এই ভূখণ্ড যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অধীনে ছিল, তখন রাষ্ট্রের প্রায় সব সংস্থায় কর্তৃত্ব করতেন বেসামরিক আমলারা। আবার ব্রিটিশের বিদায়ের পর পাকিস্তানিরা যখন এ দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হলো, তখন ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বে সামরিক আমলারাও ভাগ বসালেন। তবে জনগণের প্রত্যাশার অনেকটা প্রতিফলন ঘটিয়ে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে এখানে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ওই ঔপনিবেশিক আমলের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার বেশ চেষ্টা চলে। তখন অনেক রাষ্ট্রীয় সংস্থার পাশাপাশি খোদ শিক্ষা সচিবের পদে নিয়োগ পান একজন প্রথিতযশা অধ্যাপক; গোটা পরিকল্পনা কমিশনকেই আমলামুক্ত করে এর দায়িত্বে নিয়ে আসা হয় এক ঝাঁক মেধাবী অর্থনীতিবিদকে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হলে দেশ আবার চলে যায় সামরিক শাসকদের হাতে। সেই সঙ্গে উল্টে যায় রাষ্ট্রকে একচেটিয়া আমলাতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত করার ধারা। আবার সেই ঔপনিবেশিক কায়দায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বে চলে আসেন সামরিক-বেসামরিক আমলারা।

আশা করা হয়েছিল, জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সামরিক শাসনের বিদায়ের পর দেশ যখন আবার গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসে, তখন এর আবসান ঘটবে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ পাবেন দক্ষ, মেধাবী ও স্বাধীনচেতা লোকেরা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত তিন দশকে দেশে যত নির্বাচিত সরকার এসেছে, তারা সবাই সে আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকার বলে দাবিদার বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম কিছু করেনি। শুধু তা-ই নয়; রোববার সমকালের এক প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা শুধু আমলা নয়, দুর্বল ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে; যার ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো 'জনস্বার্থ রক্ষার প্রহরী' হিসেবে তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধান হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয় ইত্যাদি সংস্থার কথা বলা যায়; যেগুলোর শুধু শীর্ষ পদ নয়, অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেও বসে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক সদস্যরা। আমরা জানি, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, সংসদ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে এমনভাবে বিন্যাস করা হয়, যাতে একটা অঙ্গ আরেক অঙ্গের কাজকর্ম তদারকি করতে পারে। এগুলোর বাইরে আরও কিছু সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গড়ে তোলা হয়, যেগুলোর উদ্দেশ্য ওই তদারকির কাজে সহায়তা করার মাধ্যমে একটা ভারসাম্যপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এখন প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা হলেন নির্বাহী বিভাগের লোক; তাদেরই যদি বিভিন্ন সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্তৃত্বে বসানো হয়, তাহলে ভারসাম্যপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা একটা অলীক বিষয় হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র কার্যত চালান নির্বাহী বিভাগের আমলারা। আবার তাঁদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে যেসব সংস্থা, সেখানেও যদি ওই আমলাদেরই প্রাধান্য থাকে, তাহলে বলতেই হবে- কাককে কাকের মাংস খেতে বলা যেমন কথা, এটা আসলে তেমন একটি বিষয়। বহুদিন ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হচ্ছেন একজন সাবেক অর্থ সচিব। এ কারণে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে কোনটা যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, আর কোনটা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত- অনেক সময়ই তা বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি প্রশাসন দুর্নীতির আখড়া বলে অভিযোগ থাকলেও সাবেক আমলাদের কর্তৃত্বাধীন দুদকের এ বিষয়ে খুব একটা নড়াচড়া নেই। একজন সাবেক আমলার নেতৃত্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আদৌ অস্তিত্বশীল কিনা- সে প্রশ্নও মাঝেমধ্যে ওঠে।

অভিযোগ আছে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা নির্বাহী বিভাগের শীর্ষে থাকেন, নিজেদের নানা দুর্বলতার কারণে তাঁরা আমলাদের বিষয়ে একটু বেশিই উদার হয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কর্তৃত্বে আমলাদের অবস্থান এরই ফল। তা ছাড়া প্রশাসনের ব্যাপক দলীয়করণও এর আরেকটা কারণ। আমাদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভিন্ন ভিন্ন পেশার দক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য আনা এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও নিবিড় করে তোলার স্বার্থে সরকার অচিরে এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধনের প্রয়াস রাষ্ট্রকে শুধু কল্যাণমূলকই করে না; রাষ্ট্রের ভিতকেও মজবুত করে।

বিষয় : আশার গুড়ে বালি সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন