সীমান্ত মানেন না যিনি

 প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৭      

 রাজীব নূর

২০১২ সালে গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকায় খবর অনুসন্ধানের সময় শেখ অনিন্দ্য মিন্টুর তোলা ছবি

এক আদিবাসী মহিলা ভারত থেকে গোটা দুয়েক শাড়ি, সিটি গোল্ডের কিছু গহনা, কপালের টিপ, চুলের ক্লিপ ইত্যাদি নিয়ে ফিরলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'ব্ল্যাক করেন?'

ভদ্রমহিলা বুক চিতিয়ে বললেন, 'হ বেলেক করি।'

আমি খুব আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তার মধ্যে একটুও আড়ষ্টতা নেই। দাগী অপরাধীও বেআইনি কিছু করে ধরা পড়ে গেলে যে সংকোচ বোধ করে, তার আচরণে সেই লজ্জা-সংকোচের ছিটেফোঁটাও দেখলাম না আমি। বোধ হয়, তার এমন নির্লজ্জতায় আমার একটু ক্ষোভ হয়, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলি, 'আপনি একটা চোরাকারবারি?'

আরে একি মহিলা এবার ক্ষেপে গেলেন, 'আমনে (আপনি) আমারে চোরাকারবারি কইতাসেন ক্যা? আমি কি কোনো কিসু চুরি কইরা আনসি? আমি এত কষ্ট কইরা বথারের (বর্ডারের) ওই পার গেলাম, নগদ টেহা (টাকা) দিয়া মাল কিনলাম। বেইচ্যা দুই পইসা লাভ করবাম। আমনে আমারে চোরাকারবারি কইবাইন আর এই যে বিডিআর-বিএসএফ খাড়ইয়া (দাঁড়িয়ে) আছে, হুদাই (অকারণে) আমার কাছ থেইক্যা টেহা নিল, হেগরে (তাদের) চোর বলবা না। আমি চুরি করি না, বেলেকের ব্যবসা করি।'

ঘটনাটি ২০১২ সালের আগস্ট মাসের কোনো একদিনকার। ততদিনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাম পরিবর্তন করে বিডিআর থেকে বিজিবি হয়ে গেছে, কিন্তু আদিবাসী ওই মহিলাটি বিডিআরই বললেন। ঘটনাটি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকার। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ওই এলাকায় সঙ্গে ছিলেন আমার দুই বন্ধু, কবি স্বাধীন চৌধুরী ও আলোকচিত্রশিল্পী শেখ অনিন্দ্য মিন্টু। সেটা ছিল আমার সংবাদপত্রের রিপোর্টিং বিভাগে ফেরার প্রস্তুতিপর্ব। সাংবাদিকতার শুরুতেও আমি রিপোর্টার ছিলাম। মাঝে ছন্দপতন। ভালোই লাগছিল না ব্যাপারটা। তাই দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের পদ ছেড়ে দ্বিতীয়বারের মতো সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকটিতে যোগ দিয়েছি। সেখানে আমাকে পদ দেওয়া হলো বিশেষ ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি। পদ-পদবি নিয়ে আমি মোটেই বিচলিত নই, বরং রিপোর্টিংয়ে ফিরতে পারার আনন্দেই পথ চলতে শুরু করেছি। ময়মনসিংহে গিয়ে খবর হাতড়ে বেড়াচ্ছি, এরই মধ্যে খবর পেলাম ছাত্রলীগের তখনকার সভাপতি তাজউদ্দীন আহমেদ রানা কোটি কোটি টাকা খরচ করে জমি কিনেছেন শম্ভুগঞ্জের চর ঈশ্বরদিয়া ও হালুয়াঘাটের কয়লা বন্দরসংলগ্ন এলাকায়। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পারে শম্ভুগঞ্জের চর ঈশ্বরদিয়া মৌজায় ৮০ শতক জমি এক কোটি টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি বায়না করেছেন, যার মূল্য তিন কোটি টাকা, এমন একটি সাইনবোর্ড পাই সরেজমিনে গিয়ে। রানা অবশ্য দাবি করেছিলেন, তার নামে বায়না করা হলেও জমির মালিক তিনি নন। হালুয়াঘাটে গিয়ে রানার আর জমির সন্ধান মেলেনি। তবে পাওয়া গিয়েছিল আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতার অবৈধ ব্যবসার তথ্য, তারা দুই নেতা মিলে বাঘে-মহিষে একঘাটে জল খাওয়ার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন, তার পরিণতিতে কয়লা বন্দরের ব্যবসায়ীরা হয়ে পড়েছিলেন জিম্মি। এই সব অনুসন্ধান পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলোকে রিপোর্টে রূপান্তরের মতো উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে পথে পাওয়া ওই মহিলাটির কথা লিখতে পারিনি, ভুলতেও পারিনি এতকাল।

