কুমিল্লা সিটি করপোরেশন গঠনের পর দুইবার হেরে এবার প্রথম জয় পেল আওয়ামী লীগ। আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই ভোটের ওপর নজর ছিল নানা মহলের। যদিও বিএনপি এই নির্বাচনে ছিল অনুপস্থিত। তবে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনও এই ভোটকে নিয়েছিল সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে।

ইসি সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, ভোটের এক মাস আগেই বিজিবি নামানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা, কোটি টাকা খরচ করে সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং রাজনৈতিক বিতর্ক সত্ত্বেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েছিল ইসি। কারণ, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে এই ভোট ছিল ইসির ওপর জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ।

বিশ্নেষকদের মতে, ভোটের আগেই হেরে গিয়েছিল ইসি। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সংসদ সদস্যকে নির্বাচনী প্রচার থেকে ও নির্বাচনী এলাকা ত্যাগে বাধ্য করতে গিয়েও তারা ব্যর্থ হয়েছে। এতে ইসির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, নির্বাচনী মাঠে নানা ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এগুলো ইসি কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে, তার দিকেই নজর ছিল সবার। সামনের নির্বাচনগুলোতে আরও বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তখন ইসি নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকবে, তার প্রমাণ এই নির্বাচনে দিতে পারেনি।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কুমিল্লায় আগের দুই সিটি নির্বাচনেও তেমন কোনো সহিংসতা হয়নি।

এবারের ভোটও ভালোই হয়েছে। ইসির পক্ষ থেকে অনেক পদক্ষেপের কথা শোনা গেছে। এতকিছুর প্রয়োজন ছিল না বলেই মনে হয় না।
তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে নিয়ে সৃষ্ট ঘটনা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি ইসি। এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, ফল ঘোষণার শেষ দিকে এসে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার। ইভিএমে ধীরগতির বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁদের আমলে কুমিল্লার ভোটে ৮৮টি কেন্দ্র ছিল। সবগুলোতে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু তাতে বায়োমেট্রিকের সংযোজন ছিল না। তাই ভোটাররা সহজেই ভোট দিতে পেরেছেন। আমাদের দেশে বয়স্ক ভোটার ও শ্রমিক ভোটারদের হাতের আঙুলের ছাপ মেলানো কষ্টকর বিষয়। তাই সহজ ইভিএম আমাদের প্রয়োজন।

এই নির্বাচনে ইসির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে দৃশ্যত কোনো গোলযোগ হয়নি। এটা স্বস্তির বিষয়। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে ইসি তার আইন প্রয়োগে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সংসদ সদস্যকে প্রচারে নিবৃত্ত করতে না পেরে ইসির পক্ষ থেকে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছিল। এর পরের ধাপে গিয়ে ইসি কেন শৈথিল্যতা প্রদর্শন করল, সেই প্রশ্ন জনমনে রয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আগামী বছরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা জানিয়ে বর্তমানে সব ধরনের নির্বাচন বর্জন করছে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ৩৪৩ ভোটের এই জয়েও বেশ স্বস্তিতে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। বড় ধরনের কোনো গোলযোগ বা বিতর্ক ছাড়াই পরপর দুটি সিটি করপোরেশনের (নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা) নৌকার এই ফল দলের সাংগঠনিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন এই ভোট থেকে তেমন কোনো ভালো ফল ঘরে তুলতে পারেনি বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর মতে, স্থানীয় এমপি বাহারের কাছে ভোটের আগেই ইসি হেরে গেছে। তিনি বলেন, বায়োমেট্রিক সংবলিত ইভিএম জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করেছে। এবারের ভোটে ৫৮ ভাগের কিছু বেশি ভোট পড়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্যালটে ভোট হয় এই সিটিতে। তখন ভোট পড়ে ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর ২০১২ সালের সিটি ভোটে ৮৮টি কেন্দ্রের সবক'টিতে ইভিএম ব্যবহার হয়। তখন ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৭৫ শতাংশ। স্থানীয় সরকারের যে কোনো ভোটে কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণে ভোটার উপস্থিতি বেশি হয়। কিন্তু কুমিল্লায় দেখা যাচ্ছে ভোটার উপস্থিতি কমেছে।

কুমিল্লা সিটির ফল ঘোষণার শেষ মুহূর্তে রিটার্নিং কমকর্তার কার্যালয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে ভোট উৎসব অনেকটাই ম্লান হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হকের (সাক্কু) বরাতে 'শেষ মুহূর্তের একটি ফোনকলে ভোটের ফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে'- এমন সংবাদে এ নিয়ে আরও জল ঘোলা হয়েছে। তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ফল বদলে ফেলার সুযোগ রিটার্নিং কর্মকর্তার ছিল না। তিনি বলেন, ভোটের ফলাফলে রিটার্নিং কর্মকর্তার পরিবর্তন, পরিবর্ধনের সুযোগ নেই। কেন্দ্র থেকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার দেওয়া ফল তিনি ঘোষণা করেছেন। কেন্দ্রের এই ফল প্রার্থী, তাঁদের এজেন্ট ও অন্যদের কাছেও রয়েছে।
ফলাফল নিয়ে আপত্তি থাকলে আইনিভাবে কী করণীয়, তারও পরামর্শ দিয়ে এই কমিশনার বলেন, চূড়ান্ত ফলাফল কমিশনে পাঠিয়ে দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এরপর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এখন কেউ যদি মনে করেন এখানে ভুল আছে। তিনি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। পরে আপিল ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। এরপর আদালত আছে, উচ্চ আদালত আছে।

তখন রিটার্নিং কর্মকর্তা ইসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন জানিয়ে আলমগীর বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা এসপি, ডিসিকে ফোন করেন, কমিশনকে জানান। কমিশন থেকে তাঁদের অতিরিক্ত ফোর্স দিতে বললে তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দেন।