সংবিধান থেকে বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আবারও জাতীয় সংসদে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক হয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেট পাসের আগে ছাটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি দলীয় সদস্যরা বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আনতে অবশ্যই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

এর জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্ববধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। উচ্চ আদালতের এই রায়ের এক সুতাও বাইরে সরকার যাবে না। কারণ বর্তমান সরকার আইনে বিশ্বাস করে। আইনের শাসনে বিশ্বাস করে।

বৃহস্পতিবার ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের বাজেটে প্রস্তাবিত মঞ্জুরী দাবিতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাদ্দের ওপরে বিরোধী সদস্যদের দেওয়া ছাটাই প্রস্তাবের আলোচনায় এই বির্তক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, গণতন্ত্র মানে নির্বাচন। আর সুষ্ঠু ভোটের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও ভোট প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা এখন দন্তহীন বাঘ।

তিনি আরও বলেন, নির্বচান কমিশন যত শক্তিশালী হবে তত্ত্বাবধায় সরকারের দাবির যৌক্তিকতা তত হারাবে। তিনি নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনী পুলিশ গঠনের প্রস্তাব করেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবাধ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। যখন নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয় তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়। গত ১০ বছরে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

তিনি কিছুটা টিপ্পনী কেটে বলেন, এই বরাদ্দ নির্বাচন কমিশনকে না দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে দেওয়া হোক। তার কারণ এখন নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করে না। নির্বাচন করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকরা।

হারুন বলেন, সাবেক সিইসি নূরুল হুদা এখন বলছেন- ইভিএমে কিছু ত্রুটি আছে। তাহলে তিনি কেন ইভিএমে নির্বাচন করলেন। একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, গোপন কক্ষে থাকা ডাকাত বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারবেন না।

বিএনপির এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউ ইভিএম চায় না। আওয়ামী লীগ এক সময় বলেছিল, আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। এখন বিএনপিকে ছাড়া কি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে? পারবেন না। বিএনপিকে কিভাবে নির্বাচনে আনবেন সেটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে অবশ্যই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। সে জন্য নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকতে হবে।

বিএনপি দলীয় আরেক সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে যদি নির্বাচনেই না থাকে, মানুষ যদি তার ভোটই প্রয়োগ না করতে পারে, মানুষ যদি তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে না পারে, আগে থেকে যদি ব্যালটে বাক্স ভরা থাকে, দিনের ভোট যদি রাতে হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন দিয়ে হবে কি?

তিনি বলেন, নির্বাচন যে এখন একটা মল্লযুদ্ধ, তার একটা বড় প্রমাণ এই নির্বাচন কমিশন শপথ নেওয়ার পরপরই সিইসি বলেছেন-জেলোনস্কির মতো বিএনপিকে মাঠে থাকতে হবে। ভোট কি একটা যুদ্ধ যে জেলনস্কির মতো বিএনপিকে মাঠে থাকতে হবে? আর এক কমিশনার বলেছেন- মেশিনে কোনো সমস্যা নাই, সমস্যা হচ্ছে গোপন কক্ষে ডাকাত ঢুকে থাকে। এই ডাকাত যে শুধু দলীয় ক্যাডার তা নয়, এর মধ্যে আছে পুলিশ ও প্রশাসন। এই ডাকাতদের যেভাবে পুরস্কৃত করা হয়, সেই পুরস্কার দেখে বোঝা যায় ভবিষৎতে আরো ডাকাত বাড়বে।
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীনকে পুরস্কার হিসেবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। অবসরে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সে সফরের অভিজ্ঞতা তিনি অবসর জীবনে কাজে লাগাবেন। আর এভাবে পুরস্কৃত করতে থাকলে বিনা ভোটে সংসদ গঠন চলতেই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের একটি পুরোনো খেলা আছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকলে তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো মোটামুটি সুষ্ঠু করা হয়। ২০১৪ সালেও এই খেলা দেখা গেছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন বলেন, সেখানে একজন সংসদ সদস্যকে নির্বাচন কমিশন সামাল দিতে পারেনি। তার হুমকি ধামকি সহ্য করতে পারেনি। বারবার অনুরোধ করে তাকে এলাকা থেকে সরাতে পারেনি। যে কমিশন একজন সংসদ সদস্যকে সামলাতে পারে না তারা জাতীয় নির্বাচনে তিনশ সংসদ সদস্যকে কিভাবে সামলাবেন। এই কমিশনের অধীনে ভোট কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ইভিএমের কোনো দোষ নেই। যারা ইভিএমে প্রভাব খাটায়, ব্যালটেও তারা প্রভাব খাটাতে পারে। এ বিষয়টি বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, নির্বাচন করে রাজনৈতিক দলগুলো। তারা যদি সুষ্ঠু পরিবেশ করে দিতে না পারে তাহলে নির্বাচন কমিশন ঢাকায় বসে কিছুই করতে পারবে না।

