মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে

ময়মনসিংহে বিজয়

বিজয় দিবস ২০১৭

১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

মীর গোলাম মোস্তফা

১০ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে ময়মনসিংহ মুক্ত হয়। জেলার বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট ও ফুলপুরে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিসেনারা 'জয় বাংলা' ধ্বনি উচ্চারণ করে আক্রমণ শুরু করতেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনী অগ্রসর হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। এ আক্রমণের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি বাহিনী হালুয়াঘাট সদর, ধারা, নাগলা, সরচাপুর, ফুলপুর, তারাকান্দা, শম্ভুগঞ্জ হয়ে পিছু হটে ময়মনসিংহ শহরে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে হালুয়াঘাট ও সরচাপুরের যুদ্ধ ছিল রক্তক্ষয়ী। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে।

৯ ডিসেম্বর রাতে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে মুক্তিযুদ্ধের যৌথ বাহিনী অবস্থান নিলে পাকিস্তানি বাহিনী টাঙ্গাইল ও ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়। একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে। তারা বিজয় র‌্যালি করে ময়মনসিংহ শহরে অবস্থান নেয়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে ময়মনসিংহ শহর থেকে পালিয়ে যায়। পালানোর সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর রেলওয়ে সেতুটি ধ্বংস করে। সেতুটি ধ্বংসের সময় প্রচণ্ড শব্দে আশপাশ প্রকম্পিত হয়। এতে যৌথ বাহিনীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পলায়নের খবর নিশ্চিত হয়ে ১০ ডিসেম্বর সকালে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের প্রস্তুতি নেয়।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে কয়েকজন কোম্পানি কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়, তার মধ্যে নাজমুল হক তারা অন্যতম। ইতিমধ্যে নাজমুল হক তারাসহ অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, বর্তমানে অনেকেই বেঁচে নেই। তবে ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসের স্মৃতি নিয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা হয়। বিজয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২২ বছর। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ৯ ডিসেম্বর রাতে সদর উপজেলার চর এলাকায় আশ্রয় নেন। ওই দিন ময়মনসিংহ শহরের আশপাশ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ময়মনসিংহ শহর ত্যাগের খবর নিশ্চিত হওয়ায় ১০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় ব্রহ্মপুত্র নদের কাচারিঘাট দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন। এ সময় বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক কে জামানসহ অনেকেই ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। পরে শহরের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ শেষে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে জমায়েত হন। এখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ময়মনসিংহ জিলা স্কুল হোস্টেলে রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক জানান, হোস্টেল থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের কথা বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী পলায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তারা ময়মনসিংহ জিলা স্কুল হোস্টেলে চলে আসেন। তখন রাত ৯টা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবদুল খালেক বলেন, ময়মনসিংহে প্রবেশের পর তার তেমন খাওয়া হয়নি। তখন তিনি প্রচণ্ড ক্ষুধায় কষ্ট করছিলেন। রাত ২টার দিকে তিনি মুড়ি সংগ্রহ করে খেয়েছেন।

কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিপ্লব ভট্টাচার্য ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তার দু'চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। ১৯ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ৯ ডিসেম্বর রাতে সদর উপজেলার বর্তমানে জয়বাংলা বাজার এলাকায় অবস্থান নেন। ওই দিন রাত ১২টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর রেলওয়ে সেতুটি বোমা মেরে মারাত্মক ক্ষতি করে। পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় রাজাকাররা বাড়িতে ফেরার সময় অনেককেই আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পলায়নের খবর নিশ্চিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহে প্রবেশের প্রস্তুতি নেয়। সকাল ৯টার পর কাচারিঘাট (জিরো পয়েন্ট) দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। এ সময় কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে প্রায় ১৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা টাউন হল মোড়ে অবস্থান নেন। ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের সময় শত শত জনতা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানায়। টাউন হল মোড়ে হাজারো জনতা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ধরে বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করে। প্রায় ১৫ মিনিট পর এখান থেকে তাদের ময়মনসিংহ জিলা স্কুল মাঠে নেওয়া হয়। পরে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল হোস্টেলে রাখা হয়। এদিকে বিপ্লব ভট্টাচার্যের পরিবারের সদস্যরা বিপ্লবের কোনো খোঁজ না পেয়ে আশাই ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিপ্লবের ভগ্নিপতি বিপ্লব কুমার সান্যাল শহরে মুক্তিযোদ্ধা বিপ্লবকে দেখে বাসায় খবর দেন। পরে ১০ ডিসেম্বর বেলা ২টায় ভগ্নি বিপ্লবকে বাসায় নিয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা আবেগে কাঁদতে শুরু করেন। পিতা-মাতা সন্তানকে পেয়ে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে ভগ্নিপতি বিপ্লবকে পুনরায় জিলা স্কুল হোস্টেল ক্যাম্পে নিয়ে যান। বিপ্লব জানান, মুক্তিযুদ্ধে থাকা অবস্থায় বাসায় খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে পরিবারের সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের ভয়ে শহরের আমলাপাড়া এলাকার নিজস্ব বাসা ছেড়ে চরপাড়া এলাকায় এক মুসলিম পরিবারের বাসায় আশ্রয় নেন। কয়েক দিন পর বিপ্লব ভট্টাচার্য অস্ত্র জমা দিয়ে বাসায় ফিরে যান।

ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. গোলাম মোস্তফা ১৯৭১ সালে ১৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনিও যুদ্ধের সময় কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক তারার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। ১০ ডিসেম্বর সকালে প্রথম দল হিসেবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাচারিঘাট দিয়ে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করেন। মুক্তির আনন্দে আত্মহারা হয়ে টাউন হলে অবস্থানের পর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে যান। পরে জিলা স্কুল হোস্টেল থেকে অস্ত্রসহ হঠাৎ বাসায় গেলে পরিবারের লোকজন হতবাক হয়ে যায়। এ পরিবারের সদস্যরাও গোলাম মোস্তফা বেঁচে নেই বলে ধরে নিয়েছিল। এ দৃশ্য বর্ণনার সময় গোলাম মোস্তফা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এদিকে তিনি বাসায় যাওয়ার পর আশপাশের লোকজন খবর পেয়ে ভিড় করতে থাকে। একপর্যায়ে গোলাম মোস্তফার মা তাকে গোস করিয়ে খাবার দেন। বিকেলে তিনি অস্ত্র নিয়ে পুনরায় ক্যাম্পে যান। ৩-৪ দিন পর ভারতীয় সেনারা অস্ত্র নিয়ে নেয় এবং তিনি বাসায় ফিরে যান। ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত হওয়ার পর কয়েক দিন বিজয় উল্লাসের সঙ্গে সঙ্গে বিজয় মিছিল হয়েছে বলে তিনি জানান।

মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল জানান, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত হলেও ১৯৮৩ সালে প্রথম ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস পালিত হয়। ময়মনসিংহ শহরের ছোটবাজার এলাকায় মুক্ত মঞ্চ তৈরি করে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

লেখক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)