দুই জোটের শরিকরা কেমন আছে -২

উত্থানের পরই স্থবিরতা গণফোরামে

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

কামরুল হাসান

২০১৮ সাল ছিল গণফোরামের 'স্বর্ণকাল'। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। কিন্তু নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর ঐক্যফ্রন্ট যেমন নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তেমনি স্থবিরতা নেমে আসে গণফোরামে। আর সরগরম নেই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। বিভিন্ন কর্মসূচিতেও নেতাকর্মীদের তেমন উপস্থিতি নেই। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বিশেষ কাউন্সিল শেষে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে ক্ষোভ আর অভিমানে অধিকাংশ নেতা নিষ্ফ্ক্রিয়। অবশ্য গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন সমকালকে বলেছেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। জনগণের অধিকার আর তাদের মালিকানায় দেশকে পরিচালনা করার জন্যই তাদের রাজনীতি। সেই প্রচেষ্টা এখনও চলছে। দলকে সংগঠিত করে, দেশের সব দল ও মতকে ঐক্যবদ্ধ করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন অব্যাহত আছে। তাদের আন্দোলন সফল হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গণফোরামে কোনো কোন্দল নেই, গণফোরাম ঐক্যবদ্ধ আছে।

প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব : ১৯৯২ সালের জুনে গণতান্ত্রিক ফোরাম নামে অরাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর এ নিয়ে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরের বছরই আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গঠিত নতুন কমিটির সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের এই মন্ত্রীকে। পরে ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট গণতান্ত্রিক ফোরামের  তিন দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলন শেষে গণফোরাম গঠনের ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. কামাল হোসেন।

গণফোরাম প্রতিষ্ঠার সময় দলটিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কারবাদী অংশ, পঙ্কজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ এবং শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন জাসদের একটি অংশ যোগ দিয়েছিল। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন কিছু ব্যক্তিও গণফোরামে সম্পৃক্ত হন। ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও আবুল মাল আবদুল মুহিত তাদের মধ্যে অন্যতম। আবুল মাল আবদুল মুহিত পরে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী হন। আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত মোস্তফা মহসিন মন্টুও যোগ দেন এ দলে। দলের সভাপতি হিসেবে শুরু থেকে ড. কামাল হোসেন রয়েছেন। আর প্রথম কমিটিতে সচিব হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত, পরের কমিটিতে পর্যায়ক্রমে সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ২০১১ সালের জাতীয় সম্মেলনে মোস্তফা মোহসিন মন্টু এবং ২০১৯ সালের বিশেষ কাউন্সিলে ড. রেজা কিবরিয়া সাধারণ সম্পাদক হন।

দলের ২৫ বছরের ইতিহাসে কখনও ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেনি গণফোরাম। তবে গত বছরের অক্টোবরে বিএনপির সঙ্গে জোট করে ভোটের রাজনীতির আলোচনায় ঝড় তোলে এ দলটি। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ছেড়ে কয়েকজন নেতার এ দলে যোগ দেওয়াও ছিল বছরের অন্যতম চমক। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি জোট সাতটি আসন দেয় গণফোরামকে। দুটি আসনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করে ড. কামালের দল। ছয় আসন পাওয়া বিএনপির মতো গণফোরামও ভোটের পর বলেছিল, সংসদে যাবে না। কিন্তু তাদের দুই এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এবং মোকাব্বির খান দলীয় নির্দেশ অমান্য করে বিএনপির আগেই সংসদে যোগ দেন।

সারাদেশে গণফোরামের সাংগঠনিক জেলা ৭২টি। কিন্তু কমিটি আছে ২৫টিতে। তবে সেগুলোও নামকাওয়াস্তে। অনেক জেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। তবে গণফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ এসব তথ্য মানতে নারাজ। তিনি বলেন, সারাদেশে তাদের ৫০টির মতো সাংগঠনিক কমিটি রয়েছে। বেশিরভাগ কমিটিই সক্রিয় ও শক্তিশালী।

ছোট দল, বড় কোন্দল : আওয়ামী লীগের বিকল্প তৃতীয় রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের জন্য গণফোরাম প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক দল থেকে কিছু নেতা এ দলে যোগদান করেন। কিন্তু দুই বছরের মাথায় অনেকের স্বপ্ন ভাঙে। 'দল থেকে ব্যক্তি ইমেজ বড়' প্রচলনের কারণে বিরক্ত হয়ে অনেকে দলত্যাগ করতে থাকেন। দলের কারও কারও মতে, রাজধানীর আরামবাগ কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দলীয় সভাপতি ড. কামাল হোসেনের চেম্বার- এ দুই ধারায় বিভক্ত এ দল। সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না থেকে সভাপতির চেম্বারেই বেশি সময় কাটান কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। নির্বাচনের পর গত এপ্রিলে বিশেষ কাউন্সিলের পর গণফোরামে বড় ধরনের ওলটপালট হয়। ভোটের আগে আওয়ামী লীগ থেকে আসা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও মেজর জেনারেল (অব.) আ ম সা আমিন দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পান। সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মোস্তফা মহসিন মন্টুও নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মফিজুল ইসলাম খান কামালকে দলের সিনিয়র নির্বাহী সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়। তিনি সমকালকে জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে রসিকতা করা হয়েছে। তার মতো বেশিরভাগ নেতাই নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তবে নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী দাবি করেন, যোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে। গণফোরাম সারাদেশে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছে। ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচিও করা হচ্ছে। গণফোরাম রাজনৈতিকভাবে সরব রয়েছে, দলের নেতাকর্মীরাও সক্রিয় রয়েছেন।

জোটনির্ভর রাজনীতি :  নব্বই দশকের শেষ ভাগে দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে সারাদেশে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে গণফোরাম ঐক্যমঞ্চ গড়ে তোলে। এতে আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, প্রশিকার কাজী ফারুকের ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি অংশ নেয়। ২০০২ সালের পর বিএনপি থেকে ছিটকে পড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে নিয়ে ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন ড. কামাল। কিন্তু বিএনপির বাধায় তা এগোয়নি। ২০০৬ সালে তিনি তার পুরনো দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করেন। তবে প্রয়াত সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি জোটে যোগ দেওয়ার পর গণফোরাম মহাজোট ত্যাগ করে।

তবে সর্বশেষ ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল। বিএনপিসহ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য আর পরবর্তীতে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে নিয়ে 'জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট' গঠনে মূল ভূমিকা রাখেন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন ড. কামাল। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণাকে সামনে রেখে সরকারি দলের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসার ঘটনায় রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেন। তবে সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো দাবি না মানার পরও নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণায় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়। সংলাপে কোনো দাবি না মানলেও বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটান ড. কামাল। তবে তার নেতৃত্বে জোট করায় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

ঐক্যফ্রন্টে টানাপড়েন ও নতুন উদ্যম : গণফোরামের দুই এমপি জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যোগ দেওয়ার পর থেকে বিএনপির সঙ্গে শুরু হয় টানাপড়েন। অবশ্য বিএনপির এমপিরাও সংসদে যোগ দেওয়ার পর থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দৃশ্যমান তৎপরতা স্থবির হয়ে পড়ে। জাতীয় সংসদে যোগদান আর কর্মসূচিতে নিষ্ফ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যে ফ্রন্ট ত্যাগ করেছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।

অবশ্য নানা হিসাব-নিকাশ কষে ঝিমিয়ে পড়া ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। দেশি-বিদেশিদের পরামর্শে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধী দলগুলো নিয়ে জোটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ দিয়েছে তারা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। বৈঠকে ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকেও ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় ও পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন নেতারা।

বিষয় : জোটের শরিকরা জোট