তিনি বলেন, আসলে নির্বাচন কমিশনসহ কোনো কমিশনই স্বাধীন নয়। সব সরকারের আমলেই এটি হয়েছে, এটি চলতেই থাকবে। সবাই নির্বাচনে জিততে চায়। এখানে কোনো এথিকস মানে না। যেদিকে শক্তি বেশি থাকে স্থানীয় প্রশাসনও সেদিকে চলে যায়।

গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার মূল কারণ তারা সরকারের আজ্ঞাবহ। চার দল ইভিএমের পক্ষে থাকলেও বেশিরভাগ বিপক্ষে। আজ্ঞাবহ না হয়ে নির্বাচন কমিশনকে জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইভিএম বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এখানকার আসনে বসে বলছেন নির্বাচন হয় না। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে উনি সংসদে গেলেন কীভাবে? এর জবাব উনি দেবেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভোট কীভাবে হয়েছে তা আমরা দেখেছি। ওই সময় কারো ভোট কেন্দ্রে যাওয়া লাগতো না। ভোট হয়ে যেত। আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন তাদের (বিএনপি) ছিলো। মাগুরার ভোটের কথাও সবাই জানে। ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি কী করেছে। এগুলি কী উনারা ভুল গেছেন।

নির্বাচন কমিশন আইন তৈরির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, এখন বিএনপির দাবি হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবে তাহলে উনারা ভোটে আসবে। এই সংসদে দাঁড়িয় দ্যার্থহীন ভাষায় বলতে চাই, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্ববধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা দিয়েছে। উচ্চ আদালতের এই রায়ের এক সুতাও বাইরে সরকার যাবে না। কারণ বর্তমান সরকার আইনে বিশ্বাস করে। আইনের শাসনে বিশ্বাস করে।

তিনি বলেন, বিএনপি বার বার বলছেন তাদেরকে নির্বাচনে আনতে হবে। তারা কী পাকিস্তান থাকে যে সেখান থেকে ডেকে আনতে হবে? তারা তো বাংলাদেশে থাকে। বাংলাদেশ হয় নির্বাচন। উনারা নির্বাচন করতে চাইলেই নির্বাচন করতে পারে।

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- সুষ্ঠু নির্বাচনের যে জন্য প্লেয়িং ফিল্ড দরকার সেটা করা হবে। তার পদক্ষেপ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন। সেটা করা হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের টাকা লাগবে। নির্বাচন কমিশন তার অর্থ ব্যয়ে পুরোপুরি স্বাধীন।
অবসরের দুই দিন আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীনের বিদেশ সফর বিষয়ে রুমিনের অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশের আমন্ত্রণে মন্ত্রী মহোদয় এবং সচিব টিম নিয়ে ডেল্টা প্ল্যান বিষয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। তারা সেখান থেকে শিখে এসেছেন। এটা হয়েছে বিদেশি সরকারের ব্যবস্থাপনায়। আর তখন তিনি সচিব ছিলো। এখানে কী কোন অন্যায় আছে? জানিনা উনি কোথা থেকে অন্যায় দেখলেন।

আইনমন্ত্রী দাবী করেন, বাংলাদেশে ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। জনগণ জননেত্রী শেখ হসিনাকে নিরঙ্কুশ মেজরিটি দিয়ে পাস করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও বোধহয় নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হয় না। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল হয়। যার কারণে হয়তো আধা শতাংশ, এক শতাংশ ভুল থাকে।