিন হায়দার

অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। এই নামটি শুধু বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, সারাবিশ্বে জ্ঞানী-গুণীদের আসরে বিশেষ সম্মানে সমুজ্জ্বল। ড. অনুপম সেন একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী। সবচেয়ে বড় কথা তিনি জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত। জাতির ক্রান্তিকালে সত্যকথনে তিনি পিছপা হন না, যে কোনো অশুভ-অসুন্দরের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম অত্যুজ্জ্বল।

বরেণ্য এই শিক্ষাবিদ রচিত 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্র্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া' গ্রন্থটি আড়াইশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'রাউটলেজ অ্যান্ড কেগানপল' ১৯৮২ সালে প্রকাশ করে। প্রকাশের প্রায় সাড়ে তিন দশক পর রাউটলেজ আবার ড. অনুপম সেনের গ্রন্থটি প্রকাশ করল ২০১৭ সালে, 'রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন' হিসেবে। খুব মূল্যবান গ্রন্থকেই সাধারণত 'লাইব্রেরি এডিশন' হিসেবে প্রকাশ করে রাউটলেট। 'রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন : ব্রিটিশ ইন ইন্ডিয়া' শিরোনামের এই এডিশনের ২৩তম খণ্ড হিসেবে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের শোষণ, অপশাসন এবং ব্রিটিশ শাসনের ফলে উদ্ভূত নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২০০ বছরে বিশ্বজুড়ে অজস্র বিষয়ে রাউটলেজ অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এসব থেকে নির্বাচিত ৩০টি গ্রন্থ নিয়ে 'রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন : ব্রিটিশ ইন ইন্ডিয়া' প্রকাশ করা হয়েছে। এই এডিশনে ৩০টি গ্রন্থের মধ্যে অধ্যাপক ড. অনুপম সেনের 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্র্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া' একটি মূল্যবান সংযোজন।

সারাবিশ্বে ড. সেনের বইটির এত কদর কেন? কিংবা কী প্রেক্ষাপটে তিনি বইটি লিখেছিলেন বা প্রকাশের সাড়ে তিন দশক পরে ভারত-বাংলাদেশে এই গ্রন্থের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা কী- এসব জানতে সম্প্রতি ধারস্থ্থ হয়েছিলাম এ শিক্ষাগুরুর। তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বললেন দৈনিক সমকালের সঙ্গে। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্র্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া' রচনার প্রেক্ষাপট। ড. সেন প্রথমেই জানিয়ে দিলেন এটি ছিল তার পিএইচডি থিসিস।

ড. সেন বলেন, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার অন্তর্ধানে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। সেই সময় ড. সেনের নজরে এলো পৃথিবী বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির তখনকার অধ্যাপক হামজা আলভীর একটি তত্ত্ব। আলভী তার একটি গ্রন্থে বলতে চাইলেন, 'দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের মূল কারণ হলো, দেশ দুটিতে রাষ্ট্রের সোশ্যাল ক্লাসেস আন্ডার ডেভেলপ আর রাষ্ট্র-যন্ত্র যেমন আর্মি, পুলিশ বিশেষত আমলাতন্ত্র ওভার ডেভেলপ। আর এটা করে গেছে ব্রিটিশরা। সেই সূত্রে ড. সেন তার পিএইচডি থিসিসের বিষয় নির্ধারণ করলেন 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া'। সেখানে তিনি ব্রিটিশদের পুঁজিবাদে লুণ্ঠনে কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ ভারতবর্ষ বা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ গরিব দেশে পরিণত হলো তা তথ্য ও তত্ত্বের সমাহারে তুলে ধরেন।

ড. অনুপম সেনের কাছে বিশদ জানতে চাই ব্রিটিশ লুণ্ঠনের বিষয়ে। স্যার বলেন, 'ভারতবর্ষ বা বর্তমান বাংলাদেশে হাজার বছর ধরে চলমান ছিল গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা। গ্রামের একটি বড় শ্রেণি ছিল কৃষক। তাদের জমির মালিকানা ছিল। আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি ছিল কারিগর। যেমন কামার, কুমার, ধোপা, স্বর্ণকার। তাদেরও কিছু জমি ছিল। গ্রামের মানুষ স্বনির্ভর ছিল। তারা অন্য কারও কাছে নির্ভরশীল ছিল না। মোগল থেকে শুরু সব আমলে জমিদার ছিল, তবে তাদের কাছে জমির মালিকানা  ছিল না। তারা শুধু রাজার হয়ে খাজনা আদায় করত। কিন্তু ব্রিটিশরা জমিদারদের জমির মালিকানা দিয়ে দিল। আর তাতে কৃষকরা জমি থেকে উচ্ছেদ হলো। ফলে গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে গেল। আর তাতে করে কারিগর শ্রেণি বিলুপ্ত হয়ে গেল। তার ফল ভোগ করল ব্রিটিশরা। তারা এই দেশ থেকে সহজে সম্পদ লুণ্ঠন করতে লাগল। ব্রিটিশদের আগমনের পরেও আমাদের বস্ত্রশিল্প ইংল্যান্ডের চেয়ে উন্নত ছিল। ব্রিটিশরা আমাদের পাট নিয়ে ড্যান্ডিতে জুট মিল করল। ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের শাসনের সময় এই ভারতবর্ষ তথা বর্তমানের বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্য ধনী দেশ থেকে গরিব দেশে পরিণত হলো। ব্রিটিশরা আসার অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে তখনকার ৫০০ কোটি পাউন্ড লুণ্ঠন করে এই দেশ থেকে। সেই অর্থ যদি আমাদের দেশে থাকত তাহলে আজ আমাদের মাথাপিছু আয় বিট্রিশদের চেয়ে বেশি হতো।