আদিবাসী মহিলাটির সারল্য আমাকে মুগ্ধ করে। বুঝতে পারি, সীমান্তবর্তী এলাকার ওই মহিলাটি স্মাগলিং, যা স্থানীয়ভাবে ব্ল্যাক করা, তাকে আর পাঁচটা ব্যবসা করার মতো দোষের কিছু মনে করেন না। তাই তাকে কেন চোর বলা হবে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি আমি। বরং তার প্রশ্নে সত্যিকারের ধাক্কা খাই। তারপরও বলি, 'এই যে আপনি বর্ডার মানছেন না, এইটা তো অন্যায়।'

ভদ্রমহিলা বললেন, 'আমনেরা বথার বানাইসেন কেললাগ্‌গিয়া (কেন)?'

হেসে বলি, 'আরে বর্ডার তো আমি বানাই নাই।' তারপর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে বলি, বর্ডার তাদের বানানো।

উত্তরে মহিলাটি বলেন, 'যেই বানাক, আমি বথার-ওডার মানি না।'

'মানবেন না কেন?'—জানতে চাই আমি।

'মানবাম কেললাগ্‌গিয়া? ধরেন আমি বেলেকের ব্যবসা ছাইরা দিলাম, তাইলেও তো মানতাম না। ওইখানে গাছুয়াপাড়ায় আমার আত্মীয়-গোষ্ঠী আছে। আমি হেরারে দেখবার যাইতাম না? আমি বথার-ওডার মানি না।'

তার সঙ্গে যেখানে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল, তার অদূরেই একটি সাইনবোর্ডে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, 'সাবধান, সামনে ভারত, প্রবেশ নিষেধ।' গারোপাহাড়ের এপারে-ওপারে একসময় গারো নামে পরিচিত মান্দি আদিবাসীদেরই বাস ছিল। তবে এপারের অনেকেই সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকে ওপারে চলে গেছে। চলে যাওয়া থামেনি। তাছাড়া এপারে-ওপারে এখনও নতুন আত্মীয়তা হয়। এটা শুধু গারো পাহাড়ের পাদদেশের গল্প নয়—সারা বাংলাদেশেরই সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গল্প। মনে আছে ১৯৯৭ সালে রাজশাহীতে বন্ধু মেহবুব আলম বর্ণের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধবী মিলে চরের পথ ধরে মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলাটি পাশাপাশি, মাঝে আছে পদ্মা, পদ্মার চর ও সীমান্ত। বর্ণ বলছিল, ওর দাদার বাড়ি মুর্শিদাবাদে, সেখানে ওদের বংশের প্রায় সবাই রয়ে গেছে। ওর দাদি, আপন চাচারা ও এক ফুপু আছেন সেখানে। বর্ণের বাবা ১৯৪৭-এর পর রাজশাহী এসেছিলেন পড়ালেখার জন্য। তারপর সংসার গড়েন ওখানেই। বর্ণ বলছিল, আশির দশকে স্কুলে পড়ার সময় দাদার বাড়ি যেতে সীমান্তে তেমন বাধা পেতে হতো না। তখন প্রতিবছরই দাদার বাড়ি যাওয়া হতো ওদের। পদ্মা পেরিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যেত মুর্শিদাবাদে। ১৯৭৬ সালে যখন ওর বাবা মারা যান, তখন মুর্শিদাবাদ থেকে ওদের গ্রামের জনা পঞ্চাশেক আত্মীয়-স্বজন এসেছিলেন দাফন করতে।

শূন্যরেখার এই এলাকাটিতেই দেখা হয়েছিল আদিবাসী ওই মহিলাটির সঙ্গে, শেখ অনিন্দ্য মিন্টুর তোলা ছবি

