বরিশালের গৌরনদী পৌর শ্রমিক দলের কমিটি গঠন হয়েছে সোমবার। পৌর শাখার প্রথম কমিটি এটি। রাজনীতির স্বাভাবিক রীতি, পদধারীরা আনন্দ-উল্লাস করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেবেন। অনুসারীদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হবেন। কিন্তু গৌরনদী পৌর শ্রমিক দলের প্রথম কমিটির নেতাদের ভাগ্যে এর কিছুই জোটেনি। উল্টো কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন জেনে ভিড় করেছে একরাশ আতঙ্ক। এই বুঝি বাড়িতে হামলা হলো! গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া- দুটি উপজেলায় বিরোধী রাজনীতিকদের এই আতঙ্ক ও ভয় ২০০৯ সাল থেকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখানে তাঁদের জন্য রাজনীতি এবং ভোট 'নিষিদ্ধ' করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রথমবারের মতো গৌরনদী পৌর শ্রমিক দলের কমিটি দিলেও নিরাপত্তার কারণে পদধারীদের নাম প্রকাশ করিনি। জানতে পারলে এতক্ষণে তাঁদের বসতবাড়িতে হামলা হতো। গৌরনদী ছাড়তে বাধ্য করত আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরা।
শ্রমিক দল নেতা সাইফুলের এই বক্তব্য শুধু গৌরনদী নয়, পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া উপজেলারও বাস্তব চিত্র। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এটিকে অলিখিত নিয়ম বানিয়ে ফেলেছেন সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর অনুসারীরা। এই নিয়ম অমান্য করলেই হামলার শিকার হতে হয় ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীর। তাঁদের বসতবাড়িও রেহাই পায় না।

বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগের বাইরে বিএনপি ও চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনকে সক্রিয় রাজনৈতিক দল বিবেচনা করা হয়। জাতীয় পার্টির কমিটি থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। তবে বিরোধী সব দলের নেতাদের একই অভিযোগ, এখানে আওয়ামী লীগের একক রাজত্ব। তাঁদের নেতাকর্মীর ত্রাসের কাছে সবাই অসহায়। অন্য কারও কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, জেলা শহরে দলীয় কর্মসূচিতে যেতে গেলে পথেই হামলার শিকার হতে হয়। এ জন্য আগের রাতে অনেকে পালিয়ে জেলা শহরে অবস্থান নেন।

চলতি বছরের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের চিত্র বলে দেয়, এই দুই উপজেলায় ভোটের রাজনীতিতেও 'নির্বাসিত' বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। গৌরনদীতে ৭ ও আগৈলঝাড়ায় ৫টি মিলিয়ে মোট ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। হুমকি-ধমকির মুখে বেশিরভাগ ইউনিয়নে অন্য দলের প্রার্থীরা মনোয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি। যাঁরা দাখিল করেছিলেন, পরে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। চেয়ারম্যান পদে একমাত্র নির্বাচন হওয়া গৌরনদীর শরিকল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়া বাকিরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য হন।
কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গত মাসের শেষ সপ্তাহে জেলার ১০ উপজেলায় বিএনপি প্রতিবাদ বিক্ষোভ ঘোষণা করে। বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ৮ উপজেলায় বিএনপি সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু শুধু গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ায় করতে পারেনি। কর্মসূচি হতে পারে এমন আগাম খবরে ক্ষমতাসীনরা নড়েচড়ে বসে। এরপর একের পর এক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় আহত হন কয়েক ডজন নেতা।

গৌরনদী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন প্যাদা বলেন, গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় আমরা প্রায় এক যুগ দলীয় কর্মসূচি পালন করতে পারি না। জেলা শহরে কর্মসূচি থাকলে সেদিন বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করা হয়। গত এক মাসে তাদের হামলায় আহতদের মধ্যে এখনও ১৪ জন ঢাকায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। হামলার ভয়ে গৌরনদীতে বিএনপি নেতাদের বাড়িতে ভাড়াটিয়ারাও থাকেন না।

ইসলামী আন্দোলনের গৌরনদী উপজেলা সভাপতি মোস্তফা কামাল বলেন, গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার রাজনৈতিক চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এখানে রাজনীতি, নির্বাচন- সবকিছুই ক্ষমতাসীনদের কবজায়। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। আগৈলঝাড়া উপজেলা ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি মেহেদি হাসান রাসেল বলেন, এখানে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের দমন-পীড়নের মাধ্যমে পিষে ফেলেছে। আমরা ঘরোয়াভাবে কিছু কর্মসূচি পালনের সুযোগ পেলেও রাজপথে নামতে গেলে হামলা করা হয়। প্রশাসনও তাদের পক্ষ নিয়ে অনুমোদন দেয় না।

অভিযোগের বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র হারিছুর রহমান হারিছ সমকালকে বলেন, বরিশাল-১ আসনে বিএনপি চার ভাগে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় নেতা জহিরউদ্দিন স্বপন, আকন কুদ্দুসুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার সোবাহান ও কামরুল ইসলাম সজলের সমর্থকরা প্রায়ই মারামারিতে লিপ্ত হয়। এসব ঘটনা আমাদের ওপর চাপায়। গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় সবাই স্বাধীনভাবে উন্মুক্ত পরিবেশে রাজনীতি করছে। তিনি দাবি করেন, গত ইউপি নির্বাচনে কাউকে চাপ দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান দেখে প্রতিদ্বন্দ্বীরা স্বেচ্ছায় সরে গেছেন।