ড. অনুপম সেন বলেন, 'পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা নিপীড়নমূলক হলেও সেটা যথেষ্ট সৃজনশীল। ব্রিটেনে উৎপাদন ব্যবস্থা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। সে কারণে সেখানে শিল্পের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে উৎপাদন ব্যবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। আর তাতে ভারতবর্ষে শিল্পায়ন আশানুরূপ গতিতে হয়নি। এইখানে আমরা হেরে গেলাম। 'শুধু বিট্রিশরা নয়,পাকিস্তানি শোষণের ক্ষতও আমরা এখনও বহন করে চলেছি। ১৯৪৯ সাল থেকে '৬৭ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট, আর সেটা ছিল এই বাংলাদেশেরই সম্পদ। তারা সেই পাটের টাকায় পশ্চিম পাকিস্তানকে সোনায় মুড়িয়ে দিয়েছে, আর বাঙালিরা হয়েছেন চিরকালের শোষিত'- যোগ করেন ড. অনুপম সেন।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানের শোষণে স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কতটুকু ব্যাহত হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. অনুপম সেন বলেন, 'স্বাধীনতার পর আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি। টাইম পত্রিকা লিখেছিল, স্বাধীনতার পর এক কোটি মানুষ না খেয়ে মরবে বাংলাদেশে। তখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিকূলে। এরপরও বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃেত্ব যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন দেশকে। কিন্তু ঘাতকরা তাকে সময় দেয়নি, তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন নস্যাৎ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমলাতন্ত্রকে সাথে নিয়ে, নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে নিয়ে যাচ্ছেন সেটা বড় ব্যাপার। এখানে আমরা পদ্মা সেতুর কথা বলতে পারি। আমলাতন্ত্র কখনও কল্পনাও করেনি, বিদেশি সাহায্য ছাড়া এই সেতু করা সম্ভব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ভেবেছেন এটা সম্ভব- আজ সেটা দৃশ্যমান। এটাই হলো বাঙালিত্বের শক্তি।

প্রসঙ্গত, ড. অনুপম সেনের 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্র্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া' গ্রন্থটি ১৯৮২ সালে প্রথম প্রকাশ করার পর উত্তর আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয় যেমন, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়; সুইডেনের টিনবারজেন বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান, উন্নয়ন অর্থনীতি (ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স) ও রাষ্ট্র্রবিজ্ঞানের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিগত সাড়ে ৩ দশক ধরে ড. অনুপম সেনের 'দি স্টেট, ইন্ডাস্ট্র্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড ক্লাস ফরমেশনস ইন ইন্ডিয়া' গ্রন্থটি অব্যাহতভাবে গবেষণা ও শিক্ষায় ব্যবহূত হওয়ার কারণেই 'রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন: ব্রিটিশ ইন ইন্ডিয়া'তে গ্রন্থটির স্থ্থান হয়েছে। এই বিরল অর্জন বাংলাদেশের জন্য অসামান্য গৌরবের।

গ্রন্থটির মূল্য ছিল ব্রিটিশ পাউন্ডে ১৫ পাউন্ড। 'রাউটলেজ লাইব্রেরি এডিশন'-এ গ্রন্থটির বর্তমান মূল্য ব্রিটিশ পাউন্ডে ৯৯ পাউন্ড, ইউএস ডলারে ১৩৫ ডলার, সুইডিশ ক্রোনারে ১৩৬০ ক্রোনার। এমাজন.কম-এ গ্রন্থটি পাওয়া যাচ্ছে।

© সমকাল 2005 - 2018

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

১৩৬ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৮৮৭০১৭৯-৮৫, ৮৮৭০১৯৫, ফ্যাক্স : ৮৮৭০১৯১, ৮৮৭৭০১৯৬, বিজ্ঞাপন : ৮৮৭০১৯০ । ইমেইল: info@samakal.com