জ্বালানি নিরাপত্তা কী অবস্থায় রয়েছে? জ্বালানি সংকটের কারণ ও সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? এসব নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম।

সমকাল : বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তা কী অবস্থায় রয়েছে?

বদরূল ইমাম : জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের দেশের মূল জ্বালানি ছিল গ্যাস। ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্থানীয় গ্যাস দিয়েই ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করত। এর দাম পড়ত ১ থেকে ৩ ডলার। সেই নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ২০১৫ থেকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকল। ফলে শিল্পে ও বাসা-বাড়িতে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি বেড়ে গেল। এরপর এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির দিকে ঝুঁকল বাংলাদেশ। করোনা-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অনেক বেড়ে গেল। এরপর শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে জ্বালানির দাম আকাশ ছুঁতে শুরু করল। বিশ্বের জ্বালানি সমস্যা বাংলাদেশেও আঘাত করল। এতে দেশের জ্বালানি সংকট আরও ঘণীভূত হয়েছে। তবে সংকট এতটা হতো না যদি গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কারের জন্য অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার থাকত। দেশে অনুসন্ধান হয়েছে। কিছু কিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়েছে। তবে তা নামমাত্র। আসলে সমন্বিতভাবে বড় আকারে অনুসন্ধান হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কিছুদিন পরপর একট- দুইটা কূপ খনন হয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ হয়নি। তাই বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এলএনজির দাম এত বেশি যে এখন খোলাবাজার থেকে কেনাই বন্ধ রয়েছে। ফলে সংকট প্রকট আকার নিয়েছে।

সমকাল : সংকট উত্তরণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করার উপায় কী?

বদরূল ইমাম : সংকট উত্তরণের একটাই উপায় দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। পুরোনো কূপ সংস্কার করতে হবে। ২০১১ সালে স্লাম বার্জার একটা জরিপ করেছিল। যেসব কূপ আছে সেগুলোতে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা দেখতে তাদের নিয়োগ করা হয়েছিল? তারা কিছু সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ অনুসারে কাজ করলে এত বিড়ম্বনা হতো না। গ্যাসের উৎপাদন বাড়ত। যেমন স্লাম বার্জার টিউবিং করতে বলেছিল। বিদেশি কোম্পানিগুলো কূপে বড় টিউব ব্যবহার করে। সেজন্য তাদের উৎপাদন বেশি। দেশীয় ৪০টি কূপের জন্য এ ধরনের অনেক সুপারিশ ছিল। যা আলোর মুখ দেখেনি। কাজ হলে বর্তমান কূপ থেকেই বেশি গ্যাস পাওয়া যেত। এখন পুরোনো কূপগুলোতে জরিপ চালিয়ে স্লাম বার্জারের সুপারিশ অনুসারে কাজ করতে হবে। তাহলে বাড়তি গ্যাস মিলবে। আর অনুসন্ধান কাজ জোরেশোরে করতে হবে। বাংলাদেশ যেহেতু ভূতাত্ত্বিকভাবেই গ্যাসপ্রবণ এলাকা। তাই জোরালো অনুসন্ধান করলেই বড় গ্যাসক্ষেত্র মিলবেই। কূপ খননে গ্যাস পাওয়ায় বাংলাদেশের সফলতার হার ৩:১। অর্থাৎ প্রতি তিন কূপ খননে একটিতে গ্যাস মেলে। বিশ্বে গড়ে ৫:১। বাংলাদেশে সফলতার হার বেশি।

সমকাল : বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূলনীতি কী হওয়া উচিত?

বদরূল ইমাম : বঙ্গবন্ধু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যে নীতি নিয়েছিলেন তা থেকে বর্তমানে বহুদূর সরে গেছে সরকার। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসেই ব্রিটিশ শেল কোম্পানির কাছ থেকে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সুসংহত করেছিলেন। কিন্তু সরকার তা থেকে শিক্ষা নেয়নি। ফলে আমরা নিজেদের সম্পদের ওপর ভর না করে বিপরীতমুখী উদ্যোগের দিকে এগোলাম। দেশীয় কয়লা ফেলে রেখে বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হলো। রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ীর মতো বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে হবে প্রতি বছর। অর্থাৎ সরকারের আদর্শ হচ্ছে আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে দেশ চলবে। এলএনজিতে তখনি যাওয়া উচিত যখন দেশের সম্পদ কমবে। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

সমকাল : জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর কতটুকু গুরুত্ব দিতে হবে?

বদরূল ইমাম : নবায়নযোগ্য জ্বালানিই আগামীর ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর সব দেশই সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও সে পথে এগোতে হবে। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। জার্মানির মতো দেশেও বন্ধ কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য। এটা সাময়িক সংকট। কিছুদিন পরই কেটে যাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাংলাদেশের সংকট হলো জমির প্রাপ্ততা। এটা মোকবিলা করেই প্রকল্প এগিয়ে নিতে হবে।


বিষয় : সাক্ষাৎকার: বদরূল ইমাম জ্বালানির দেশীয় উৎপাদন

মন্তব্য করুন