'বিস্ফোরক' বক্তব্যের দায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য মির্জা আব্বাসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়ায় বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন তার অনুসারীরা। তারা দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদ্গার করছেন। তবে মির্জা আব্বাসের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে সন্তুষ্ট দলের হাইকমান্ড। আপাতত আব্বাসকে সতর্কতামূলক আর কোনো চিঠি দেওয়া হচ্ছে না। মির্জা আব্বাসের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কারণ, এরই মধ্যে আব্বাসের বলয়ের পক্ষ থেকে দলের ভেতর বিভক্তি সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে বলে মনে করছে দলের নীতিনির্ধারক মহল। দলের ভেতর দ্বন্দ্ব-কোন্দল ও গ্রুপিং তৈরি এবং 'চেইন অব কমান্ড' লঙ্ঘনের মতো কোনো তৎপরতা বরদাশত করা হবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, বিষয়টি দলের অভ্যন্তরীণ। মির্জা আব্বাসের জবাবে দল সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।

অন্যদিকে, দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, এ বিষয়ে চিঠি দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি মুখবন্ধ চিঠিটি মহাসচিব বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপার হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে।

গত ১৭ এপ্রিল এক ভার্চুয়াল সভায় দেওয়া বক্তব্যে ইলিয়াস আলীর 'গুমের' জন্য বিএনপিরই কতিপয় নেতাকে দায়ী করেন মির্জা আব্বাস। ওই নেতাদের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই ব্যক্তিদের অনেকেই চেনেন। 'আওয়ামী লীগ সরকার ইলিয়াস আলীকে গুম করেনি' এমন মন্তব্যও করেন আব্বাস। তার এ বক্তব্যে দলের ভেতর ও বাইরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দলের নির্দেশে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের দোষারোপ করলেও দল সন্তুষ্ট হয়নি।

দল থেকে তাকে যে লিখিত দেওয়া হয়েছিল, তিনি তাও পড়েননি। এতে দলের হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ হয়ে মির্জা আব্বাসের দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিবের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। মির্জা আব্বাস তিন দিনের মধ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেছেন।

সূত্র জানায়, গত শনিবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হলেও সেখানে এ ইস্যুতে কোনো আলোচনা হয়নি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হলেও মির্জা আব্বাসের বক্তব্য, কারণ দর্শানো চিঠি ও জবাবের বিষয়ে কোনো আলোচনাই তোলেননি কেউ। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও যথারীতি এজেন্ডার মধ্যে থেকেই মিটিংয়ের কার্যক্রম শেষ করেন।

জানা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শে মির্জা আব্বাসকে দেওয়া চিঠি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাধ্যমে তার কাছে পৌঁছেছে। চিঠিতে মির্জা আব্বাস তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে দলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তার বক্তব্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাতেও তিনি অনুতপ্ত বলে জানিয়েছেন।

বিএনপির হাইকমান্ড সূত্র জানিয়েছে, মির্জা আব্বাসের নমনীয় সুরে দেওয়া বক্তব্যে দলের হাইকমান্ডও সন্তুষ্ট। মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারেন- এমন বিবেচনা থেকে আপাতত তাকে আর কোনো সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানান, এ মুহূর্তে দলটির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। দলের ভেতর ও বাইরে অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে নিজেদের ভুলভ্রান্তি নিয়ে বিভেদ বাড়ানো উচিত নয়। এখন গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব-কোন্দল করার সময় নয়। তাই দলের হাইকমান্ড বৃহত্তর স্বার্থে মির্জা আব্বাসের বিষয়ে নমনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা মানবাধিকার সংগঠন ও দূতাবাসগুলোতে নানা প্রশ্নের মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। তারপরও তারা বিদেশিদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন- এটি একজন নেতার বিচ্ছিন্ন বক্তব্য। তাও তিনি ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি এখানেই শেষ করতে চায় দলের হাইকমান্ড।

আরও জানা যায়, মির্জা আব্বাসের বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতারা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে অ্যামনেস্টিসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, কূটনৈতিকরা মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। দলের নীতিনির্ধারক একজন নেতাই যখন ইলিয়াস আলী নিখোঁজের সঙ্গে দলীয় নেতা জড়িত বলে দাবি করেন, তখন এর ভেতরে আরও কোনো তথ্য আছে কিনা তা জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশিরা।

এদিকে, মির্জা আব্বাসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়ায় মির্জা আব্বাসের পাশাপাশি তার অনুসারীরাও ভালোভাবে নেননি। তারা মির্জা আব্বাসকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, ওই সিনিয়র নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভুল বুঝিয়ে তার মতো একজন প্রভাবশালী নেতাকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

আব্বাসবিরোধী নেতাদের মতে, এর আগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও শওকত মাহমুদকেও কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছিল দল। এমনকি অতীতে দলের শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মতো নেতাদের বিরুদ্ধে দল থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা সমকালকে জানান, যারা দলের মধ্যে বিভেদ ও গ্রুপিং তৈরি করছেন, তাদের চিহ্নিত করছে দলের হাইকমান্ড। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, কেউ দলের শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ডের ঊর্ধ্বে নয়। এ ঘটনার মাধ্যমে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সেটিই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সূত্র আরও জানায়, উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ারের মতো সিনিয়র নেতারা মৃত্যুবরণ করায় শূন্য পদে সিনিয়র আরও নেতাকে পদায়ন করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। যাতে আগামীতে কঠিন সময়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়।

মন্তব্য করুন