কিছুদিন আগে ফেসবুকে হালুয়াঘাটের ওই আদিবাসী মহিলাটিকে নিয়ে দেওয়া আমার একটি পোস্টে মেহবুব আলম বর্ণ যা লিখেছেন, তা সংক্ষেপে অনেকটা এই রকম, 'সীমান্তে এই যে কড়াকড়ি, কাঁটাতার, তার প্রধান যুক্তি হিসেবে জঙ্গি ঠেকানো ও চোরাচালান বন্ধের কথা বলা হয়। এর মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ বন্ধের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা আর বিবেচনা করা হয় না। একটি জাতি দুটি দেশে থাকলেও তাদের মধ্যে সাংস্কৃৃতিক, সামাজিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কটি কি ধরে রাখা যায় না? বাংলাদেশ সীমান্তে চীনের মতো উঁচু প্রাচীর দিলেও কী ভারত জঙ্গি সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে? বড় চোরাচালানগুলো কাঁটাতার দিয়েও বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশে মাদকের বড় চালান তো ভারতীয় চোরাকারবারিরাই করে। সীমান্তে বিএসএফ শুধু গরুর রাখালদের দেখতে পায়। ফেন্সিডিল ও হেরোইন তাদের চোখেই পড়ে না। আমি আগে দেখেছি, সীমান্তে সাধারণ গরিব মানুষেরা খাদ্যপণ্য এপার-ওপার করতেন। এতে উভয়পক্ষের সাধারণ মানুষের লাভ হতো। বড় ব্যবসায়ীরা খাদ্য গুদামজাত করেও খুব সুবিধা করতে পারতেন না। মুর্শিদাবাদে পেঁয়াজের আঁকাড়া হলে রাজশাহী থেকে তা চলে যেত। এখন মৃত্যুসংবাদেও আমরা স্বজনদের কাছে যেতে পারি না। পাসপোর্ট-ভিসা করে যেতেও অনেক পথ ঘুরতে হয়। আমার সাধারণ কৃষক আত্মীয়দের পক্ষে যা সম্ভব হয়ে উঠে না। আগে যোগাযোগ এতটাই সহজ ও ঝামেলামুক্ত ছিল যে, প্রতিবছর দাদি, ফুপু শীতের পিঠা পাঠাতেন। কোরবানি ঈদের পরদিন চাচাদের কেউ না কেউ আসতেন মাংস নিয়ে।'

সীমান্তের কড়াকড়ি আমার বন্ধু মেহবুব বর্ণ মেনে নিয়েছেন, স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বেদনাটাকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু হালুয়াঘাটের গারো মহিলাটি তা মানতে নারাজ। তবু আমি তাকে বলি, 'মানতে হবে তো, ওইপারে যেতে হলে পাসপোর্ট-ভিসা লাগে।'

তিনি আমার কাছে কিভাবে পাসপোর্ট করা যায়, তা জানতে চান। আমি বুঝিয়ে বলি, তারপর জানাই, 'খালি পাসপোর্ট হলেই হবে না ভিসাও লাগে।' ভিসাটা যে ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে করাতে হবে এবং চাইলেই সবসময় ভিসা পাওয়া যায় না, তা-ও বুঝিয়ে বলি।

এবার তিনি যেন একটু হতোদ্যম হলেন, উত্তরে হতাশা আর ক্ষোভ মিশিয়ে বলেন, 'ভিসা-ওসা আমনেরার বড়লোকগুলার কাজ। আমি এইত্তা মানি না। পারলে বথার তুইল্যা দিতাম। মানুষ আটকানুর লাইগ্যা এত বিডিআর-বিএসএফ লাগবো ক্যা?'

সীমান্ত না-মানা ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ থেকেই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় বলি, 'আমি ভিসামুক্ত বিশ্ব চাই।' তবে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া সীমান্তরেখা অতিক্রমণের সাহস আমার নেই। আমার লেখায় ওই মহিলাটি যে ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন, তার অনুরণন ধ্বনিত করতে পারিনি, আর পারিনি বলেই আপনাদের বোঝাতে পারলাম না যে আমরা কেউ কেউ ভিসামুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করি এবং জানি এই স্বপ্ন সুদূরপরাহত, কিন্তু তিনি ভিসামুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন।

নাম না জানা আদিবাসী ওই মহিলাটির ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। ছবি তোলার প্রস্তাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালালেন তিনি।

লেখক: সাংবাদিক