বাংলাদেশের বর্তমান মানবসমাজ সেই আদিম কৌম সমাজ থেকে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ও পরাধীনতার যুগ পেরিয়ে একটি সামাজিক যুদ্ধ বা জনযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। আমরা শোষকের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি মুক্ত সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এরূপ একটি মুক্ত সমাজ গঠন করতে যে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন; তা স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক নেতারা সার্থকভাবে শুরু করতে পারেননি। একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির মধ্যে ঐক্য হয়েছিল বটে, কিন্তু সবার সামগ্রিক অভীষ্ট লক্ষ্য এক ছিল না। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর মধ্যে সে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানও সম্ভব হয়নি। ফলে শত শত বছরের অধীনতামূলক মিত্রতার মনস্তাত্ত্বিক অবশেষ এবং বিনষ্ট সম্প্রীতির কুপ্রভাব থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। বর্তমান বাঙালি সমাজ এই ক্ষতই বহন করে চলেছে। 
একটি সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ায় পাকিস্তানে জনমনে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের রেশ রয়ে গিয়েছিল। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণও তাদের এক প্রজন্ম আগের স্মৃতি অর্থাৎ হিন্দু জমিদার ও এদের পাইক-পেয়াদার নির্মম অত্যাচারের কথা ভুলে যায়নি। এই দুঃসহ স্মৃতিকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে সাম্প্রদায়িক মনোভাবে আচ্ছন্ন করে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে তৎপর ছিল। এর বিপরীতে প্রগতিশীলদের এক দল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ও নিগ্রহের শিকার হয়ে এরা প্রকাশ্য ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্ষম হয়নি। তা ছাড়া সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বৈশ্বিক মেরূকরণ তাদের দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলে। এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তাই এরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে উগ্রবাদকে বেছে নেয়।
প্রগতিশীলদের অপর অংশ, যারা মূলধারা বলে পরিচিত, তাদের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবক্তা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন এবং মাত্র ৫০ দিনে ৩২টি জনসভা করে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। পূর্ববাংলার মানুষ তাঁর মধ্যেই তাদের লক্ষ্য হাসিলের নেতৃত্ব দেখতে পায়। 
প্রগতিশীলদের মূলধারার সঙ্গে সমাজতন্ত্রীদের সব গ্রুপেরই যোগাযোগ ও রাজনৈতিক আদান-প্রদান ছিল। রাষ্ট্রকে স্বাধীন করার ব্যাপারেও ছিল মতৈক্য। কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য এক ছিল না। সম্ভবত চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে কোনো সমঝোতাও হয়নি। এ জন্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই মূলধারার জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রীদের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। তারা নানা ব্যক্তিস্বার্থে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এরই সুযোগ গ্রহণ করে সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী। প্রগতিশীলদের অন্তর্দ্বন্দ্ব পরিত্যক্ত সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেয়। ফলে স্বাধীনতার সুফল ছিনতাই হয়ে যায়। রাষ্ট্রটি আবার শোষক শ্রেণির হাতে গিয়ে পড়ে। বিগত ৫০ বছরে এই শ্রেণিটি এতটাই পরিপুষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রকে আর তাদের হাতের মুঠো থেকে বের করা যাচ্ছে না। একটি শক্তিশালী সমাজবিপ্লব ভিন্ন সেটি সম্ভবও নয়।
বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা কী? এ দেশে একটি শ্রেণি বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) পরবর্তী হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। ১৯১৬ সালের লক্ষেষ্টৗ চুক্তি, ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট, ১৯৪৬ সালের বসু-সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাব, ১৯৪৮-৫২'র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮-৬৮ পর্যন্ত আইয়ুবীয় নিষ্পেষণ, ১৯৭১ সালের গণহত্যা এদের বোধোদয় ঘটাতে পারেনি। অপর শ্রেণিটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী সমাজ নির্মাণে আগ্রহী; কিন্তু পুঁজিবাদী মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বিগত ৫০ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উভয় শ্রেণিই তাদের ঘোষিত আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
জনগণ প্রকৃত সংগ্রামের লক্ষ্য নিয়েই অংশ নিয়েছিল; কিন্তু প্রতিবারই প্রতারিত হয়েছে। প্রতিবারই দেখা গেছে, সংগ্রামের ফসল উঠেছে কায়েমি স্বার্থবাদীদের ঘরে। আমাদের জাতীয় সংসদের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি দলই নির্বাচনে তাদের বেশিরভাগ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে কালো টাকার মালিকদের; তৃণমূল কর্মীদের কেউ মূল্যায়ন করেনি। সুতরাং বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজের প্রধান রোগটি হলো- পুঁজিবাদী আদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ। সাম্প্রদায়িকতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা প্রভৃতি ওই রোগের উপসর্গ। সাম্যবাদী আদর্শের প্রসার ভিন্ন এসব উপসর্গ থেকে আশু মুক্তির সম্ভাবনা নেই।
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সবকিছুই পণ্য, আর সব সম্পর্কই নির্ণীত হয় লাভ-ক্ষতির নিরিখে। এখানে নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম-সংস্কৃতি, প্রেম-ভালোবাসা এমনকি জাতীয়তাবাদেরও কোনো স্থান নেই। পুঁজিবাদীদের কোনো দেশ নেই; এদের কোনো দেশপ্রেমও নেই। এদের ধর্ম হলো অর্থ। এরা অর্থের পূজারি। দেশীয় পুঁজিবাদীরা বিশ্বপুঁজিবাদের স্থানীয় এজেন্ট। এরা এদের পুঁজির নিশ্চয়তার জন্য সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতিকে এমনভাবে কলুষিত করে যে, সমাজে নেতৃত্ব ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে এরা এদের উপার্জনের একটি অংশ সামাজিক খাতে ব্যয় করে বটে, তা দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এরা রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানাতত্ত্বে বিশ্বাস করে না। আজকের বাংলাদেশে যে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়; মাদকের ছড়াছড়ি; নারীর প্রতি সহিংসতা; সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস; দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য- সবকিছুর মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গিয়ে পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণ; যে সমাজে রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। রাষ্ট্র নিশ্চয়তা দেবে সমাজের উৎপাদিত সম্পদের সুষম বণ্টনের। নিশ্চয়তা দেবে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও মানবাধিকারের। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এমন রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেই অকাতরে জীবন দিয়েছিল। এমন রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য চাই একটি প্রবল সমাজ বিপ্লব। পুঁজিবাদকে হয়তো নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে এর লাগাম টেনে ধরে সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণ খুবই সম্ভব। সেই কাজটি করতে পারে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ।
ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী: সভাপতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
almamun731971@gmail.com